■ নাগরিক প্রতিবেদন ■
চলতি ফেব্রুয়ারি মাসে মাত্র ২৬ দিনের ব্যবধানে দেশে আটবার ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। সর্বশেষ বুধবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) রাতে মিয়ানমারে সৃষ্ট ৫.১ মাত্রার একটি মাঝারি ভূমিকম্পে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা কেঁপে ওঠে।
আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, বুধবার রাত ১০টা ৫১ মিনিটে অনুভূত এই কম্পনটির উৎপত্তিস্থল ছিল ভূপৃষ্ঠের ১২৯ কিলোমিটার গভীরে। এতে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি।
গত ১ ফেব্রুয়ারি সিলেটে ৩ মাত্রার মৃদু কম্পন দিয়ে শুরু হয়ে ৩ ফেব্রুয়ারি একই দিনে তিনবার ভূকম্পন অনুভূত হয়। এর মধ্যে সাতক্ষীরার কলারোয়ায় ৪.১ মাত্রা এবং মিয়ানমারে ৫.৯ ও ৫.২ মাত্রার দুটি কম্পন ছিল। এরপর ৯ ও ১০ ফেব্রুয়ারি সিলেটে আরও দুবার এবং ১৯ ফেব্রুয়ারি সুনামগঞ্জের ছাতকে ৪.১ মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হয়। সব মিলিয়ে ২৬ দিনে আটবার কেঁপেছে দেশ।
এর আগে গত ২১ নভেম্বর, শুক্রবার সকাল ১০টা ৩৮ মিনিটের দিকে ৫.৭ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্পে দেশে ১০ জন নিহত ও শতাধিক মানুষ আহত হয়েছিলেন।
এরপর ২২ নভেম্বর (শনিবার) সাড়ে সাত ঘণ্টার মধ্যে তিনবার ভূমিকম্প অনুভূত হয়। সকালে নরসিংদীর পলাশ উপজেলায় ৩.৩ মাত্রার একটি মৃদু কম্পন অনুভূত হয়। সন্ধ্যায় দুটি কম্পন পরপর নরসিংদী এবং রাজধানীর বাড্ডায় অনুভূত হয়, যথাক্রমে ৪.৩ এবং ৩.৭ মাত্রার। যদিও এই কম্পনগুলি মূল ভূমিকম্পের তুলনায় হালকা ছিল, তবুও জনসাধারণের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছিল।
ভূমিকম্প মোকাবিলায় দেশের প্রস্তুতি এখনও অনেক ক্ষেত্রে উদ্ধার তৎপরতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। অবকাঠামোগত ঝুঁকি কমাতে বিল্ডিং কোড কঠোরভাবে অনুসরণ করা এবং ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের তালিকা তৈরি করা এখন সময়ের দাবি।
ভূতত্ত্ববিদ অধ্যাপক সৈয়দ হুমায়ুন আখতার সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, ছোট ও মাঝারি মাত্রার এই ঘন ঘন কম্পন বড় কোনো ভূমিকম্পের পূর্বলক্ষণ হতে পারে। ভূত্বকের নিচে দীর্ঘদিন ধরে শক্তি জমা হয়ে থাকলে তা বড় বিপর্যয়ের ঝুঁকি তৈরি করে। বাংলাদেশ ভারতীয় ও ইউরেশীয় টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলে অবস্থিত হওয়ায় ভৌগোলিকভাবেই অত্যন্ত ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলে রয়েছে। ছোট কম্পনগুলো আসলে নির্দেশ করছে যে ভূ-অভ্যন্তরে বড় ধরনের অস্থিরতা বিরাজ করছে।
বাংলাদেশে সংগঠিত উল্লেখযোগ্য ভূমিকম্পসমূহ
১৭৬২ সালের আরাকান ভূমিকম্প: এ ভূমিকম্পের ফলে চট্টগ্রামের উপকূলীয় এলাকায় বড় পরিবর্তন ঘটে, প্রায় ১৫৫ বর্গ কিমি এলাকা তলিয়ে যায় এবং ঢাকাতে ৫০০ জন মারা যায় ।
১০ জানুয়ারি, ১৮৬৯-এর শিলচর/আসাম ভূমিকম্প: এ ভূমিকম্পে সিলেট ও অন্যান্য অঞ্চলে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল।
১২ জুন, ১৮৯৭-এর প্রলয়ঙ্করী ভূমিকম্প (আসাম-বাংলা ভূমিকম্প): এটি ভারতের শিলং মালভূমি থেকে উৎপন্ন হলেও বাংলাদেশ (তৎকালীন বাংলা) ও আসামে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। এর মাত্রা ছিল ৮.৭।
৮ জুলাই, ১৯১৮-এর শ্রীমঙ্গল ভূমিকম্প: রিখটার স্কেলে ৭.৬ মাত্রার এই ভূমিকম্পে শ্রীমঙ্গল ও আশেপাশে অনেক দালানকোঠা ধ্বংস হয় ।
২ জুলাই, ১৯৩০-এর ধুবরী ভূমিকম্প: এই ভূমিকম্পটি ভারতের আসামের ধুবরী অঞ্চল থেকে উৎপন্ন হলেও বাংলাদেশে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছিল ।
১৫ জানুয়ারি, ১৯৩৪-এর বিহার-নেপাল ভূমিকম্প: এটি ৮ মাত্রার ভূমিকম্প ছিল, যা বাংলাদেশে, বিশেষ করে রংপুর ও আশেপাশের এলাকায় ব্যাপক প্রভাব ফেলেছিল
১৫ আগস্ট, ১৯৫০-এর আসাম ভূমিকম্প: এটি বিংশ শতকের অন্যতম প্রধান (৮.৭ মাত্রা) ভূমিকম্প। বাংলাদেশে এর তীব্রতা অনুভূত হলেও তেমন বড় কোনো ক্ষয়ক্ষতির রেকর্ড নেই।
১৪ জুলাই, ১৯৮৫-এর মানিকগঞ্জ ভূমিকম্প: বাংলাদেশের ভূখণ্ডে (মানিকগঞ্জ) উৎপন্ন ৭.১ মাত্রার এই ভূমিকম্পটি বড় ধরণের কম্পন তৈরি করেছিল ।
২১ নভেম্বর, ১৯৯৭-এর চট্টগ্রাম ভূমিকম্প: ৬ মাত্রার এই ভূমিকম্পে চট্টগ্রামের অনেক ভবনে ফাটল দেখা দেয়।
২২ জুলাই, ১৯৯৯-এর মহেশখালী ভূমিকম্প: মহেশখালী দ্বীপে উৎপন্ন ৫.২ মাত্রার এই ভূমিকম্পে ঘরবাড়ির ক্ষতি হয় ।
২২ নভেম্বর, ২০২৫-এর বাংলাদেশ ভূমিকম্প: নরসিংদীর মাধবদী থেকে উৎপন্ন ৫.৪ (USGS) বা ৫.৭ (BMD) মাত্রার ভূমিকম্প, যা ঢাকা সহ বিভিন্ন স্থানে অনুভূত হয়।
