■ নাগরিক নিউজ ডেস্ক ■
ভারতের নয়াদিল্লিতে একটি বেসরকারি হাসপাতালে ৯০ বছর বয়সে মারা গেছেন স্যার উইলিয়াম মার্ক টালি। দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে যাঁদের সাংবাদিকতা গভীর ও স্থায়ী ছাপ রেখে গেছে, মার্ক টালি তাঁদের অন্যতম।
ব্রিটিশ বংশোদ্ভূত এই সাংবাদিক ভারতকে নিজের ঘর বানিয়েছিলেন এবং বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে আছেন ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তাঁর সাহসী ও নৈতিক সাংবাদিকতার জন্য।
বিবিসি রেডিওতে প্রচারিত তাঁর প্রতিবেদনের মাধ্যমে বিশ্ব প্রথমবারের মতো তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ভয়াবহ বাস্তবতার কথা জানতে পারে। রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত প্রচার ও বিভ্রান্তিকর তথ্যের দেয়াল ভেঙে তিনি যুদ্ধের নির্মমতা, মানবিক বিপর্যয় এবং বাঙালি জনগণের সংগ্রামকে স্পষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্যভাবে তুলে ধরেন—বিবিসির ভাষায় যা ছিল ‘নৈতিক দৃঢ়তা ও বিশ্লেষণী সততার অনন্য উদাহরণ।’
১৯৩৫ সালের ২৪ অক্টোবর কলকাতার টালিগঞ্জে জন্ম নেওয়া মার্ক টালি পড়াশোনা করেন যুক্তরাজ্যের মার্লবোরো কলেজ ও কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রিনিটি হলে। জীবনের শুরুতে তিনি ধর্মতত্ত্বে আগ্রহী ছিলেন। পরে সাংবাদিকতাকেই নিজের প্রকৃত কাজ হিসেবে বেছে নেন। এর মাধ্যমে মানুষের মধ্যে বোঝাপড়া ও সংযোগ গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে বলে তিনি বিশ্বাস করতেন।
১৯৬৪ সালে তিনি নয়াদিল্লিতে বিবিসিতে যোগ দেন। অল্প সময়ের মধ্যে তাঁর শান্ত, সংযত ও প্রাঞ্জল উপস্থাপনশৈলী শ্রোতাদের কাছে বিশেষ আস্থার জায়গা তৈরি করে। ১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তানে যখন ভয়াবহ সামরিক অভিযান শুরু হয় এবং মানবিক সংকট চরমে পৌঁছায়, তখন টালির প্রতিবেদন ছিল কোটি মানুষের জন্য নির্ভরযোগ্য তথ্যের অন্যতম উৎস।
দিল্লি থেকে রিপোর্ট করলেও তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নৃশংসতা, শরণার্থীদের দুর্দশা এবং বাঙালিদের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা বিশ্বদরবারে গুরুত্বসহকারে তুলে ধরেন। বাংলাদেশের মানুষের কাছে তাঁর কাজ শুধু সাংবাদিকতা ছিল না; এটি ছিল তাদের অভিজ্ঞতা ও মুক্তির স্বপ্নের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি।
পরবর্তী সময়ে তিনি বাংলাদেশের ‘ফরেন ফ্রেন্ড অব বাংলাদেশ’ হিসেবে স্বীকৃতি পান। টালি প্রায় দুই দশক নয়াদিল্লিতে বিবিসির ব্যুরো চিফ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে নির্বাচন, বিদ্রোহ, সামাজিক পরিবর্তন ও রাষ্ট্রীয় টানাপোড়েন কাভার করেন। তিনি শুধু একজন সংবাদদাতা ছিলেন না; তিনি ছিলেন মানব অভিজ্ঞতার দলিলকার, সংস্কৃতির সেতুবন্ধন এবং একটি জাতির স্বাধীনতাসংগ্রামের প্রত্যক্ষ সাক্ষী।
