জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কোটিপতি প্রার্থী ৫০১ জন

■ নাগরিক প্রতিবেদক ■

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনোনয়নপত্র বৈধ হওয়া ১ হাজার ৮৪২ জন প্রার্থীর মধ্যে ৫০১ জনই কোটি টাকার বেশি সম্পদের মালিক। অর্থাৎ বুধবার পর্যন্ত মোট বৈধ প্রার্থীর ২৭ দশমিক ১৯ শতাংশই কোটিপতি। ৭ জন প্রার্থীর সম্পদের পরিমাণ শতকোটি টাকার বেশি।

সর্বোচ্চ কোটিপতি প্রার্থী বিএনপির। এই তালিকায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), জাতীয় পার্টি, অন্যান্য রাজনৈতিক দলের প্রার্থী এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীরাও রয়েছেন।

নির্বাচন কমিশন সূত্র জানায়, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় ত্রয়োদশ সংসদের ৩০০ আসনের জন্য মোট ৩ হাজার ৪০৬টি মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেন আগ্রহীরা। তবে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিন পর্যন্ত জমা পড়ে ২ হাজার ৫৬৮টি। এগুলোর মধ্যে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, এনসিপিসহ ৫১টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের ২ হাজার ৯০ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র দাখিল করেন। বাকি ৪৭৮ জন ছিলেন স্বতন্ত্র প্রার্থী। ৪ জানুয়ারি পর্যন্ত বাছাই শেষে ১ হাজার ৮৪২টি মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করেন সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তারা।

নির্বাচনী আইন অনুযায়ী, মনোনয়নপত্রের সঙ্গে প্রার্থীদের ১০ ধরনের তথ্য হলফনামায় উল্লেখ করতে হয়। এগুলোর মধ্যে রয়েছে পেশা, আয়ের উৎস, শিক্ষাগত যোগ্যতা, মামলা-সংক্রান্ত তথ্য এবং প্রার্থী ও তাঁর ওপর নির্ভরশীলদের সম্পদের বিবরণ। হলফনামায় অসত্য তথ্য দিলে প্রার্থিতা বাতিলের ক্ষমতা রয়েছে নির্বাচন কমিশনের। এমনকি নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার পরও হলফনামায় মিথ্যা তথ্য দেওয়ার প্রমাণ মিললে সংসদের মেয়াদ চলাকালীন সদস্যপদ বাতিল করা যেতে পারে। ২০০৮ সালে অনুষ্ঠিত নবম সংসদ নির্বাচন থেকে প্রার্থীদের হলফনামা দাখিল বাধ্যতামূলক করা হয়।

বৈধ প্রার্থীদের হলফনামা বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দল হিসেবে বিএনপির কোটিপতি প্রার্থী ২১২ জন। জামায়াতে ইসলামীর ৬৪ জন, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ৩৫, জাতীয় পার্টির ৩০, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের ১২; গণঅধিকার পরিষদ, এনসিপি ও আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি) ৫ জন করে এবং বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের ৪ জন প্রার্থী কোটিপতি। এ ছাড়া স্বতন্ত্র ৫৮ জন এবং অন্যান্য রাজনৈতিক দলের ৭১ জন প্রার্থী কোটিপতি।

হলফনামার তথ্য বলছে, বিভাগভিত্তিক হিসেবে সর্বোচ্চ কোটিপতি প্রার্থী ঢাকা বিভাগে, ১৪৩ জন। দ্বিতীয় অবস্থানে চট্টগ্রাম বিভাগ, যেখানে কোটিপতি প্রার্থী ১১৪ জন। রংপুর বিভাগে ৫১ জন, রাজশাহীতে ৪৭, খুলনায় ৪০, বরিশালে ৩৯, সিলেটে ৩৭ এবং ময়মনসিংহ বিভাগে ৩০ জন কোটিপতি প্রার্থী রয়েছেন।

বান্দরবান ছাড়া দেশের সব জেলায় অন্তত একজন কোটিপতি প্রার্থী রয়েছেন। সর্বোচ্চ কোটিপতি প্রার্থী ঢাকা জেলায়, ৫১ জন। এরপর চট্টগ্রামে ৩৬ জন এবং কুমিল্লায় ২১ জন কোটিপতি প্রার্থী রয়েছেন। নোয়াখালীতে ১৭, ময়মনসিংহে ১৬, নারায়ণগঞ্জে ১৫ ও সিলেটে ১৩ প্রার্থী আছেন এই তালিকায়।

বরিশাল, টাঙ্গাইল ও নরসিংদী জেলায় কোটিপতি প্রার্থী ১২ জন করে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ১১ এবং বগুড়া ও গাজীপুরে ১০ জন করে কোটিপতি প্রার্থী রয়েছেন। রংপুর ও সুনামগঞ্জে ৯ জন করে; চাঁদপুর, গাইবান্ধা, দিনাজপুর, মাদারীপুর ও মৌলভীবাজারে ৮ জন করে প্রার্থী কোটিপতি। বাগেরহাট, লালমনিরহাট, হবিগঞ্জ, রাজশাহী, ফেনী, নেত্রকোনা, নীলফামারী, খুলনা, গোপালগঞ্জ, নওগাঁ ও ঝালকাঠি জেলায় ৭ জন করে কোটিপতি প্রার্থী রয়েছেন।

