■ নাগরিক প্রতিবেদক ■
দুর্নীতির ধারণা সূচক (সিপিআই) ২০২৫-এ বাংলাদেশ ১০০-এর মধ্যে ২৪ পয়েন্ট পেয়ে বিশ্বে নিচের দিক থেকে ১৩তম অবস্থানে রয়েছে—যা আগের বছরের তুলনায় এক ধাপ অবনমন।
মঙ্গলবার সকালে সূচক প্রকাশ উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য তুলে ধরেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান।
তিনি বলেন, এটি মূলত একটি ‘হারানো সুযোগের’ চিত্র—একদিকে জুলাই আন্দোলনের মাধ্যমে চোরতন্ত্রের পতনের ইতিবাচক মূল্যায়ন পাওয়া গেছে, অন্যদিকে সংস্কার প্রক্রিয়ার ধাক্কা, মাঠপর্যায়ে দুর্নীতির স্থায়িত্ব এবং স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক শাসনের ঘাটতির কারণে সামগ্রিক মূল্যায়ন নেতিবাচক রয়ে গেছে।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক জানান, বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার আটটি দেশের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বনিম্ন অবস্থানে এবং এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের ৩২ দেশের মধ্যে চতুর্থ সর্বনিম্ন। বৈশ্বিকভাবে ১৮০ দেশের মধ্যে বাংলাদেশ রয়েছে সর্বনিম্ন কুইন্টাইলে (১৫০তম), যা ‘দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ হারানো দেশগুলোর’ কাতারে অন্তর্ভুক্ত করে।
ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকার রাষ্ট্র সংস্কার ও দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে দৃষ্টান্ত স্থাপনের ঐতিহাসিক সুযোগ পেয়েছিল। কিন্তু রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক প্রতিরোধ, দলবাজি ও দখলবাজির ধারাবাহিকতা এবং স্বচ্ছতার ঘাটতির কারণে সেই সুযোগ কাজে লাগানো হয়নি।’
প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ জানায়, ২০১২ সাল থেকে ১৪ বছরের মধ্যে বাংলাদেশের এবারের স্কোর দ্বিতীয় সর্বনিম্ন। এটি প্রমাণ করে যে, কর্তৃত্ববাদ পতনের পরও বাস্তবিক অর্থে কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রীয় ও আইনি কাঠামোর প্রত্যাশিত পরিবর্তন হয়নি। বরং গত দেড় বছরে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণে ব্যর্থ হয়েছে। এমনকি আমলাতন্ত্র এবং রাজনৈতিক ও অন্যান্যভাবে ক্ষমতাবান নানা শক্তির প্রভাবের পাশাপাশি দুর্নীতি দমনে দায়িত্বপ্রাপ্ত দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)-সহ অন্যান্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান কর্তৃক প্রস্তাবিত সংস্কার প্রস্তাবসমূহ অবহেলিত হওয়া অথবা বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারাও তাদের প্রকৃত ভূমিকা পালন করতেও ব্যর্থ হয়েছে।
২০২৫ সালের সূচকে ৮৯ স্কোর পেয়ে কম দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে তালিকার শীর্ষে অবস্থান করছে ডেনমার্ক: ৮৮ স্কোর নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে ফিনল্যান্ড ও ৮৪ স্কোর পেয়ে তৃতীয় স্থানে সিঙ্গাপুর। আর ৯ স্কোর পেয়ে যৌথভাবে তালিকার সর্বনিম্নে অবস্থান করছে দক্ষিণ সুদান ও সোমালিয়া: ১০ স্কোর পেয়ে নিম্নক্রম অনুযায়ী দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে ভেনেজুয়েলা এবং ১৩ স্কোর পেয়ে যৌথভাবে তৃতীয় সর্বনিম্ন অবস্থানে রয়েছে ইয়েমেন, লিবিয়া ও ইরিত্রিয়া।
সংবাদ সম্মেলনে আরও জানানো হয়, গত এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে এবারের বৈশ্বিক গড় স্কোর সর্বনিম্ন ৪২। আর সিপিআই-এ অন্তর্ভুক্ত ১৮২টির মধ্যে দুই-তৃতীয়াংশ (১২২টি) দেশের স্কোর ৫০ এর নিচে। বৈশ্বিকভাবে গত বছরের তুলনায় এ বছর ৪৮টি দেশের স্কোর বৃদ্ধি পেয়েছে, ৬৮টি দেশের স্কোর কমেছে এবং ৬৪টি দেশের স্কোর অপরিবর্তিত রয়েছে। ২০১২ সাল থেকে এই সূচকে ৩১টি দেশের উন্নতি হলেও, ৫০টি দেশের অবনতি হয়েছে।
২০২৫ সালের সিপিআই অনুযায়ী দক্ষিণ এশিয়ার আটটি দেশের মধ্যে পাঁচটি দেশের স্কোর ১ থেকে ৩ পয়েন্ট পর্যন্ত উন্নতি হয়েছে। বাকি দুইটি দেশের ১ পয়েন্ট করে অবনমন এবং একটি দেশের স্কোর অপরিবর্তিত রয়েছে। এর মধ্যে শ্রীলঙ্কার স্কোর সর্বোচ্চ ৩ পয়েন্ট এবং বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান ও মালদ্বীপের ১ পয়েন্ট করে উন্নতি হয়েছে। আর ভুটান ও আফগানিস্তানের স্কোর ১ পয়েন্ট কমেছে এবং নেপালের স্কোর অপরিবর্তিত রয়েছে। ঊর্ধ্বক্রম অনুযায়ী এ বছর দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে শ্রীলঙ্কার অবস্থান সর্বোচ্চ চৌদ্দ ধাপ, মালদ্বীপ ও ভারতের পাঁচ ধাপ এবং বাংলাদেশের অবস্থানের এক ধাপ উন্নতি হয়েছে। তবে নেপালের অবস্থান দুই ধাপ, পাকিস্তানের এক ধাপ এবং আফগানিস্তানের অবস্থান সর্বোচ্চ চার ধাপ অবনমন হয়েছে। আর ভুটান এক স্কোর কম পেলেও তাদের অবস্থান অপরিবর্তিত রয়েছে। উল্লেখ্য, দক্ষিণ এশিয়ায় একমাত্র ভুটান ছাড়া এ বছরও বাকি সাতটি দেশ সূচকের গড় স্কোর ৪২-এর কম পয়েন্ট পেয়েছে। অর্থাৎ সার্বিকভাবে দক্ষিণ এশিয়ায় দুর্নীতির ব্যাপকতা ও গভীরতা বেশ উদ্বেগজনক।
পৃথিবীর অন্যান্য দেশের টিআই চ্যাপ্টারের মতো টিআইবিও দুর্নীতির ধারণা সূচক দেশীয় পর্যায়ে প্রকাশ করে। সিপিআই ২০২৫ এর তথ্যসূত্র হিসেবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের জন্য বিশ্বখ্যাত ১২টি প্রতিষ্ঠানের সর্বমোট ১৩টি জরিপ ব্যবহার করা হয়েছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে গতবারের মতো এবারো ৮টি জরিপ ব্যবহৃত হয়েছে।
