■ নাগরিক প্রতিবেদক ■
নতুন বেতনকাঠামোয় সরকারি কর্মকর্তা–কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির সুপারিশ করা হচ্ছে ১০০ থেকে ১৪৭ শতাংশ। এর ফলে সর্বনিম্ন অর্থাৎ ২০তম ধাপে বেতন ২০ হাজার টাকা আর সর্বোচ্চ প্রথম ধাপে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকার সুপারিশ করা হচ্ছে।
সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বাধীন ২১ সদস্যের বেতন কমিশন সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। কমিশন বুধবার বিকেল পাঁচটায় প্রধান উপদেষ্টার কাছে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় বেতন কমিশনের প্রতিবেদন তুলে ধরবে।
প্রতিবেদন তৈরির ক্ষেত্রে অনলাইনে জরিপের মাধ্যমে ৭৮ লাখ অংশগ্রহণকারী মতামত দিয়েছেন। মূল্যস্ফীতি, জীবনমানসহ বিভিন্ন বিষয়ে তাঁদের মতামত বিবেচনায় নিয়েছে বেতন কমিশন।
চলতি ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে আংশিক বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের সুপারিশ করছে। এটি পুরো মাত্রায় কার্যকর হবে ২০২৬–২৭ অর্থবছরের প্রথম দিন অর্থাৎ আগামী ১ জুলাই থেকে।
সরকারি কর্মকর্তা–কর্মচারীদের জন্য বৈশাখী ভাতা ২০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ করার সুপারিশ করা হচ্ছে। এত দিন ১১তম থেকে ২০তম ধাপের কর্মচারীদের জন্য যাতায়াতের ভাতা ছিল। এ যাতায়াতের ভাতা নতুন বেতন কমিশন ১০ম ধাপ থেকে ২০তম পর্যন্ত দেওয়ার সুপারিশ করছে।
কর্মরত সরকারি কর্মকর্তা–কর্মচারীদের পাশাপাশি পেনশনভোগীদের পেনশনের হারও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বাড়ছে। মাসে ২০ হাজার টাকার কম পান, এমন পেনশনভোগীদের পেনশন বাড়ছে ১০০ শতাংশের মতো। যাঁরা মাসে ২০ থেকে ৪০ হাজার টাকার পেনশন পান, তাঁদের বাড়ছে ৭৫ শতাংশ। আর যাঁরা মাসে ৪০ হাজার টাকার বেশি পেনশন পান, তাঁদের বাড়ছে ৫৫ শতাংশ।
৭৫ বছরের বেশি বয়সী পেনশনধারীদের চিকিৎসার ভাতা ১০ হাজার টাকা দেওয়ার সুপারিশ করা হচ্ছে। এমনিতে বয়সভেদে আট হাজার টাকা চিকিৎসার ভাতা। ৫৫ বছরের কম বয়সীদের চিকিৎসার ভাতা দেওয়ার সুপারিশ করা হচ্ছে পাঁচ হাজার টাকা।
প্রথম থেকে দশম ধাপ পর্যন্ত সরকারি চাকরিজীবীদের বাড়িভাড়া তুলনামূলক কম হারে দেওয়ার সুপারিশ করা হচ্ছে। ১১তম থেকে ২০তম ধাপে বাড়িভাড়ার হার তুলনামূলক বেশি থাকবে।
বেসরকারি সরকারি কর্মচারীদের জন্য প্রতিবেদন দাখিলের পর সামরিক ও বিচার বিভাগের জন্য আলাদা বেতন কমিশন চূড়ান্ত করা হবে বলে জানা গেছে।
বর্তমানে ২০১৫ সালের পে স্কেল অনুযায়ী সরকারি কর্মচারীদের জন্য ২০টি বেতন গ্রেড রয়েছে। দেশের প্রায় ১৫ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী এ পে স্কেল অনুসারে বেতন-ভাতা পান।
এই কাঠামোতে সর্বনিম্ন, অর্থাৎ ২০ তম গ্রেডে মূল বেতন হয় মাসে ৮ হাজার ২৫০ টাকা। বিসিএস পরীক্ষা দিয়ে প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা পদে যোগ দেওয়া নবম গ্রেডের একজন চাকরিজীবীর মূল বেতন হয় মাসে ২২ হাজার টাকা।
আর সর্বোচ্চ ধাপে একজন সচিব মাসে ৭৮ হাজার টাকা, জ্যেষ্ঠ সচিব ৮২ হাজার টাকা এবং মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ৮৬ হাজার টাকা মূল বেতন হিসেবে পান।
মূল বেতনের সঙ্গে বাড়ি ভাড়া, চিকিৎসা ও যাতায়াত বাবদ আলাদা ভাতা এবং অন্যান্য সুযোগ সুবিধা পান সরকারি কর্মচারীরা।
এছাড়া বছরে দুটি উৎসব ভাতার পাশাপাশি বাংলা নববর্ষে মূল বেতনের ২০ শতাংশ হারে বাড়তি একটি ভাতা পান তারা।
কমিশনের একজন সদস্য বলেন, “আমরা বর্তমানের মতই গ্রেড রাখছি। তবে সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন বেতনের মধ্যে অনুপাত কমানোর প্রস্তাব করছি। এখন ১:৯ হলেও নতুন বেতন-কাঠামোতে ১:৮ করছি।”
সবক্ষেত্রেই বর্তমান বেতনকাঠামোর তুলনায় দ্বিগুণের বেশি বাড়ানোর প্রস্তাব করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
“আমরা সব সেক্টরের প্রতিনিধির সঙ্গে কথা বলেছি। বিস্তর আলোচনা করে বর্তমান মূল্যস্ফীতির বিবেচনা করে এটা করা হয়েছে। একজন ২০ গ্রেডের কর্মী যদি ঢাকায় চাকরি করেন, তাহলে মূল বেতনের ৬৫ শতাংশ বাসা ভাড়া পান। সে হিসেবে তার অন্যান্য সুযোগ মিলে এটি দাঁড়াবে প্রায় ৪২ হাজার টাকা। বর্তমানে পান প্রায় ১৭ হাজার টাকা।”
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নিয়ে একমাত্র বাজেট দিতে এসে সাত লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার বাজেট পাস করে। পরে অর্থবছরের মাঝামাঝি সময়ে এসে ২৪ ডিসেম্বর বাজেটের আকার দুই হাজার কোটি টাকা কমিয়ে ৭ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকার সংশোধিত বাজেট অনুমোদন করে।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মূল বাজেটে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাবদ ৮৪ হাজার ৮৪ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছিল, যা আগের অর্থবছরের চেয়ে ১ হাজার ৭০৭ কোটি টাকা বেশি।
সংশোধিত বাজেটে এসে এ খাতে বরাদ্দ প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা বাড়িয়ে এক লাখ ছয় হাজার ৬৮৪ কোটি টাকা করা হয়েছে।
এর ফলে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) ৩০ হাজার কোটি টাকার বরাদ্দ কমালেও সংশোধিত বাজেটের আকার কমেছে কেবল ২ হাজার টাকা।
নতুন বেতন কাঠামো আংশিক বা পুরোপুরি বাস্তবায়ন হলে তার অর্থের সংস্থান এবং ইতোমধ্যে বিভিন্ন ভাতা ও সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর যেসব ঘোষণা এসেছে তার ব্যয়ও এই বরাদ্দের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে বলে তথ্য দিয়েছেন অর্থ বিভাগের এক কর্মকর্তা।
তার ভাষ্য, সাধারণত বেতন কাঠামোতে ব্যয়ের ক্ষেত্রে মূল বেতন ও ভাতা আলাদা কোডে সংস্থান করা হয়। সে হিসাব করে মূল বেতন বা ভাতার যে কোনো একটি জানুয়ারি থেকে বাস্তবায়নের লক্ষ্য ধরে এ অর্থের সংস্থান দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। বাকি অংশ পরবর্তী সরকারের বিবেচনাধীন থাকবে।
পে কমিশনের প্রস্তাব বাস্তবায়ন করতে গেলে সরকারের এ খাতে বরাদ্দ দ্বিগুণের বেশি করতে হবে। কিন্তু সরকারের রাজস্ব আদায় বাড়ছে না, সুদের ব্যয় সামাল দিতেও হিমশিম খেতে হচ্ছে।
এসব আমলে নিয়ে সরকার সংশোধিত বাজেটে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য অস্বাভাবিক মাত্রায় বাড়িয়েছে।
গত অর্থবছরে আন্দোলন ও সরকারের পালাবদলে অস্থিরতার মধ্যে রাজস্ব আদায়ে ধীরগতি দেখা গিয়েছিল। সে সময়ের হিসাবকে ভিত্তি ধরায় চলতি অর্থবছরে রাজস্ব আহরণের গতি বেড়েছে।
চলতি অর্থবছরের জুলাই-অক্টোবর সময়ে এনবিআরের রাজস্ব আদায়ে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৫ দশমিক ৫৪ শতাংশ।
এমন প্রেক্ষাপটে মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ৫ লাখ ৬৪ হাজার কোটি টাকা থেকে ২৪ হাজার কোটি টাকা বাড়িয়ে ৫ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা আদায়ের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
এর মধ্যে এনবিআরের মাধ্যমে আদায় করা হবে ৫ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকা। আর কর বহির্ভূত রাজস্ব আহরিত হবে ৬৫ হাজার কোটি টাকা। এনবিআর বহির্ভূত সূত্র থেকে ২০ হাজার কোটি টাকা আহরিত হবে বলে সরকার আশা করছে।
এনবিআর প্রবৃদ্ধি দেখালেও উল্টো চিত্রও আছে। লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে হিসাব করলে চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসেই রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১৭ হাজার ২১৯ কোটি টাকা।
এ সময় ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬৯৭ কোটি টাকা আহরণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল, কিন্তু আদায় হয়েছে ১ লাখ ১৯ হাজার ৪৭৮ কোটি টাকা।
মাঝপথে এসে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা বাড়ায় সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ঘাটতি বাড়তে থাকবে। অর্থবছরের শেষ দিকে এসে মাসিক লক্ষ্যও বেড়ে যাবে। ফলে আদায় বাড়লেও পরিসংখ্যানে ঘাটতি তখন বেশি দেখা যাবে।
সে হিসেবে চলতি অর্থবছরেও এক লাখ কোটি টাকার বেশি ঘাটতি দেখা যেতে পারে কর্মকর্তারা মনে করছেন।
সব দিক বিবেচনায় পে কমিশনের সুপারিশ পুরোপুরি বাস্তাবায়ন করা যাবে কি না, তা নিয়ে শঙ্কার সুর মিলেছে অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদের কথায়।
মঙ্গলবার সচিবালয়ে সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, পে-কমিশন ‘সাবস্টেনটিভ’ কাজ করছে। তবে বাস্তবায়নের ব্যাপারটা ‘অন্য জিনিস’।
