■ রাজবাড়ী প্রতিনিধি ■
রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া ফেরি ঘাটে পদ্মা নদীতে পড়ে যাওয়া বাসের আরও এক যাত্রীর লাশ উদ্ধার করেছেন ডুবুরিরা। বৃহস্পতিবার (২৬ মার্চ) সকালে নদীর ৩০ ফুট গভীর থেকে তাঁর লাশ উদ্ধার করা হয়। এ নিয়ে দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ২৬ জনে দাঁড়াল।
কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলা থেকে ঢাকার উদ্দেশ ছেড়ে আসা সৌহার্দ্য পরিবহন-এর যাত্রীবাহী একটি বাস বুধবার বিকেল ৫টার দিকে দৌলতদিয়ার ফেরিঘাটের পন্টুন থেকে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পদ্মায় পড়ে যায়। ঘটনাটি ঘটে ৩ নম্বর ঘাটে। বাসটিতে অন্তত ৫০ জন যাত্রী ছিলেন বলে জানা গেছে।
দুর্ঘটনাস্থলে নিখোঁজ বাসযাত্রীদের স্বজনেরা আহাজারি করছিলেন। সেখানে মজনু মিয়া নামের এক ব্যক্তি তাঁর ছেলে উজ্জলের অপেক্ষা করছিলেন। তখনো নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ডের ডুবুরি দল উদ্ধার অভিযান চালিয়ে যাচ্ছিলেন। একপর্যায়ে ডুবুরি দলের সদস্যরা পদ্মার ৩০ ফুট পানির নিচ থেকে উজ্জলের লাশ উদ্ধার করে কুলে নিয়ে আসেন। এ সময় শোকাহত স্বজনদের কান্নায় পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে।
সর্বশেষ লাশ উদ্ধার হওয়া ব্যক্তির নাম উজ্জল হোসেন (৩৫)। তিনি একজন ফল ব্যবসায়ী ছিলেন। তিনি রাজবাড়ীর কালুখালী উপজেলার ঝাও গ্রামের মজনু মিয়ার ছেলে।
মজনু মিয়া জানান, উজ্জলের সন্ধান পেতে বুধবার রাত থেকেই তিনি ও তাঁর স্বজনেরা ঘাটে অপেক্ষা করছিলেন।
মজনু মিয়া বলেন, ঈদে আমার ছেলে বাড়ি আসে। আমাদের সঙ্গে ঈদ করে বুধবার বিকেলে ঢাকায় ফিরছিল। তখনো জানতাম না, আমার ছেলে ওই গাড়ির ভেতরে ছিল। রাতে তাঁর ফোন বন্ধ পাওয়ায় সন্দেহ হলে আমরা পরিবারের সদস্যরা ঘাটে চলে আসি। রাতভর ছেলের খোঁজে কাটিয়ে দিই এখানে। এরপর সকালে আমার ছেলের লাশ পানি থেকে উদ্ধার করে ডুবুরি দল।
সৌহার্দ্য পরিবহনের বাসচালকের মরদেহ উদ্ধার
রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে পদ্মায় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ঢাকাগামী সৌহার্দ্য পরিবহন বাস পড়ে যাওয়ার ঘটনায় চালক আরমান খানের (৩১) মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
নিহত আরমান রাজবাড়ী জেলার বালিয়াকান্দি উপজেলার পশ্চিমখালখোলা গ্রামের আরব খানের ছেলে। দুর্ঘটনার সময় বাসটি আরমান খান চালাচ্ছিলেন বলে জানা গেছে।
বাসচালক আরমানের ফুপাতো ভাই বলেন, বাসটি আমার ফুপাতো ভাই আরমান চালাচ্ছিলেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অনেকেই গুজব ছড়িয়েছেন যে বাসের চালক পান খাওয়ার জন্য বাস থেকে নেমে গেলে তখন হেলপার চালাচ্ছি। কিন্তু ঘটনাটি সত্য নই। কারণ বাস থেকে যদি আরমান নেমেই যাবে তাহলে মরদেহ কেন পাওয়া গেল।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে সৌহার্দ্য পরিবহনের একজন স্টাফ বলেন, গতকাল দুর্ঘটনায় পতিত হওয়া বাসটির চালক আরমান ছিলেন। সে নিজেই বাসটি ড্রাইভ করছিলেন। তার পেশাদার ড্রাইভিং লাইসেন্সও রয়েছে। তবে এ ব্যাপারে সৌহার্দ্য পরিবহনের মালিক পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তা সম্ভব হয়নি।
৬ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন
রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে ফেরিতে ওঠার সময় পন্টুন থেকে একটি যাত্রীবাহী বাস পদ্মা নদীতে পড়ে হতাহতের ঘটনা অনুসন্ধানে উচ্চপর্যায়ের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়।
ছয় সদস্যবিশিষ্ট এই কমিটিকে আগামী তিন কার্যদিবসের মধ্যে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন করে প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২৬ মার্চ) মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে তদন্ত কমিটি গঠনের এ তথ্য জানানো হয়েছে।
মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন এবং এর জন্য দায়ী ব্যক্তিদের শনাক্তকরণের লক্ষ্যে গঠিত এই তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. মুহিদুল ইসলাম।
কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন– রাজবাড়ীর জেলা প্রশাসকের একজন প্রতিনিধি, নৌ পুলিশের একজন প্রতিনিধি, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)-এর একজন প্রতিনিধি, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশন (বিআইডব্লিউটিসি)-এর একজন প্রতিনিধি এবং ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের একজন প্রতিনিধি।
তদন্ত কমিটিকে সংঘটিত দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানপূর্বক দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে আগামী ৩ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিল করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনে কমিটি অতিরিক্ত সদস্য কো-অপ্ট (অন্তর্ভুক্ত) করতে পারবে।
নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তদন্ত প্রতিবেদন প্রাপ্তির পর দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
