■ নাগরিক প্রতিবেদক ■
গত ফেব্রুয়ারি মাসে ৫৯৬টি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৫৭৮ জন এবং আহত কমপক্ষে ১ হাজার ৩২৭ জন। এর মধ্যে ২৪১টি ঘটেছে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা। এতে নিহত হয়েছেন ২২৭ জন, যা সড়ক দুর্ঘটনায় মোট নিহতের ৩৯ দশমিক ২৭ শতাংশ। আর মোট দুর্ঘটনার ৪০ দশমিক ৪৩ শতাংশ মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা।
আলোচ্য সময় দুর্ঘটনায় ১১৪ জন পথচারী নিহত হয়েছেন, যা মোট নিহতের ১৯.৭২ শতাংশ। যানবাহনের চালক ও সহকারী নিহত হয়েছেন ৮২ জন, অর্থাৎ ১৪.১৮ শতাংশ।
এই সময়ে ২টি নৌ-দুর্ঘটনায় ৪ জন নিহত, ২ জন আহত হয়েছেন। ১৪টি রেল ট্র্যাক দুর্ঘটনায় ১৩ জন নিহত এবং ৬ জন আহত হয়েছেন।
শনিবার ফেব্রুয়ারি মাসের সড়ক দুর্ঘটনার প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন। সংগঠনটির প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশন ৯টি জাতীয় দৈনিক,৭টি নিউজ পোর্টাল, বিভিন্ন ইলেকট্রনিক মিডিয়া এবং নিজস্ব তথ্যের ভিত্তিতে দুর্ঘটনার প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে।
গত জানুয়ারি মাসে ৬২১টি দুর্ঘটনায় ৬০৮ জন নিহত হয়েছিল। প্রতিদিন গড়ে নিহত হয়েছিল ১৯.৬১জন। ফেব্রুয়ারি মাসে ৫৯৬টি দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে ৫৭৮ জন। প্রতিদিন গড়ে নিহত হয়েছে ২০.৬৪ জন। এই হিসেবে প্রাণহানি বেড়েছে ৫.২৫%
যানবাহনভিত্তিক নিহতের চিত্র:
দুর্ঘটনায় যানবাহনভিত্তিক নিহতের পরিসংখ্যানে দেখা যায়- মোটরসাইকেল চালক ও আরোহী ২২৭ জন (৩৯.২৭%), বাসের যাত্রী ৩৩ জন (৫.৭০%), ট্রাক-কাভার্ডভ্যান-পিকআপ-ট্রাক্টর-ট্রলি-ড্রাম ট্রাক আরোহী ৫৬ জন (৯.৬৮%), প্রাইভেটকার-মাইক্রোবাস আরোহী ২২ জন (৩.৮০%), থ্রি-হুইলার যাত্রী (ইজিবাইক-সিএনজি-অটোরিকশা-অটোভ্যান-লেগুনা) ৯২ জন (১৫.৯১%), স্থানীয়ভাবে তৈরি যানবাহনের যাত্রী (নসিমন-ভটভটি-মাহিন্দ্র-টমটম-এস্কেভেটর) ২০ জন (৩.৪৬%) এবং বাইসাইকেল-রিকশা আরোহী ১৪ জন (২.৪২%) নিহত হয়েছেন।
দুর্ঘটনা সংঘটিত সড়কের ধরন:
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ বলছে, দুর্ঘটনাগুলোর মধ্যে ২০৯টি (৩৫.০৬%) জাতীয় মহাসড়কে, ২৬৮টি (৪৪.৯৬%) আঞ্চলিক সড়কে, ৭৩টি (১২.২৪%) গ্রামীণ সড়কে এবং ৪৬টি (৭.৭১%) শহরের সড়কে সংঘটিত হয়েছে।
দুর্ঘটনার ধরন:
দুর্ঘটনাসমূহের ১৪২টি (২৩.৮২%) মুখোমুখি সংঘর্ষ, ২৫৩টি (৪২.৪৪%) নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে, ১২১টি (২০.৩০%) পথচারীকে চাপা/ধাক্কা দেয়া, ৬২টি (১০.৪০%) যানবাহনের পেছনে আঘাত করা এবং ১৮টি (৩.০২%) অন্যান্য কারণে ঘটেছে।
দুর্ঘটনায় সম্পৃক্ত যানবাহন:
