■ নাগরিক নিউজ ডেস্ক ■
ইরানি রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি জানিয়েছে, দেশজুড়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের অব্যাহত বিমান হামলায় নিহতের সংখ্যা ৫৫০ ছাড়িয়ে গেছে।
সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী এখন পর্যন্ত অন্তত ৫৫৫ জন প্রাণ হারিয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছে সংস্থাটি। নিহতের এই সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে, কারণ অনেক এলাকায় উদ্ধার অভিযান এখনও চলমান।
এই ভয়াবহ প্রাণহানির ঘটনায় ইরানজুড়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছে এবং উদ্ধারকর্মীরা ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন।
৩৫ হাজারের ইরানি ড্রোন ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্রের খরচ ৪০ লাখ ডলার
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর পাল্টা আক্রমণ শুরু করেছে ইরান। তবে তেহরানের একেকটি সস্তা ড্রোন ঠেকাতে পশ্চিমাদের যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় হচ্ছে, তাতে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে তাদের প্রতিরক্ষাব্যবস্থার (ক্ষেপণাস্ত্র) মজুত ফুরিয়ে যাওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের একেকটি ড্রোন তৈরিতে খরচ হয় মাত্র ৩৫ হাজার ডলার। বিপরীতে এটি ধ্বংস করতে একেকটি ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের পেছনে ব্যয় হচ্ছে ৫ থেকে ৪০ লাখ ডলার পর্যন্ত। এটিই এখন পশ্চিমা সামরিক পরিকল্পনাকারীদের প্রধান দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ইরান বর্তমানে ইসরায়েল ছাড়াও সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, বাহরাইন, কাতার ও সৌদি আরবে অবস্থিত মার্কিন এবং মিত্রদের ঘাঁটিতে একসঙ্গে হামলা চালাচ্ছে। তেহরান প্রতিদিন ২ হাজার ৫০০-এর বেশি ড্রোন ছুড়ে তাদের শত্রুদের প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে বিভ্রান্ত করে ফেলেছে। কারণ, একটি ঘাঁটিকে রক্ষা করতে ব্যবহৃত ইন্টারসেপ্টর অন্য কোথাও ব্যবহার করা সম্ভব নয়।
ওপেন সোর্স ইন্টেলিজেন্স ও প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের তথ্য অনুযায়ী, ইরানের কাছে বর্তমানে ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ ‘শাহেদ’ ড্রোন মজুত আছে। মাসে অন্তত ৫০০ ড্রোন তৈরির সক্ষমতা থাকায় তারা টানা এক মাস প্রতিদিন ২ হাজার ৫০০ ড্রোন দিয়ে হামলা চালিয়ে যাওয়ার সামর্থ্য রাখে।
২০২৫ সালের জুনের লড়াইয়েই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত ব্যাপক হারে কমে গিয়েছিল। তখন মাত্র ১২ দিনে ইসরায়েলকে রক্ষা করতে যুক্তরাষ্ট্র ১৫০টি থাড (প্রতিরক্ষাব্যবস্থা) ইন্টারসেপ্টর ব্যবহার করেছিল, যা তাদের মোট মজুতের এক-চতুর্থাংশ। প্রতিটি থাড ইন্টারসেপ্টরের দাম প্রায় ১৫ মিলিয়ন (দেড় কোটি) ডলার এবং এটি নতুন করে তৈরি করতে তিন থেকে আট বছর সময় লাগে।
স্টিমসন সেন্টারের সিনিয়র ফেলো কেলি গ্রিকো ব্লুমবার্গকে বলেন, ‘অ্যান্টি-ব্যালিস্টিক ইন্টারসেপ্টর নিয়ে আমরা খুবই উদ্বিগ্ন। আমরা এগুলো তৈরির চেয়ে দ্রুত হারে ব্যবহার করে ফেলছি। সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী, একটি লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করতে ২-৩টি ইন্টারসেপ্টর ছুড়তে হয়, যা মজুতকে দ্রুত শূন্য করে দিতে পারে।’
প্যাসিফিক ফোরামের উইলিয়াম আলবার্ক জানান, অ্যান্টি-ব্যালিস্টিক ইন্টারসেপ্টরের মজুত আগে থেকে কম ছিল, যা এখন কয়েক দিনের মধ্যে শেষ হয়ে যেতে পারে। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ডেইলি মেইলকে বলেন, এই যুদ্ধ আগামী চার সপ্তাহের মধ্যে শেষ হতে পারে। অর্থাৎ ইরান যদি ড্রোন হামলা জারি রাখে, তাহলে ট্রাম্পের দেওয়া সময়ের আগেই তাঁর অ্যান্টি-ব্যালিস্টিক ইন্টারসেপ্টরের মজুত শেষ হয়ে যেতে পারে।
