জিয়ার সমাধির পাশে খালেদা জিয়া চিরনিদ্রায় শায়িত

■ নাগরিক প্রতিবেদন ■ 

রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার দাফন সম্পন্ন হয়েছে। বুধবার বিকাল সাড়ে ৪টার পর জিয়া উদ্যানে স্বামী শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত হন তিনি।

খালেদা জিয়ার কবরে সবার আগে নামেন বড় ছেলে ও দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। নিজ হাতে তিনি তার মাকে কবরে চিরনিদ্রায় শায়িত করেন। বেগম খালেদা জিয়ার দাফনের পর সশস্ত্র বাহিনীর পক্ষ থেকে গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়।

দাফনের সময় বিএনপির চেয়ারপারসনের কবরে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার উজ জামানসহ তিন বাহিনীর প্রধান ও অন্যান্য সবাই মাটি দিয়ে খালেদা জিয়াকে সন্মান জানান। অন্যদিকে পরিবারের নারীর সদস্যরা হাত দিয়ে তার মরদেহ ছুঁয়ে দেন।

এর আগে বিকাল ৩টার পর মানিক মিয়া এভিনিউতে খালেদা জিয়ার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় অংশ নিতে বিপুল-সংখ্যক মানুষের উপস্থিতিতে সেখানে জনস্রোতের সৃষ্টি হয়।জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতিব মুফতি মোহাম্মদ আবদুল মালেক বেগম খালেদা জিয়ার জানাজা পড়ান।

বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার জানাজার আগে উপস্থিত মুসল্লিসহ দেশবাসীর কাছে দোয়া চেয়েছেন তার ছেলে ও দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান।

জানাজার আগে তারেক রহমান বলেন, তার মা মরহুমা বেগম খালেদা জিয়া কারো কাছ থেকে কোনো ঋণ নিয়ে থাকলে তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে অনুরোধ জানান। তিনি বলেন, সে ক্ষেত্রে তিনি তা পরিশোধের ব্যবস্থা করবেন। একই সঙ্গে খালেদা জিয়ার জীবনে কখনো কোনো আচরণে কেউ আঘাত পেয়ে থাকলে তাকে ক্ষমা করে দেওয়ার অনুরোধ জানান তারেক রহমান।

জানাজায় অংশ নেন-অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান, জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামসহ আরও অনেকে।

এ সময় কিছুটা দূরত্বে সেখানে উপস্থিত ছিলেন তারেক রহমানের স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান, মেয়ে জাইমা রহমান এবং আরাফাত রহমান কোকোর স্ত্রী শর্মীলা রহমান সিঁথিসহ পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা। এর বাইরে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ দলের স্থায়ী কমিটির সদস্যরা এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা সেখানে দাঁড়িয়ে দাফন প্রক্রিয়া প্রত্যক্ষ করেন।

এর আগে সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজা থেকে খালেদা জিয়ার মরদেহ জিয়া উদ্যানে নেওয়া হয়। সাবেক রাষ্ট্রপতি ও স্বামী জিয়াউর রহমানের সমাধির কাছাকাছি নেওয়ার পর খালেদা জিয়ার মরদেহবাহী কফিন কাঁধে নিয়ে কবরে নিয়ে যান সেনা ও নৌবাহিনীর সদস্যরা। এরপর সেখানে নিয়ম মেনে দাফন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।

তারও আগে, বেলা ৩টার দিকে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজা ও মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে খালেদা জিয়ার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস, সেনাপ্রধান ওয়াকার উজ-জামান, বিএনপি ও বিভিন্ন দলের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ এবং লাখ লাখ সাধারণ মানুষ অংশ নেন।

জানাজার আগে তারেক রহমান তার মায়ের জন্য দোয়া চান এবং মায়ের পক্ষে সবার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন।

দীর্ঘদিন ধরে গুরুতর অসুস্থ খালেদা জিয়া গতকাল মঙ্গলবার সকাল ৬টায় রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮০ বছর।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া দীর্ঘদিন ধরে আর্থরাইটিস, ডায়াবেটিস, কিডনি, লিভার, ফুসফুস, হৃদ্‌যন্ত্র, চোখের সমস্যাসহ নানা জটিলতায় ভুগছিলেন। চলতি বছরের ৭ জানুয়ারি লন্ডনে চিকিৎসা নিয়ে কিছুটা সুস্থ হয়ে দেশে ফেরেন তিনি। কিন্তু পুনরায় অসুস্থ হয়ে পড়লে গত ২৩ নভেম্বর আবার হাসপাতালে ভর্তি করানো হয় তাকে। দেড় মাসের মতো হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার পর গতকাল তিনি মারা যান।

গৃহবধূ থেকে রাজনীতিতে এসে ৪৩ বছর দলকে নেতৃত্ব দেন খালেদা জিয়া। ১৯৮২ সালে তিনি বিএনপিতে যোগ দেন এবং ১৯৮৪ সালে কাউন্সিলের মাধ্যমে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিএনপির চেয়ারপাসন নির্বাচিত হন। এরপর থেকে মৃত্যুর দিন পর্যন্ত দলের চেয়ারপারসনের দায়িত্ব পালন করেন খালেদা জিয়া। বিএনপি চেয়ারপারসনের দায়িত্বে থাকার পাশাপাশি তিনবার প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন তিনি। এরশাদবিরোধী আন্দোলনের পর খালেদা জিয়াকে দেওয়া হয় ‘আপসহীন নেত্রীর’ উপাধি। তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হয়ে ইতিহাস গড়েন।

খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনের শুরু ছিল স্বামী জিয়াউর রহমানকে হারানোর বেদনা নিয়ে। ১৯৮১ সালের ৩০ মে জিয়াউর রহমানকে হত্যার পর সংকটে পড়ে বিএনপি। ঠিক সেই সময় সাধারণ গৃহবধূ থেকে রাজনীতিতে এসে বিএনপির হাল ধরেন খালেদা জিয়া।

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *