■ নাগরিক প্রতিবেদক ■
দেশের ব্যাংক ও ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানে নারী কর্মীর সংখ্যা কমছে। গত ছয় মাসে ব্যাংকে ৭২১ জন এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ৪৯ জন নারী কর্মী কমেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত ব্যাংক ও আর্থিক খাতের নারী-পুরুষ সমতা বিষয়ক সর্বশেষ প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
গত ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে নারী কর্মীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৫ হাজার ৬১ জন, যা গত বছরের জুন শেষে ছিল ৩৫ হাজার ৭৮২ জন। একই সময়ে ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানে নারী কর্মী কমে ১ হাজার ১৯ জনে নেমেছে, যা জুন শেষে ছিল ১ হাজার ৬৮ জন।
বর্তমানে ৬১টি ব্যাংক ও ৩৫টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের তথ্যের ভিত্তিতে প্রস্তুত প্রতিবেদনে দেখা যায়, গত ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক ও আর্থিক খাতে মোট কর্মী ছিল ২ লাখ ১৮ হাজার ৪৮৭ জন। এর মধ্যে পুরুষ ১ লাখ ৮২ হাজার ৪০৭ জন এবং নারী ৩৬ হাজার ৮০ জন। সে হিসাবে এ খাতে মোট কর্মীর প্রায় সাড়ে ১৬ শতাংশ নারী।
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সংকটে থাকা কয়েকটি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের একীভূতকরণ ও বন্ধের উদ্যোগ নেওয়ায় কর্মী ছাঁটাই ও স্বেচ্ছায় চাকরি ছাড়ার ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে নারী কর্মীও রয়েছেন।
ব্যাংক ও আর্থিক খাতে যত নারী কর্মী রয়েছেন, তার সিংহভাগই বেসরকারি ব্যাংকে। গত বছর শেষে নারী কর্মীদের মধ্যে ২২ হাজার ৯৮৩ জন বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকের। আর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৯ হাজার ১৪৭ নারী কর্মী কর্মরত রয়েছেন রাষ্ট্রমালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংকে। এ ছাড়া গত বছর শেষে বিশেষায়িত বাণিজ্যিক ব্যাংকে ১ হাজার ৯৪৭ জন এবং বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংকে ৯৮৪ নারী কর্মী কর্মরত ছিলেন। শতাংশের বিবেচনায় গত বছর শেষে সবচেয়ে বেশি নারী কর্মী কর্মরত ছিলেন বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংকে। এ খাতে ব্যাংকের মোট ৩ হাজার ৯৩১ কর্মীর মধ্যে ৯৮৪ জনই ছিলেন নারী, শতাংশের হিসাবে যা ২৫ শতাংশের বেশি। সংখ্যার হিসাবে বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকে নারী কর্মীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি হলেও শতাংশের হিসাবে এ খাতের ব্যাংকে নারীর অংশগ্রহণ কম। বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকের মোট কর্মীর মধ্যে ১৬ শতাংশ নারী।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, ব্যাংকে নারী কর্মীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি কর্মী ব্যাংকের প্রারম্ভিক পর্যায়ে কর্মরত—এই হার ১৭ শতাংশের বেশি। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১৬ দশমিক ১৯ শতাংশ নারী কর্মী কর্মরত মধ্যবর্তী পর্যায়ে।
তবে পদভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ব্যাংক খাতে উচ্চপর্যায়ের পদে নারীর উপস্থিতি সবচেয়ে কম। এ পর্যায়ে নারী কর্মীর হার মাত্র ১০ দশমিক ৩৫ শতাংশ।
ব্যাংক খাত–সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২০২৪ সালে দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সংকটে থাকা বেশ কিছু ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান একীভূত ও বন্ধের উদ্যোগ নেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। সরকারও তাতে সায় দিয়েছে। এসব উদ্যোগের কারণে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে বাদ পড়েছেন বা চাকরি ছেড়েছেন অনেক নারী কর্মী। এ ছাড়া পারিবারিক ও সামাজিক নানা কারণেও এ সময়ে অনেক নারী চাকরি ছেড়েছেন। দুই মিলিয়ে তাই ব্যাংকে নারী কর্মীর সংখ্যা কমেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং অ্যান্ড ইনস্যুরেন্স বিভাগের অধ্যাপক হাসিনা শেখ বলেন, বাংলাদেশে নারীদের ওপর সামাজিক প্রত্যাশা তাদের পেশাজীবনে বড় প্রভাব ফেলে। তিনি বলেন, ‘যখন আমরা একজন নারীর কথা ভাবি, তখন আমাদের মনে মা, বোন, কন্যা বা পুত্রবধূর ছবি ভেসে ওঠে। এসব প্রত্যাশা তাদের কর্মজীবনে সরাসরি প্রভাব ফেলে।’
অধ্যাপক হাসিনা শেখ আরও বলেন, তার ক্লাসরুমে ছাত্র-ছাত্রীর অনুপাত প্রায় সমান, এমনকি কখনো কখনো মেয়েরা সংখ্যায় ছেলেদেরকে ছাড়িয়ে যায়। প্রশ্ন হলো, পড়ালেখা শেষ করে তারা কোথায় যান? উৎসাহ নিয়ে ব্যাংকিং ক্যারিয়ার শুরু করলেও অনেকেই বিয়ে বা সন্তান জন্মের পর চাকরি ছেড়ে দেন।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, ব্যাংক খাতে নারীর প্রতিনিধিত্ব কমে যাওয়ার এই প্রবণতা উৎসাহব্যঞ্জক নয়। তার মতে, কর্মক্ষেত্রের পরিবেশসহ বিভিন্ন বিষয়ের ওপর নারীর অংশগ্রহণ নির্ভর করে। তিনি যোগ্য নারীদের জন্য ঊর্ধ্বতন ও বোর্ড পর্যায়ে যাওয়ার সুস্পষ্ট পথ তৈরি করতে ব্যাংকগুলোকে আরও সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানান।