এদিকে বিপুল খরচ কমাতে পশ্চিমারা এখন ‘এপিকেডব্লিউএস’ গাইডেড রকেট ব্যবহারের চেষ্টা করছে, যার প্রতি শটের খরচ মাত্র ২৮ হাজার ডলার। এ ছাড়া ইসরায়েলের ‘আয়রন বিম’ লেজার সিস্টেম ব্যবহারের কথাও ভাবা হচ্ছে, যার খরচ প্রতি শটে মাত্র কয়েক ডলার। তবে বর্তমানে এই লেজার সিস্টেমের মাত্র এক-দুটি সচল আছে এবং সেগুলো শুধু ইসরায়েলেই সীমাবদ্ধ।
সাবেক ইসরায়েলি নৌ কমান্ডার ইয়াল পিনকো বলেন, সামনে আরও অনেক হামলা আসছে। ইরানের কাছে হাজার হাজার ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের বিশাল মজুত আছে। শাসনব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে এবং নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষায় তারা এখন সর্বাত্মক যুদ্ধে লিপ্ত।
ট্রাম্পের হুমকি, পাশে চীন
এসব হামলার পর কড়া হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন ট্রাম্প। সিএনএনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা এখনো তাদের (ইরান) ওপর কঠোর আঘাত করা শুরুই করিনি। বড় ধরনের হামলা এখনো আসেনি। মূল আক্রমণটি শিগগিরই আসছে।
এই পরিস্থিতিতে তেহরানের প্রতি জোরালো সমর্থন ব্যক্ত করেছে চীন। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের তীব্র সমালোচনা করে বেইজিং একে ‘জঙ্গলের আইন’-এর সঙ্গে তুলনা করেছে।
চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম সিসিটিভি জানিয়েছে, দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচিকে ফোন করে বেইজিংয়ের অবস্থান পরিষ্কার করেছেন। ওয়াং ই বলেন, চীন ও ইরানের মধ্যকার ঐতিহাসিক বন্ধুত্বকে বেইজিং অত্যন্ত গুরুত্ব দেয়। ইরানের সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা, আঞ্চলিক অখণ্ডতা ও জাতীয় মর্যাদা রক্ষায় চীন পূর্ণ সমর্থন জানায়; পাশাপাশি ইরানের বৈধ অধিকার ও স্বার্থরক্ষায় পাশে থাকবে বেইজিং।
ওয়াং ই অবিলম্বে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে তাদের সামরিক অভিযান বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, উত্তেজনা যেন আর বাড়ে এবং এই সংঘাত যেন পুরো মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে না পড়ে, সেদিকে লক্ষ রাখা জরুরি।
আলোচনার আহ্বান
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনা কমাতে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে আবারও তাৎক্ষণিক যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়েছে রাশিয়া ও সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই)। রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গতকাল ফোনে বৈঠক করেছেন ভ্লাদিমির পুতিন এবং ইউএইর প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ বইন জায়েদ আল নাহিয়ান। তাঁরা উভয়ে অবিলম্বে যুদ্ধবিরতির ওপর জোর দেন।
আল জাজিরা জানায়, রাশিয়ার বিবৃতিতে ইরানের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক সামরিক পদক্ষেপের নিন্দা জানানো হয়েছে। ইরানে হামলাকে তারা ‘জাতিসংঘের একটি সার্বভৌম সদস্যের বিরুদ্ধে উসকানিবিহীন সশস্ত্র আগ্রাসন’ হিসেবে উল্লেখ করে। রুশ বিবৃতিতে বলা হয়, দুই নেতা মধ্যপ্রাচ্যের ‘মর্মান্তিক পরিস্থিতি’ নিয়ে আলোচনা করেছেন। উভয়ে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় সমাধানের গুরুত্ব তুলে ধরেন। তবে আমিরাতের প্রেসিডেন্ট বলেছেন, তাঁদের ভূখণ্ড ইরানের বিরুদ্ধে হামলার ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে না। এরপরও ইরান তাদের দেশকে লক্ষ্যবস্তু করছে, যা ‘অযৌক্তিক’।