জামালপুর, কক্সবাজার, নাটোর, ফরিদপুর, ভোলা, মানিকগঞ্জ, যশোর, লক্ষ্মীপুর ও সিরাজগঞ্জে রয়েছেন ৬ জন করে কোটিপতি প্রার্থী। শরীয়তপুর, পিরোজপুর, পাবনা, পটুয়াখালী, কুড়িগ্রাম ও কুষ্টিয়ায় ৫ জন করে; কিশোরগঞ্জ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, ঠাকুরগাঁও, নড়াইল, বরগুনা ও মুন্সিগঞ্জে ৪ জন করে এবং রাজবাড়ী, সাতক্ষীরা, পঞ্চগড় ও ঝিনাইদহে ৩ জন করে প্রার্থী এমন সম্পদের মালিক। মেহেরপুর, মাগুরা ও জয়পুরহাটে রয়েছেন ২ জন করে; রাঙামাটি, শেরপুর, খাগড়াছড়ি ও চুয়াডাঙ্গায় একজন করে কোটিপতি প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

হলফনামা অনুযায়ী, শীর্ষ ১০ সম্পদশালী প্রার্থীর মধ্যে ৬ জনই বিএনপির। বাকি ৪ জনের দুজন স্বতন্ত্র এবং জামায়াতে ইসলামীর একজন ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের একজন। শীর্ষ ২০ তালিকায় বিএনপির প্রার্থী ১৪ জন, স্বতন্ত্র ৪ এবং জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলনের একজন করে প্রার্থী রয়েছেন।

হলফনামায় উল্লেখ করা সম্পদের দিক থেকে শীর্ষে রয়েছেন চট্টগ্রাম-৪ (সীতাকুণ্ড) আসনে বিএনপির প্রার্থী মোহাম্মদ আসলাম চৌধুরী। তাঁর সম্পদের পরিমাণ ৩৬৫ কোটি ৫ লাখ ২৮ হাজার ৮৩৬ টাকা। দ্বিতীয় অবস্থানে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ (নাসিরনগর) আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী সৈয়দ এ কে একরামুজ্জামান, তাঁর সম্পদ ২৬৫ কোটি ৩ লাখ ২ হাজার ৯৫৭ টাকার।

তৃতীয় স্থানে থাকা কুমিল্লা-৮ (বরুড়া) আসনের বিএনপির প্রার্থী জাকারিয়া তাহেরের সম্পদ আছে ২০৪ কোটি ৬২ লাখ ৯ হাজার ৪৩০ টাকার। এরপর রয়েছেন লক্ষ্মীপুর-১ আসনে ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী মো. জাকির হোসেন পাটওয়ারী (তাঁর সম্পদ ১২৬ কোটি ৪৭ লাখ ৫৫ হাজার ৭৩৬ টাকার) এবং চাঁদপুর-৪ আসনে বিএনপির প্রার্থী মো. হারুনুর রশিদ (সম্পদ ১১৮ কোটি ২৩ লাখ ৩৫ হাজার ৩৬৯ টাকার)।

সম্পদে ষষ্ঠ ও সপ্তম স্থানে রয়েছেন ফেনী-৩ (সোনাগাজী–দাগনভূঞা) আসনে বিএনপির প্রার্থী আবদুল আউয়াল মিন্টু ও ঢাকা-৭ আসনে জামায়াতের প্রার্থী মো. এনায়াত উল্লা। আবদুল আউয়াল মিন্টুর সম্পদ ১১৬ কোটি ৯০ লাখ ৮৯ হাজার ১৫৯ টাকার। এনায়াত উল্লার সম্পদের পরিমাণ ১০৮ কোটি ৭৭ লাখ ৮০ হাজার ৯৯৯ টাকা।

সম্পদে শীর্ষস্থানীয় ১০ জনের শেষ তিনজন হলেন টাঙ্গাইল-৮ আসনে (বাসাইল-সখীপুর) স্বতন্ত্র প্রার্থী সালাউদ্দিন আলমগীর, ঢাকা-২০ আসনে বিএনপির প্রার্থী মো. তমিজ উদ্দিন ও ময়মনসিংহ-১১ (ভালুকা) আসনে বিএনপির ফখর উদ্দিন আহমেদ। তাঁদের সম্পদের পরিমাণ যথাক্রমে ৯৮ কোটি ৮৫ লাখ ১৯ হাজার ৬৩৮ টাকা, ৮৯ কোটি ৮৫ লাখ ১৯ হাজার ১১২ টাকা এবং ৮৪ কোটি ৭৫ লাখ ১ হাজার ২৯১ টাকা।

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *