■ নাগরিক প্রতিবেদন ■
বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের (বিএসসি) একটি জাহাজ ইরানের ড্রোন হামলা থেকে অল্পের জন্য রক্ষা পেয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের জেবেল আলী বন্দরে জাহাজটির মাত্র একশ গজ দূরে ইরানের নিক্ষেপ করা একটি ড্রোন বিস্ফোরিত হয়। বিস্ফোরণ থেকে বাংলাদেশি পতাকাবাহী জাহাজ ‘বাংলার জয়যাত্রা’ ও এর ৩১ নাবিক রক্ষা পেয়েছেন।
শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) এ হামলার পর জাহাজটি থেকে পণ্য খালাস স্থগিত করা হয়। দুই দিন পর আবারও খালাস শুরু হয়। তবে পণ্য খালাস শেষ হয়ে গেলেও জাহাজটি এখনই যুদ্ধসংকুল হরমুজ প্রণালী অতিক্রম করতে পারবে না।
এটি ছাড়াও হরমুজ প্রণালীর কাছাকাছি বাংলাদেশি পতাকাবাহী আরও তিনটি জাহাজ রয়েছে। এসব জাহাজকে নিরাপত্তার স্বার্থে ও যেকোনো ধরনের ঝুঁকি এড়াতে গতি কমানোসহ কিছু বিধিনিষেধ মেনে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বিএসসি ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
মেরিন ট্রাফিক সংশ্লিষ্ট সূত্র অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালী ও আশপাশের বন্দরগামী আরও তিনটি বাংলাদেশি জাহাজ রয়েছে। এর মধ্যে কেএসআরএম গ্রুপের দুটি এবং মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের (এমজিআই) একটি জাহাজ রয়েছে।
কেএসআরএম গ্রুপের নির্বাহী পরিচালক মেহেরুল করিম জানান, তাদের দুটি জাহাজের একটি ওমানের সালালা বন্দর ও অপরটি কুয়েতগামী ছিল। তিন-চারদিনের মধ্যেই এই জাহাজগুলো নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছতে পারত। কিন্তু ঝুঁকি এড়াতে জাহাজ দুটিকে গতি কমানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে মার্কেন্টাইল শিপিং লাইনসের (মেঘনা গ্রুপের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান) একটি জাহাজ সংযুক্ত আরব আমিরাতের শারজার খোর ফাক্কান বন্দরে গিয়ে জ্বালানি সংগ্রহের কথা ছিল। নাবিকদের নিরাপত্তার স্বার্থে সেই জাহাজের যাত্রা স্থগিত করা হয়েছে। বর্তমানে জাহাজটি আরব সাগরে অবস্থান করছে বলে সংশ্লিষ্ট শিপিং লাইনস সূত্র জানিয়েছে।
রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বিএসসির জাহাজ এমভি বাংলার জয়যাত্রা হরমুজ প্রণালীর ভেতরেই আটকা পড়েছে। গত ২৭ ফেব্রুয়ারি কাতারের মোসাইয়িদ বন্দর থেকে ৩৮ হাজার ৮০০ টন স্টিল কয়েল নিয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতের জেবেল আলী বন্দরের জেটিতে নোঙর করে। যুদ্ধসংকুল পরিস্থিতির কারণে এর পরদিনই ওই বন্দরে রেড অ্যালার্ট জারি করা হয়।
এতে ওই জাহাজ থেকে পণ্য খালাস স্থগিত করা হয়।
জাহাজে থাকা নাবিক আতিকুল হক নিজের ফেসবুক আইডিতে ওই রাতের বর্ণনা দিয়ে লেখেন, আমাদের জাহাজের মাত্র ১০০ গজ সামনে ইরানি ড্রোন এসে বিস্ফোরিত হয়। আলহামদুলিল্লাহ, জাহাজ ও নাবিকরা অক্ষত আছে।
আরেক নাবিক স্যাটেলাইট ফোনে জানান, মুহূর্তের জন্য মনে হয়েছিল তাদের জাহাজটিই সরাসরি হামলার লক্ষবস্তু। ড্রোনের আলো ও বিস্ফোরণের ভয়াল শব্দে তাদের মধ্যে মৃত্যুর আবহ তৈরি হয়েছিল।
বর্তমানে বাংলাদেশি পতাকাবাহী জাহাজ রয়েছে ১০৭টি। এর মধ্যে চারটি জাহাজ এখন মধ্যপ্রাচ্যগামী পণ্য পরিবহনে নিয়োজিত। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর হরমুজ প্রণালিতে একাধিক জাহাজে হামলার ঘটনায় এসব জাহাজে থাকা বাংলাদেশি নাবিকদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
মেরিন বিমা খাতে গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান স্কাইটেক ২৮ ফেব্রুয়ারি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে জানায়, পারস্য উপসাগরে হরমুজ প্রণালির ভেতরে বর্তমানে প্রায় ৭৫০টি জাহাজ রয়েছে, যা সম্ভাব্য অবরোধ বা আটকে পড়ার ঝুঁকিতে আছে।
যুক্তরাজ্যের ইউনাইটেড কিংডম মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস (ইউকেএমটিও) জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি এলাকায় অন্তত চারটি জাহাজে হামলার ঘটনা ঘটেছে। সংস্থাটি আরব উপসাগর, ওমান উপসাগর ও উত্তর আরব সাগরে বাড়তি সামরিক তৎপরতার কারণে নাবিকদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছে।
হরমুজ প্রণালির ভেতরে অবস্থানরত বাংলাদেশের জাহাজটি হলো রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বিএসসির এমভি বাংলার জয়যাত্রা। জাহাজটিতে ৩১ জন বাংলাদেশি নাবিক রয়েছেন।
বিএসসি সূত্রে জানা যায়, ভারত থেকে পণ্য বহন করে ২ ফেব্রুয়ারি পারস্য উপসাগরে যায় জাহাজটি। পরে কাতার থেকে স্টিল কয়েল বোঝাই করে ২৭ ফেব্রুয়ারি সংযুক্ত আরব আমিরাতের জেবেল আলী বন্দরে পৌঁছায়। ইরানে হামলার পরপরই জাহাজটির কয়েক শ মিটার দূরের একটি তেল ডিপোতে আঘাত হানে ইরান। এরপরই জাহাজটিতে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করা হয় এবং পণ্য খালাস কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে।
জানতে চাইলে বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমোডর মাহমুদুল মালেক বলেন, জাহাজের সব নাবিক নিরাপদে আছেন। মাস্টারকে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন, প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ জোরদার এবং নাবিকদের মনোবল বজায় রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। জাহাজের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখা হচ্ছে।
রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধের সময় ২০২২ সালের ২ মার্চ ইউক্রেনের অলভিয়া বন্দরে বাংলাদেশি জাহাজ বাংলার সমৃদ্ধি রুশ ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। ওই ঘটনায় প্রকৌশলী হাদিসুর রহমান নিহত হন এবং ২৮ নাবিককে পরে উদ্ধার করা হয়।
বাংলাদেশি জাহাজের বড় অংশ এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যে পণ্য পরিবহন করে। চলমান সংঘাতের কারণে এ অঞ্চলে অন্য দেশের মতো বাংলাদেশি জাহাজ চলাচলেও তাই অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ মার্চেন্ট মেরিন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ক্যাপ্টেন আনাম চৌধুরী বলেন, যুদ্ধ পরিস্থিতিতে নাবিকদের নিরাপত্তাই প্রথম অগ্রাধিকার। হরমুজ প্রণালিতে অবস্থানরত নাবিকদের সঙ্গে সংগঠন থেকে যোগাযোগ রাখা হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় সহায়তার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
নৌবাণিজ্য অধিদপ্তরের প্রধান কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন সাব্বির মাহমুদ বলেন, ‘যুদ্ধ অঞ্চলের মতো ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় জাহাজ পরিচালনায় আন্তর্জাতিক ও দেশীয় বিধি মেনে চলার জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশি পতাকাবাহী জাহাজের জন্য এই নির্দেশনা দিয়েছি আমরা।’