দুর্ঘটনায় সম্পৃক্ত যানবাহনের মধ্যে- ট্রাক-কাভার্ডভ্যান-পিকআপ-ট্রাক্টর-ট্রলি-লরি-ড্রাম ট্রাক-তেলবাহী ট্যাঙ্কার-মিকচার ট্রাক-রোলার-ভেকু মেশিন-এস্কেভেটর ৩১%, যাত্রীবাহী বাস ১৩.৯৬%, মাইক্রোবাস-প্রাইভেটকার-অ্যাম্বুলেন্স ৩.৩০%, মোটরসাইকেল ২৬.৪৩%, থ্রি-হুইলার (ইজিবাইক-সিএনজি-অটোরিকশা-অটোভ্যান-লেগুনা) ১৪.৪৯%, স্থানীয়ভাবে তৈরি যানবাহন (নসিমন-করিমন-ভটভটি-টমটম-মাহিন্দ্র-বোরাক-চান্দের গাড়ি) ৫.৭৫%, বাইসাইকেল-রিকশা ১.৭০% এবং অজ্ঞাত যানবাহন ৩.৪১%।
দুর্ঘটনায় সম্পৃক্ত যানবাহনের সংখ্যা:
দুর্ঘটনায় সম্পৃক্ত যানবাহনের সংখ্যা ৯৩৮টি। (বাস ১৩১, ট্রাক ১৬৪, কাভার্ডভ্যান ২১, পিকআপ ৪২, ট্রাক্টর ১৫, ট্রলি ২০, লরি ৭, ড্রাম ট্রাক ৮ তেলবাহী ট্যাঙ্কার ৫, মিকচার ট্রাক ৩, রোলার ১, ডাম্পার ৩, ভেকু মেশিন ১, এস্কেভেটর ১, মাইক্রোবাস ১৬, প্রাইভেটকার ৮, অ্যাম্বুলেন্স ৩, জীপ ৪, মোটরসাইকেল ২৪৮, থ্রি-হুইলার ১৩৬ (ইজিবাইক-সিএনজি-অটোরিকশা-অটোভ্যান-লেগুনা), স্থানীয়ভাবে তৈরি যানবাহন ৫৪ (নসিমন-করিমন-ভটভটি-টমটম-মাহিন্দ্র-বোরাক-চান্দের গাড়ি), বাইসাইকেল-রিকশা ১৬ এবং অজ্ঞাত যানবাহন ৩১টি।
দুর্ঘটনার সময় বিশ্লেষণ:
সময় বিশ্লেষণে দেখা যায়, দুর্ঘটনাসমূহ ঘটেছে ভোরে ৪.১৯%, সকালে ২৮.৮৫%, দুপুরে ১৯.৬৩%, বিকালে ১৯.৯৬%, সন্ধ্যায় ৮.২২% এবং রাতে ১৯.১২%।
দুর্ঘটনার বিভাগওয়ারী পরিসংখ্যান:
দুর্ঘটনার বিভাগওয়ারী পরিসংখ্যান বলছে, ঢাকা বিভাগে দুর্ঘটনা ৩৪.৩৯%, প্রাণহানি ৩৪.২৫%, রাজশাহী বিভাগে দুর্ঘটনা ১০.২৩%, প্রাণহানি ১২.১১%, চট্টগ্রাম বিভাগে দুর্ঘটনা ১৮.১২%, প্রাণহানি ১৭.৮২%, খুলনা বিভাগে দুর্ঘটনা ৯.৮৯%, প্রাণহানি ৮.৬৫%, বরিশাল বিভাগে দুর্ঘটনা ৫.৭০%, প্রাণহানি ৫.৮৮%, সিলেট বিভাগে দুর্ঘটনা ৬%, প্রাণহানি ৬.৪০%, রংপুর বিভাগে দুর্ঘটনা ৮.৩৮%, প্রাণহানি ৮.৩০% এবং ময়মনসিংহ বিভাগে দুর্ঘটনা ৭.২১%, প্রাণহানি ৬.৫৭% ঘটেছে।
ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশি ২০৫টি দুর্ঘটনায় ১৯৮ জন নিহত হয়েছেন। বরিশাল বিভাগে সবচেয়ে কম ৩৪টি দুর্ঘটনায় ৩৪ জন নিহত হয়েছেন। একক জেলা হিসেবে ঢাকা জেলায় ৪১টি দুর্ঘটনায় ৪৮ জন নিহত হয়েছে। সবচেয়ে কম মৌলভীবাজার জেলায়। এই জেলায় কয়েকটি দুর্ঘটনা ঘটলেও প্রাণহানি ঘটেনি।
রাজধানী ঢাকায় ৩৪টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২৭ জন নিহত এবং ৩৬ জন আহত হয়েছে।
নিহতদের পেশাগত পরিচয়:
গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে জানা যায়, পুলিশ সদস্য ২ জন, বিভিন্ন স্কুল-কলেজ-মাদরাসার শিক্ষক ১১ জন, সাংবাদিক ৪ জন, চিকিৎসক ২ জন, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়েরে রেজিস্ট্রার ১ জন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা ১ জন, মেরিন ইঞ্জিনিয়ার ১ জন, বিভিন্ন ব্যাংক-বীমা কর্মকর্তা ও কর্মচারী ৬ জন, বিভিন্ন এনজিও কর্মকর্তা-কর্মচারী ১১ জন, ঔষধ ও বিভিন্ন পণ্যসামগ্রী বিক্রয় প্রতিনিধি ২৩ জন, স্থানীয় পর্যায়ের বিভিন্ন ব্যবসায়ী ২৯ জন, ২ জন ইউপি মেম্বারসহ স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা ১৪ জন, বিদ্যুৎ মিস্ত্রি ২ জন, ইমাম-মুয়াজ্জিন ৫ জন, হাসপাতালের ক্লিনার ২ জন, পোশাক শ্রমিক ৬ জন, নির্মাণ শ্রমিক ১১ জন, রাজমিস্ত্রি ২ জন, প্রতিবন্ধী ৩ জন এবং দেশের বিভিন্ন স্কুল-মাদরাসা ও কলেজের ৬৭ জন শিক্ষার্থী নিহত হয়েছে।