১৯৯২ সালে উত্তর ভারতের অযোধ্যায় তিনি সাংবাদিকতা জীবনের একটি বিপজ্জনক মুহূর্তের মুখোমুখি হন। হিন্দু উগ্রপন্থিরা সেদিন বাবরি মসজিদ গুঁড়িয়ে দেয়। বিবিসির প্রতি সন্দেহ থেকে জনতার একটি অংশ টালিকে হুমকি দেয়। ‘মার্ক টালির মৃত্যু চাই’—এমন স্লোগানও ওঠে।
টালিকে কয়েক ঘণ্টা একটি কক্ষে আটকে রাখা হয়। পরে স্থানীয় একজন কর্মকর্তা এবং একজন হিন্দু পুরোহিতের হস্তক্ষেপে তিনি রক্ষা পান।
বহু বছর পর মার্ক টালি বলেছিলেন, বাবরি মসজিদ ধ্বংসের ওই ঘটনা ছিল ভারতের স্বাধীনতার পর ধর্মনিরপেক্ষতার ওপর ‘সবচেয়ে বড় আঘাত’।
মার্ক টালির বাবা ছিলেন একজন ধনাঢ্য ব্যবসায়ী। তার মা জন্মেছিলেন বাংলাদেশের আখাউড়ায়। পাট আর নীলের ব্যবসা করতেন মার্ক টালির নানা। তাদের পরিবার প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ভারতে ব্যবসা ও প্রশাসনের সঙ্গে যুক্ত ছিল।
বিবিসি লিখেছে, টালি বড় হয়েছেন একজন ইংরেজ আয়ার তত্ত্বাবধানে। একসময় আয়া তাকে গাড়িচালকের কাছ থেকে সংখ্যা গোনা শিখতে দেখে ধমক দিয়ে বলেছিলেন, “ওটা চাকরদের ভাষা, তোমার নয়।”
পরে তিনি হিন্দিতে দক্ষ হয়ে ওঠেন—দিল্লির বিদেশি সংবাদদাতা মহলে যা ছিল বিরল। ওই গুণই তাকে বহু ভারতীয়ের কাছে করে তোলে আপনজন; তারা তাকে ডাকত ‘টালি সাহেব’ বলে।
প্রাণবন্ত স্বভাব ও ভারতের প্রতি গভীর অনুরাগের কারণে দেশটির শীর্ষ রাজনীতিক, সম্পাদক ও সমাজকর্মীদের অনেকের সঙ্গে তার বন্ধুত্ব ও আস্থার সম্পর্ক গড়ে ওঠে।
বিবিসি লিখেছে, সারা জীবন তিনি এক ধরনের ভারসাম্য রক্ষা করে চলেছেন। তিনি নিঃসন্দেহে ইংরেজ, কিন্তু নিজের ভাষায় কখনোই তিনি ‘ভারতে সাময়িকভাবে থাকা বিদেশি’ ছিলেন না। ভারতই ছিল তার বাড়ি; জীবনের চার ভাগের তিন ভাগ সময় তিনি সেখানেই কাটিয়েছেন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরপরই, নয় বছর বয়সে পড়াশোনার জন্য ব্রিটেনে যান টালি। কেমব্রিজে ইতিহাস ও ধর্মতত্ত্ব পড়েন। একসময় পাদ্রি হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে লিংকন থিওলজিক্যাল কলেজেও ভর্তি হন, তবে পরে তার মত বদলায়।
চার বছর একটি বেসরকারি সংস্থায় কাজ করে ১৯৬৪ সালে বিবিসিতে যোগ দেন মার্ক টালি। তবে সাংবাদিক হিসেবে নয়, প্রশাসন শাখায় পার্সোনেল ম্যানেজার হিসেবে।
পরের বছর ১৯৬৫ সালে তাকে বিবিসির দিল্লি ব্যুরোতে কনিষ্ঠ প্রশাসনিক সহকারীর পদে বদলি করা হয়। তিনি ফিরে আসেন জন্মস্থানে।
দিল্লিতে কাজ করার সময় ধীরে ধীরে সাংবাদিকতার কাজে যুক্ত হতে শুরু করেন মার্ক টালি। ১৯৬৬ সালে তাকে পদোন্নতি দিয়ে বিবিসির নিউজ করেসপন্ডেন্ট করা হয়।
রেডিওতে তার সম্প্রচারভঙ্গি ছিল অনেকের চেয়ে আলাদা। তবে ভারতের সমাজ ও রাজনীতি নিয়ে তার বোঝাপড়া তার কথায় ফুটে উঠত। সেটা ছিল তার বড় শক্তির জায়গা।
বিবিসিতে ৩০ বছরের চাকরি জীবনে তিনি ২০ বছর ছিলেন দিল্লি ব্যুরোর প্রধান। তবে মাঠে না নেমে কাজ করা সাংবাদিক তিনি ছিলেন না। পেশাগত প্রয়োজনে তিনি ট্রেনে করে ভারতের নানা প্রান্তে ঘুরেছেন, প্রতিবেশী দেশগুলোতেও ভ্রমণ করেছেন।
বিবিসি লিখেছে, সাধারণ মানুষের আশা-ভয়, সংগ্রাম ও দৈনন্দিন জীবনের কথা যেমন টালি তুলে ধরেছেন, তেমনি দেশের অভিজাত শ্রেণির কথাও বলেছেন। কুর্তা-পায়জামা পরা যেমন তার কাছে স্বাভাবিক ছিল, তেমনি শার্ট-টাইও।
১৯৭৫ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী জরুরি অবস্থা জারি করলে ২৪ ঘণ্টার নোটিসে তাকে ভারত ছাড়তে বাধ্য করা হয়। তবে ১৮ মাস পর তিনি ফিরে আসেন এবং এরপর থেকে দিল্লিকেই নিজের ঘাঁটি বানান।
ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, ভোপাল গ্যাস দুর্ঘটনা, অপারেশন ব্লু স্টার, ইন্দিরা গান্ধী হত্যাকাণ্ড, শিখবিরোধী দাঙ্গা, রাজীব গান্ধী হত্যাকাণ্ড, পাকিস্তানের সামরিক শাসন, শ্রীলঙ্কায় তামিল টাইগারদের বিদ্রোহ, আফগানিস্তানে সোভিয়েত আগ্রাসনের মত ঘটনার খবর বিবিসির মাধ্যমে তিনি বিশ্বকে দিয়েছেন।
বিবিসি লিখেছে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিবিসির করপোরেট অগ্রাধিকারের সঙ্গে তার দূরত্ব বাড়তে থাকে। ১৯৯৩ সালে তিনি এক বক্তৃতায় অভিযোগ করেন, তখনকার মহাপরিচালক জন বার্টের অধীনে বিবিসি ‘ভয়ের সংস্কৃতি’ দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে।
পরের বছর বিবিসির চাকরি ছাড়েন টালি। এরপর দিল্লিতে ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক এবং উপস্থাপক হিসেবে কাজ শুরু করেন। সরাসরি চাকরি না করলেও বিবিসির বিভিন্ন অনুষ্ঠান সম্প্রচারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
বিদেশি হয়েও ভারতে বিরল সম্মান পেয়েছেন মার্ক টালি। তাকে দেওয়া হয়েছে দেশের দুই শীর্ষ বেসামরিক সম্মাননা—পদ্মশ্রী ও পদ্মভূষণ।
ব্রিটেনও তাকে স্বীকৃতি দিয়েছে। সম্প্রচার ও সাংবাদিকতায় অবদানের জন্য ২০০২ সালে তাকে নাইট উপাধিতে ভূষিত করা হয়। ওই সম্মানকে তিনি বর্ণনা করেছিলেন ‘ভারতের প্রতি সম্মান’ হিসেবে।
তার প্রথম বই ‘অমৃতসর: মিসেস গান্ধী’স লাস্ট ব্যাটেল’ প্রকাশিত হয় ১৯৮৫ সালে। বিবিসির সাবেক দিল্লি প্রতিনিধি সতীশ জ্যাকব ওই বইয়ের সহলেখক।
অমৃতসরের স্বর্ণমন্দিরে সংঘটিত অপারেশন ব্লু স্টার, শিখ বিদ্রোহীদের দমনে ভারতীয় সেনাবাহিনীর অভিযানের খুঁটিনাটি তুলে ধরা হয়েছে এ বইয়ে।
১৯৯১ সালে প্রকাশিত ‘নো ফুল স্টপস ইন ইন্ডিয়া’ বইটিকে টালির অন্যতম সেরা বই হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
দক্ষিণ দিল্লিতে খুব সাধারণ জীবনযাপন করতেন মার্ক টালি। তিনি কখনো ব্রিটিশ নাগরিকত্ব ত্যাগ করেননি।
তবে জীবনের শেষদিকে ভারতের ওভারসিজ সিটিজেন হওয়ার বিষয়েও তিনি গর্ব বোধ করতেন। তখন বলেছিলেন, ওই স্বীকৃতি তাকে দুই দেশের নাগরিক করে তুলেছে। ভারত ও ব্রিটেন-দুটোই ছিল তার দেশ।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ মধ্যরাতে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী গণহত্যা শুরু করার আগে ঢাকায় অবস্থানরত প্রায় অর্ধশত বিদেশি সাংবাদিককে আটকে ফেলে তখনকার হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে। পরদিন তাদের হোটেল থেকে সরাসরি বিমানে তুলে ঢাকা ছাড়তে বাধ্য করা হয় যাতে গণহত্যার কোনো খবর বিশ্ব গণমাধ্যম সংগ্রহ করতে না পারে।
পাকিস্তানি সামরিক জান্তা বিদেশি সাংবাদিকদের পূর্ব পাকিস্তান সফরের ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার পর জুনের তৃতীয় সপ্তাহে বিবিসি মার্ক টালিকে বাংলাদেশে পাঠায়।
সীমান্তবর্তী শরণার্থী শিবির ও বিভিন্ন জেলা ঘুরে তিনি বাঙালির দুর্দশার প্রকৃত চিত্র আর যুদ্ধের খবর পাঠাতে থাকেন। রণাঙ্গনের সেসব খবর বিশ্ববাসীর বিশ্বাসযোগ্য সংবাদউৎস হয়ে ওঠে।
মুক্তিযুদ্ধের উত্তাল দিনগুলোতে মার্ক টালি ছিলেন বাঙালি মুক্তিযোদ্ধাদের আশার আলো। রেডিওতে কান পেতে সকাল-সন্ধ্যা বিবিসিতে মার্ক টালির কণ্ঠ শোনার জন্য অপেক্ষায় থাকত পুরো দেশ। বাংলাদেশের পক্ষে বিশ্বজনমত গঠনে তার ভূমিকা ছিল অনন্য।
মার্ক টালি বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন, ১৯৭১ সালের সেই সফরে তিনি ঢাকা থেকে সড়ক পথে রাজশাহী গিয়েছিলেন।
“পাকিস্তানী সেনাবাহিনী যখন সীমান্ত এলাকা পর্যন্ত পৌঁছাল এবং তারা মনে করল যে পরিস্থিতির উপর তাদের নিয়ন্ত্রণ আছে, তখনই তারা আমাদের আসার অনুমতি দিয়েছিল। আমার সাথে তখন ছিলেন ব্রিটেনের টেলিগ্রাফ পত্রিকার যুদ্ধ বিষয়ক সংবাদদাতা ক্লেয়ার হলিংওয়ার্থ।
”আমরা যেহেতু স্বাধীনভাবে ঘুরে বেরিয়ে পরিস্থিতি দেখার সুযোগ পেয়েছি, সেজন্য আমাদের সংবাদের বিশেষ গুরুত্ব ছিল। আমরা বুঝতে পেরেছিলাম, ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ হয়েছে। আমি ঢাকা থেকে রাজশাহী যাবার পথে সড়কের দুপাশে দেখেছিলাম যে গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে।”
২০১২ সালে ‘মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননা’ নিতে ঢাকায় এসেছিলেন মার্ক টালি। ১৬ এপ্রিল সন্ধ্যায় সোনারগাঁও হোটেলে ‘স্মৃতি ৭১’ নামে এক অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছিলেন।
ব্রিটেনের টেলিগ্রাফ পত্রিকার যুদ্ধ সংবাদদাতা সায়মন ড্রিং হলেন প্রথম ব্যক্তি যিনি বিশ্ববাসীর কাছে পাকিস্তানি বাহিনীর বাঙালি নিধনযজ্ঞের খবর প্রকাশ করেছিলেন। ২০২১ সালের এপ্রিলে রোমানিয়ার একটি হাসপাতালে তিনি মারা যান।
