■ নাগরিক প্রতিবেদক ■
সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ ও তার পরিবারের নামে থাকা ৩৯টি ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ করার আদেশ দিয়েছেন আদালত।
বুধবার (৫ মার্চ) দুদকের আবেদনের প্রেক্ষিতে ঢাকার মেট্রোপলিটন সিনিয়র স্পেশাল জজ জাকির হোসেন গালিবের আদালত এ আদেশ দেন। এসব ব্যাংক হিসাবে ৫ কোটি ২৬ লাখ ৮৩ হাজার টাকা জমা রয়েছে বলে জানা গেছে।
দুদকের আবেদনে বলা হয়, সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদের বিরুদ্ধে মানিলন্ডারিংয়ের অভিযোগ অনুসন্ধানের জন্য তদন্ত টিম গঠন করা হয়েছে। অনুসন্ধানকালে তিনি এসব অস্থাবর সম্পত্তি হস্তান্তর করতে পারেন। তাই ন্যায়বিচারের স্বার্থে তার এসব সম্পত্তি ফ্রিজ হওয়ার আদেশ প্রয়োজন।
গত বছরের ৭ অক্টোবর সাবেক মন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ ও তার স্ত্রী রুকমীলা জামানের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দেন আদালত। নিষেধাজ্ঞা চেয়ে করা আবেদনে বলা হয়, অভিযোগ সংশ্লিষ্ট সাইফুজ্জামান চৌধুরী ও তার স্ত্রী রুকমীলা জামান দেশত্যাগ করতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। সুষ্ঠু অনুসন্ধানের স্বার্থে সাইফুজ্জামান চৌধুরী ও তার স্ত্রী রুকমীলা জামানের বিদেশ গমন রহিত করা আবশ্যক।
২০১৬ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে সাইফুজ্জামান চৌধুরী ৪৮ লাখ ডলার (প্রায় ৫ হাজার ৭২৪ কোটি টাকা) ব্যয়ে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে ৬২০টি বাড়ি কেনেন।
সাইফুজ্জামান চৌধুরী ২০০৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে নাহার ম্যানেজমেন্ট ইনকরপোরেটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠান খোলেন। একই বছর তিনি ওই প্রতিষ্ঠানের নামে যুক্তরাষ্ট্রে ৯টি ফ্ল্যাট কেনেন। ২০১৪ ও ২০১৫ সালে কম্পিউটার সফটওয়্যার ব্যবসা করার জন্য আমিরাতের দুবাইয়ে র্যাপিড র্যাপ্টর এফজিই ও জেবা ট্রেডিং এফজিই নামের দুটি প্রতিষ্ঠান খোলেন। এ ছাড়া সাইফুজ্জামান চৌধুরী স্ত্রী রুকমিলা জামান চৌধুরীর নামে আল-বারশা সাউথ-থার্ড এলাকায় কিউ গার্ডেনস ও বুটিক রেসিডেন্সে দুটি ফ্ল্যাট কিনেছেন। যার দাম ২২ লাখ ৫০ হাজার ৩০০ দিরহাম (প্রায় ৭ কোটি ৩১ লাখ টাকা)।
সাইফুজ্জামান চৌধুরী ২০১৬ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও আরব আমিরাতে ৬২০টি বাড়ি কেনেন বলে সিআইডির বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়। যার বাজারমূল্য প্রায় ৪৮ কোটি ডলার (প্রায় ৫ হাজার ৭২৪ কোটি টাকা)। ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে সাইফুজ্জামান চৌধুরী ২০১০ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত নিজের ও স্ত্রী রুকমিলা জামানের নামে যুক্তরাজ্য ও দুবাইয়ে আটটি প্রতিষ্ঠান খোলেন, যার স্থায়ী ও চলতি সম্পদের মূল্য ২১ কোটি ৭২ লাখ ৬০ হাজার ডলার (প্রায় ২ হাজার ৫৯১ কোটি টাকা)।
বাংলাদেশ থেকে পাচার করা অর্থ দিয়ে সাইফুজ্জামান চৌধুরী যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে এসব কোম্পানি খুলে বিনিয়োগ করেছেন। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক এখন পর্যন্ত যে ২১টি প্রতিষ্ঠানকে বিদেশে বিনিয়োগের অনুমোদন দিয়েছে, সেই তালিকায় সাইফুজ্জামান চৌধুরী বা তাঁর পরিবারের কারও নাম নেই। ভোটের আগে নির্বাচন কমিশনে সাইফুজ্জামান চৌধুরী যে সম্পদ বিবরণী জমা দেন, সেখানে তাঁর বিদেশে থাকা সম্পদের কোনো তথ্য নেই। অর্থ পাচার ও মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন অনুসারে এটি অপরাধ। তাই সাইফুজ্জামান চৌধুরী ও তাঁর স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করেছে সিআইডির ফিন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিট।
এর আগে গত ১৭ অক্টোবর সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী ও তার পরিবারের নামে থাকা দেশ-বিদেশের ৫৮০ বাড়ি/এপার্টমেন্ট/জমিসহ স্থাবর সম্পদ জব্দের আদেশ দিয়েছেন আদালত। এর মধ্যে যুক্তরাজ্যে ৩৪৩টি, সংযুক্ত আরব আমিরাতে ২২৮টি এবং যুক্তরাষ্ট্রে রয়েছে ৯টি। এছাড়া সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুটি ব্যাংকের হিসাব ও বাংলাদেশের একটি ব্যাংকের হিসাব অবরুদ্ধের আদেশ দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর সাইফুজ্জামান চৌধুরী ও তার স্ত্রী রুকমিলা জামানের নামে থাকা সব ধরনের ব্যাংক হিসাব জব্দের নির্দেশ দেয় বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইনটেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। পরে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২-এর ২৩ (১) (গ) ধারা অনুযায়ী সাইফুজ্জামানের ভাই আনিসুজ্জামান চৌধুরী, আনিসুজ্জামান স্ত্রী ইমরানা জামান চৌধুরী ও মেয়ে আনিসা জামানের ব্যক্তিগত হিসাব ও তাদের ব্যক্তি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের নামে পরিচালিত হিসাবের লেনদেন প্রথম দফায় ৩০ দিনের জন্য স্থগিত করার নির্দেশনা দেওয়া হয়।
২০১৩ সালের উপ-নির্বাচনে চট্টগ্রাম-১২ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। এরপর ২০১৪ সালের ১০ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি চট্টগ্রাম-১৩ আসন থেকে আবার নির্বাচিত হন। ২০১৪ সালের ১২ জানুয়ারি থেকে ২০১৯ সালের ৭ জানুয়ারি পর্যন্ত তিনি ভূমি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি চট্টগ্রাম-১৩ আসন থেকে নির্বাচিত হন। পরে তিনি ২০১৯ সালের ৭ জানুয়ারি ভূমি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পান। ২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি চট্টগ্রাম-১৩ আসন থেকে আবার নির্বাচিত হন।