লুণ্ঠিত ১৩৩৫ অস্ত্র এখনো উদ্ধার হয়নি

■ নাগরিক প্রতিবেদক ■

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পুলিশের লুট হওয়া ১ হাজার ৩৩৫টি আগ্নেয়াস্ত্র এখনো উদ্ধার হয়নি। গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বলছে, এসব অস্ত্র অপরাধী চক্রের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এসব অস্ত্র ব্যবহার হওয়ার আশঙ্কা করেছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও পুলিশ কর্মকর্তারা।

অভিযান চালিয়ে এবং পুরস্কার ঘোষণা করেও অস্ত্র-গুলি উদ্ধার না হওয়ায় তা পুলিশ কর্মকর্তাদের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি করেছে। পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলমও বলেছেন, পুলিশের লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধার না হওয়াটা উদ্বেগের।

দেশে গত এক বছরে হত্যাসহ বিভিন্ন অপরাধে আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার উল্লেখযোগ্য বেড়েছে। এ সময়ে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে শতাধিক মানুষকে। বিভিন্ন ঘটনায় গুলিবিদ্ধ হয়েছে আরও আড়াই শতাধিক মানুষ। পুলিশ বলছে, এসব অপরাধের বেশির ভাগে ব্যবহার হয়েছে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সারা দেশে থানা ও পুলিশি স্থাপনা থেকে লুণ্ঠিত আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে।

পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটের তথ্য বলছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশের বিভিন্ন থানা, ফাঁড়ি ও পুলিশের অন্যান্য স্থাপনায় হামলা, ভাঙচুর, লুট, অগ্নিসংযোগ করা হয়। পুলিশের এসব স্থাপনা থেকে মোট ৫ হাজার ৭৫৩টি আগ্নেয়াস্ত্র এবং ৬ লাখ ৫১ হাজার ৮৩২টি গোলাবারুদ লুট হয়। গণভবন এলাকা থেকে স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্সের (এসএসএফ) ৩২টি অস্ত্রও খোয়া যায়। পরবর্তী সময়ে অভিযানে অধিকাংশ অস্ত্র উদ্ধার হলেও ১ হাজার ৩৩৫টি আগ্নেয়াস্ত্র এবং ২ লাখ ৫৭ হাজার ১৮৯টি গুলি উদ্ধার করা যায়নি। অপারেশন ডেভিল হান্ট চালিয়ে এবং পুরস্কার ঘোষণা করেও এসব অস্ত্র-গুলি বেহাত রয়ে গেছে। বর্তমান অপারেশন ডেভিল হান্টের দ্বিতীয় পর্ব চলছে।

নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরদিন ১২ ডিসেম্বর ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান বিন হাদিকে প্রকাশ্যে গুলির ঘটনা রাজনৈতিক অঙ্গনে উদ্বেগ তৈরি করে। রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী হত্যার একের পর এক ঘটনা ঘটেছে। সর্বশেষ গত বুধবার রাজধানীর বসুন্ধরা সিটি কমপ্লেক্সের পেছনে গুলি করে হত্যা করা হয় মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক নেতা আজিজুর রহমান মুসাব্বিরকে। গুলিবিদ্ধ হন একজন। নির্বাচন সামনে রেখে অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার আরও বাড়ার আশঙ্কা করছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা। তবে পুলিশের দাবি, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে ডেভিল হান্ট-এর দ্বিতীয় পর্ব চলছে।

গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদন বলছে, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্ট ব্যবহার করে দেশে অবৈধ অস্ত্র প্রবেশ করানো হচ্ছে। একই সঙ্গে পুলিশের লুট হওয়া ১৩ শতাধিক আগ্নেয়াস্ত্র সরাসরি অপরাধী চক্রের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। এসব অস্ত্র দিয়ে হত্যা ছাড়াও ছিনতাই, ডাকাতি, চাঁদাবাজি, দখলবাজি এবং ঠিকাদারি নিয়ন্ত্রণের মতো অপরাধ করার একাধিক তথ্য পাওয়া গেছে।

চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে গত মঙ্গলবার সকালে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে মতবিনিময় সভায় নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর পুলিশের লুট হওয়া অস্ত্রের প্রায় ১৫ শতাংশ এবং গোলাবারুদের প্রায় ৩০ শতাংশ এখনো উদ্ধার হয়নি। এসব অস্ত্র ও গুলি উদ্ধারের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

আইজিপি বাহারুল আলম বলেন, পুলিশের লুট হওয়া অস্ত্র এখনো উদ্ধার হয়নি, সেটা উদ্বেগের। সেগুলো অপরাধীদের কাছে অবৈধ অস্ত্রের মজুত হিসেবে যোগ হয়েছে। তাই এর ব্যবহারের কিছু আশঙ্কা রয়েছে। তবে লুট হওয়া ভারী অস্ত্র এখনো ব্যবহার হয়নি। ছোট ছোট কিছু অস্ত্র ব্যবহার হয়ে থাকতে পারে। সেগুলো উদ্ধারে পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে। কেউ কেউ তথ্য দিচ্ছেন, সেই অনুযায়ী উদ্ধার করা হচ্ছে।

আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)-এর তথ্যনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন স্থানে ৪০১টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় ৪৭৪৪ জন আহত এবং ১০২ জন নিহত হয়েছেন। এই সময়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে অন্তত ৩৫টি সংঘর্ষের ঘটনায় ৪৫৪ জন আহত এবং নিহত হয়েছেন ১০ জন। বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে ৩৩টি সংঘর্ষের ঘটনায় ৫২০ জন আহত এবং ৩ মারা গেছেন। বিএনপি ও এনসিপির মধ্যে ৪টি সহিংস সংঘর্ষের ঘটনায় শতাধিক আহত হয়েছেন। বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলের ফলে ১৯২টি সংঘর্ষে ৩৯ জন নিহত এবং আহত হয়েছেন ২৩৮০ জন।

জানতে চাইলে পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) এএইচএম শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশ সবসময়ই কাজ করে যাচ্ছে। তারপরও কিছু ঘটনা ঘটে গেছে। এসব ঘটনায় পুলিশ অপরাধীদের গ্রেফতারে অভিযান চালাচ্ছে। পাশাপাশি অনেক ঘটনার রহস্যও উদঘাটন করা হয়েছে। অনেক গণ্যমান্য ব্যক্তিকে এরই মধ্যে গানম্যান দেওয়া হয়েছে। আরও অনেককেই দেওয়ার প্রক্রিয়া অব্যাহত। যদি কোনো ব্যক্তি নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন, তাহলে তিনি গানম্যানের জন্য আবেদনও করতে পারেন।’

পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘হঠাৎ খুনোখুনি নিয়ে আমাদের মধ্যে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা আছে। এ বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকেও বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। বিশেষ করে কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া বন্দি, চরমপন্থী ও আন্ডারওয়ার্ল্ড সন্ত্রাসীদের কীভাবে আইনের আওতায় আনা যায় তা নিয়ে পরিকল্পনা চলছে। পতিত আওয়ামী লীগ এসব অপরাধী ব্যবহার করছে বলে গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।’

তিনি বলেন, কারাগার ভেঙে পালিয়ে যাওয়া বন্দিরা দেশের নিরাপত্তাব্যবস্থার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারা বিভিন্ন মামলার আসামি। দেশের চলমান খুন, ডাকাতি, ছিনতাইয়ের মতো অপরাধগুলোর পেছনে পালিয়ে যাওয়া অপরাধীদের সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে।

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *