কুমিল্লায় বাসে ট্রেনের ধাক্কায় নিহত ১২

কুমিল্লা প্রতিনিধি

কুমিল্লার সদর দক্ষিণ উপজেলায় ট্রেন-বাস সংঘর্ষে অন্তত ১২ জন নিহত এবং ৩০ জন আহত হয়েছে। এই ঘটনায় দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে দুই গেটম্যানকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ।

শনিবার (২১ মার্চ) দিবাগত রাত ৩টার দিকে সদর দক্ষিণ উপজেলার পদুয়ার বাজার লেভেল ক্রসিং এলাকায় এই দুর্ঘটনা ঘটে।

পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস সূত্রে জানা যায়, চট্টগ্রাম থেকে ঢাকাগামী ‘চট্টগ্রাম মেইল’ ট্রেনটি পদুয়ার বাজার বিশ্বরোড এলাকা অতিক্রম করার সময় একটি যাত্রীবাহী বাস রেললাইন পার হচ্ছিল। ‘মামুন পরিবহন’ নামের বাসটি চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে নোয়াখালীগামী ছিল। এ সময় দ্রুতগতির ট্রেনটি বাসটিকে সজোরে ধাক্কা দেয়। এতে বাসটি ট্রেনের ইঞ্জিনের সঙ্গে আটকে যায়। সংঘর্ষের পর ট্রেনটি প্রায় এক কিলোমিটার পর্যন্ত বাসটিকে হিঁচড়ে নিয়ে যায় বলে জানিয়েছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা। এতে বাসটি দুমড়েমুচড়ে যায় এবং ঘটনাস্থলেই কয়েক যাত্রীর মৃত্যু হয়। গুরুতর আহত ব্যক্তিদের স্থানীয় লোকজন ও ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা উদ্ধার করে দ্রুত কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠান।

কুমিল্লা সদর দক্ষিণ থানার উপপরিদর্শক (এসআই) জনি বড়ুয়া বলেন, দুর্ঘটনায় ১২ জন নিহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে কয়েকজন ঘটনাস্থলে এবং অন্যরা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। তাৎক্ষণিকভাবে নিহত ব্যক্তিদের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।

এদিকে দুর্ঘটনার পর প্রায় তিন ঘণ্টা ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথে ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকে, পরে উদ্ধার কার্যক্রম শেষে চলাচল স্বাভাবিক হয়।

নিহত বাসযাত্রীদের পরিচয়

নিহত বাসযাত্রীরা হলেন নোয়াখালীর সোনাইমুড়ীর সালামত উল্লাহর ছেলে মো. বাবুল চৌধুরী (৫৩), ঝিনাইদহের মহেশপুরের পিন্টু মিয়ার স্ত্রী লাইজু আক্তার (২৬), তাঁর দুই মেয়ে খাদিজা আক্তার (৬) ও মরিয়ম আক্তার (৪), চুয়াডাঙ্গার জীবননগরের বিল্লার হোসেনের ছেলে সোহেল রানা (৪৬), যশোরের চৌগাছার ফকির চাঁদ বিশ্বাসের ছেলে মো. সিরাজুল ইসলাম (৬২) ও তাঁর স্ত্রী কোহিনুর বেগম (৫৫), নোয়াখালীর সুধারামের মো. সেলিম মিয়ার ছেলে নজরুল ইসলাম রায়হান (৩৩), লক্ষ্মীপুর সদরের সিরাজুল দৌলার মেয়ে সায়েদা (৯), ঝিনাইদহ সদরের মোক্তার হোসেন বিশ্বাসের ছেলে মো. জোয়াদ বিশ্বাস (২০), মাগুরার মোহাম্মদপুরের ওহাব শেখের ছেলে ফসিয়ার রহমান (২৬) এবং চাঁদপুরের কচুয়ার মোমিনুল হকের ছেলে তাজুল ইসলাম (৬৮)।

চট্টগ্রাম রেলওয়ের এএসপি নিহত ব্যক্তিদের পরিচয়ের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

যে কোম্পানির বাস চালান পিন্টু, সেটির বাসেই প্রাণ গেল স্ত্রী ও দুই মেয়ের

একটি যাত্রা, একটি দুর্ঘটনা—আর সেই দুর্ঘটনা কেড়ে নিল জীবনের সবকিছু। ঝিনাইদহের মহেশপুরের পিন্টু মিয়া এখন বেঁচে আছেন, কিন্তু তাঁর ভেতরের মানুষটি যেন নিঃশেষ হয়ে গেছে। গতকাল শনিবার দিবাগত রাতে কুমিল্লায় ট্রেন-বাস সংঘর্ষের ঘটনায় স্ত্রী ও দুই মেয়েকে হারিয়ে শোকে স্তব্ধ হয়ে গেছেন তিনি।

ঢাকার ক্যান্টনমেন্ট এলাকার মানিকদীতে বসবাস করেন পিন্টু মিয়া। পেশায় তিনি একজন বাসচালক। ঈদের ছুটি কাটাতে পরিবারের সবাইকে নিয়ে গিয়েছিলেন গ্রামের বাড়িতে। আনন্দ-উচ্ছ্বাসে কাটানো সেই ঈদই যে তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় শোক হয়ে ফিরে আসবে—তা কল্পনাও করেননি তিনি। যে মামুন স্পেশাল পরিবহনের বাস তিনি চালান, সেই বাসই যে তাঁর স্ত্রী, সন্তানদের প্রাণ কেড়ে নেবে তা কখনো স্বপ্নেও ভাবেননি তিনি।

ঈদের দিন বিকেলে সিদ্ধান্ত হয়, স্ত্রী লাইজু আক্তার এবং দুই মেয়ে—ছয় বছরের খাদিজা আক্তার ও সাড়ে তিন বছরের মরিয়ম আক্তারকে নিয়ে শ্বশুরবাড়ি লক্ষ্মীপুরের হাজিরহাটে পাঠাবেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী, তাঁরা ঝিনাইদহের মহেশপুর থেকে মামুন স্পেশাল পরিবহনের একটি বাসে ওঠেন। কিন্তু পিন্টু নিজে সেই বাসে থাকেননি। কারণ, সৌদি আরব থেকে আসছিলেন তাঁর শ্যালক। তাঁকে আনতে ঢাকায় যাওয়ার প্রয়োজন ছিল। তাই স্ত্রী-সন্তানদের বাসে তুলে দিয়ে নিজে ঢাকায় নেমে যান। সেই নামাটাই যেন হয়ে দাঁড়ায় জীবন-মৃত্যুর সীমারেখা।

পিন্টু মিয়া বলেন, ‘আমি যে বাস চালাই, সেই “মামুন স্পেশাল” পরিবহনেই আমার স্ত্রী-সন্তানদের তুলে দিলাম। সহকর্মী চালকের কাছে তাদের দায়িত্ব দিয়ে নিজে ঢাকায় নেমে গেলাম। তখন ভাবিনি এটাই শেষ দেখা।’

পিন্টু মিয়া নিয়মিত যোগাযোগ রাখছিলেন সহকর্মীর সঙ্গে। জানতে চাইছিলেন স্ত্রী-সন্তানদের খবর। সবকিছু স্বাভাবিকই ছিল। কিন্তু রাত গভীর হওয়ার পর হঠাৎই যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। ‘রাত ৩টার পর থেকে আর কোনো যোগাযোগ পাইনি। ফোন বন্ধ। বারবার চেষ্টা করেও পাইনি। এরপর আসে সেই ভয়ংকর দুর্ঘটনার খবর’ কাঁপা কণ্ঠে বলেন তিনি।

দুটি তদন্ত কমিটি গঠন

দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে বাংলাদেশ রেলওয়ে একটি বিভাগীয় এবং একটি জোনাল পর্যায়ের—মোট দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। কমিটিগুলোকে তিন কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অপর কমিটি গঠন করেছে কুমিল্লা জেলা প্রশাসন।

বিভাগীয় পর্যায়ের ছয় সদস্যের তদন্ত কমিটির নেতৃত্বে রয়েছেন চট্টগ্রাম বিভাগের পরিবহন কর্মকর্তা আনিসুর রহমান। অপর দিকে জোনাল পর্যায়ের ছয় সদস্যের কমিটির প্রধান করা হয়েছে চিফ অপারেটিং সুপারিনটেনডেন্ট (পূর্ব) মোহাম্মদ সফিকুর রহমানকে।

বিভাগীয় তদন্ত কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন বিভাগীয় প্রকৌশলী-১ আবু রাফি মোহাম্মদ ইমতিয়াজ হোসাইন, বিভাগীয় যান্ত্রিক প্রকৌশলী (লোকো) মো. রেজওয়ান-উল-ইসলাম, বিভাগীয় সংকেত ও টেলিযোগাযোগ প্রকৌশলী মো. আশিকুর রহমান, বিভাগীয় মেডিকেল অফিসার ডা. তাহামিনা ইয়াছমিন এবং রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর (আরএনবি) কমান্ড্যান্ট মো. শহীদ উল্লাহ।

অন্যদিকে জোনাল তদন্ত কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন চিফ ইঞ্জিনিয়ার (পূর্ব) মো. তানভিরুল ইসলাম, চিফ মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার (পূর্ব) সাদেকুর রহমান, চিফ সিগন্যাল ও টেলিকম ইঞ্জিনিয়ার (পূর্ব) তারেক মোহাম্মদ শামছ তুষার, চিফ মেডিকেল অফিসার (পূর্ব) ইবনে সফি আব্দুল আহাদ এবং চিফ কমান্ড্যান্ট, আরএনবি (পূর্ব) মো. জহিরুল ইসলাম।

বিভাগীয় ব্যবস্থাপক মোস্তাফিজুর রহমান ভুঁইয়া বলেন, দুটি তদন্ত কমিটিকে দ্রুত সময়ের মধ্যে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্‌ঘাটন করে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

নিহতদের পরিবারকে ২৫ হাজার টাকা সহায়তা দেবে প্রশাসন

কুমিল্লায় লেভেল ক্রসিংয়ে উঠে পড়া বাসের সঙ্গে ট্রেনের সংঘর্ষে নিহত ব্যক্তিদের প্রতিটি পরিবারকে ২৫ হাজার টাকা আর্থিক সহায়তা দেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে জেলা প্রশাসন।

কুমিল্লা জেলা প্রশাসক মু. রেজা হাসান বলেন, নিহত ব্যক্তিদের প্রতিটি পরিবারকে ২৫ হাজার টাকা আর্থিক সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। তিনি জানান, কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বর্তমানে ৫ জন চিকিৎসাধীন রয়েছেন এবং ১৮ জনকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।

সম্পর্কিত লেখা:

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *