■ নাগরিক প্রতিবেদক ■
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য প্রস্তাবিত নতুন বেতন ও ভাতা কাঠামো বাস্তবায়নে যে অতিরিক্ত ব্যয় হবে, তার দায় পরবর্তী সরকারকেই নিতে হবে বলে জানিয়েছেন অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ।
তিনি বলেন, অর্থের সংস্থানের উপায় সরকারকেই বের করতে হবে এবং ভবিষ্যতের নির্বাচিত সরকার চাইলে এই বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন নাও করতে পারে।
মঙ্গলবার অর্থ মন্ত্রণালয়ে নিজ দপ্তরে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।
অন্তর্বর্তী সরকারের হাতে আর মাত্র ২০ দিন সময় রয়েছে—এই সময়ে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন সম্ভব কি না জানতে চাইলে ড. সালেহউদ্দিন বলেন, কমিশনের সুপারিশ হুবহু বাস্তবায়ন হয় না। প্রতিবেদন পর্যালোচনার জন্য একাধিক কমিটি রয়েছে এবং পুরো প্রক্রিয়ায় সাধারণত তিন থেকে চার মাস সময় লাগে। তবে বর্তমান সরকার বাস্তবায়ন করবে না—এমন কথাও তিনি বলেননি।
বর্তমানে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ও ভাতা বাবদ বছরে প্রায় ৮৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়। পে কমিশনের প্রস্তাব অনুযায়ী নতুন বেতন কাঠামো পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে অতিরিক্ত ৭০ থেকে ৮০ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হতে পারে।
দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, নতুন বেতন কাঠামো ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে আংশিক এবং ২০২৬-২৭ অর্থবছরের শুরু থেকে পুরোপুরি কার্যকর করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে সর্বনিম্ন বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা, যা দ্বিগুণেরও বেশি বাড়ানোর সুপারিশ রয়েছে। সর্বোচ্চ ধাপে বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ২০ হাজার টাকার বেশি করার প্রস্তাব করা হয়েছে। সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন বেতনের অনুপাত ১:৮ রাখার সুপারিশ রয়েছে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে বেতন ও ভাতা খাতে অতিরিক্ত ২২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা আংশিক বাস্তবায়নের প্রস্তুতির অংশ বলে জানা গেছে।
বেতন বৃদ্ধি বাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে অর্থ উপদেষ্টা বলেন, এতে বাজারে কোনো বিরূপ প্রভাব পড়বে না এবং এর সঙ্গে জাতীয় নির্বাচনেরও কোনো সম্পর্ক নেই।
তিনি আরও বলেন, দেশের আর্থিক সামর্থ্য, মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনায় রেখেই পে কমিশন সুপারিশ প্রণয়ন করেছে। প্রস্তাবিত কাঠামোতে নিচের দিকের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তুলনামূলকভাবে বেশি সুবিধা পাবেন বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
পে কমিশনের প্রস্তাব বাস্তবায়ন করতে গেলে সরকারের এ খাতে বরাদ্দ দ্বিগুণের বেশি করতে হবে। কিন্তু সরকারের রাজস্ব আদায় বাড়ছে না, সুদের ব্যয় সামাল দিতেও হিমশিম খেতে হচ্ছে।
এসব আমলে নিয়ে সরকার সংশোধিত বাজেটে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য অস্বাভাবিক মাত্রায় বাড়িয়েছে।
গত অর্থবছরে আন্দোলন ও সরকারের পালাবদলে অস্থিরতার মধ্যে রাজস্ব আদায়ে ধীরগতি দেখা গিয়েছিল। সে সময়ের হিসাবকে ভিত্তি ধরায় চলতি অর্থবছরে রাজস্ব আহরণের গতি বেড়েছে।
চলতি অর্থবছরের জুলাই-অক্টোবর সময়ে এনবিআরের রাজস্ব আদায়ে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৫ দশমিক ৫৪ শতাংশ।
এমন প্রেক্ষাপটে মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ৫ লাখ ৬৪ হাজার কোটি টাকা থেকে ২৪ হাজার কোটি টাকা বাড়িয়ে ৫ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা আদায়ের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
এর মধ্যে এনবিআরের মাধ্যমে আদায় করা হবে ৫ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকা। আর কর বহির্ভূত রাজস্ব আহরিত হবে ৬৫ হাজার কোটি টাকা। এনবিআর বহির্ভূত সূত্র থেকে ২০ হাজার কোটি টাকা আহরিত হবে বলে সরকার আশা করছে।
এনবিআর প্রবৃদ্ধি দেখালেও উল্টো চিত্রও আছে। লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে হিসাব করলে চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসেই রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১৭ হাজার ২১৯ কোটি টাকা।
এ সময় ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬৯৭ কোটি টাকা আহরণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল, কিন্তু আদায় হয়েছে ১ লাখ ১৯ হাজার ৪৭৮ কোটি টাকা।
মাঝপথে এসে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা বাড়ায় সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ঘাটতি বাড়তে থাকবে। অর্থবছরের শেষ দিকে এসে মাসিক লক্ষ্যও বেড়ে যাবে। ফলে আদায় বাড়লেও পরিসংখ্যানে ঘাটতি তখন বেশি দেখা যাবে।
সে হিসেবে চলতি অর্থবছরেও এক লাখ কোটি টাকার বেশি ঘাটতি দেখা যেতে পারে কর্মকর্তারা মনে করছেন।
সব দিক বিবেচনায় পে কমিশনের সুপারিশ পুরোপুরি বাস্তাবায়ন করা যাবে কি না, তা নিয়ে শঙ্কার সুর মিলেছে অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদের কথায়।
মঙ্গলবার সচিবালয়ে সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, পে-কমিশন ‘সাবস্টেনটিভ’ কাজ করছে। তবে বাস্তবায়নের ব্যাপারটা ‘অন্য জিনিস’।