সড়ক দুর্ঘটনার প্রধান কারণসমূহ:
১. ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন; ২. বেপরোয়া গতি; ৩. চালকদের বেপরোয়া মানসিকতা, অদক্ষতা ও শারীরিক-মানসিক অসুস্থতা; ৪. বেতন-কর্মঘন্টা নির্দিষ্ট না থাকা; ৫. মহাসড়কে স্বল্পগতির যানবাহন চলাচল; ৬. তরুণ-যুবদের বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানো; ৭. জনসাধারণের মধ্যে ট্রাফিক আইন না জানা ও না মানার প্রবণতা; ৮. দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা; ৯. বিআরটিএ’র সক্ষমতার ঘাটতি; ১০. গণপরিবহন খাতে চাঁদাবাজি।
সুপারিশসমূহ:
১. দক্ষ চালক তৈরির উদ্যোগ বৃদ্ধি করতে হবে; ২. চালকদের বেতন-কর্মঘন্টা নির্দিষ্ট করতে হবে; ৩. বিআরটিএ’র সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে; ৪. পরিবহন মালিক-শ্রমিক, যাত্রী ও পথচারীদের প্রতি ট্রাফিক আইনের বাধাহীন প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে; ৫. মহাসড়কে স্বল্পগতির যানবাহন বন্ধ করে এগুলোর জন্য আলাদা পার্শ্ব রাস্তা (সার্ভিস রোড) তৈরি করতে হবে; ৬. পর্যায়ক্রমে সকল মহাসড়কে রোড ডিভাইডার নির্মাণ করতে হবে; ৭. গণপরিবহনে চাঁদাবাজি বন্ধ করতে হবে; ৮. রেল ও নৌ-পথ সংস্কার করে সড়ক পথের উপর চাপ কমাতে হবে; ৯. টেকসই পরিবহন কৌশল প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে; ১০. “সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮” বাধাহীনভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে।
মন্তব্য:
অধিকাংশ দুর্ঘটনা ঘটছে অতিরিক্ত গতির কারণে যানবাহন নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে। এই গতি নিয়ন্ত্রণে প্রযুক্তির মাধ্যমে নজরদারী এবং চালকদের মোটিভেশনাল প্রশিক্ষণ দরকার। যানবাহনের বেপরোয়া গতি এবং পথচারীদের অসচেতনতার কারণে পথচারী নিহতের ঘটনা বাড়ছে। এজন্য সরকারি উদ্যোগে গণমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জীবনমুখি সচেতনতামূলক প্রচারণা চালাতে হবে।
পেশাগত সুযোগ-সুবিধা বিশেষ করে, নিয়োগপত্র, বেতন ও কর্মঘন্টা নির্দিষ্ট না থাকার কারণে বাস এবং পণ্যবাহী যানবাহনের অধিকাংশ চালক শারীরিক ও মানসিকভাবে অসুস্থ। তারা সবসময় অস্বাভাবিক আচরণ করেন এবং বেপরোয়াভাবে যানবাহন চালান। ফলে দুর্ঘটনায় আক্রান্ত হন। তাই, সড়ক দুর্ঘটনা রোধ করতে হলে পরিবহন শ্রমিকদের পেশাগত সুযোগ-সুবিধা এবং সড়ক পরিবহন নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠানসমূহের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।