■ নাগরিক প্রতিবেদক ■
প্রধানমন্ত্রী হিসাবে শপথ নেওয়ার আগে রোববার রাতে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের বাসায় গিয়ে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন তিনি।
এ সময় উভয় পরিবারের সদস্যদের খোঁজখবরও নেন বিএনপির চেয়ারম্যান।
বিএনপি যে ইতিবাচক রাজনীতির সূচনা করতে চায় এর অংশ হিসাবেই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দলের প্রধানদের বাসায় গিয়ে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন তারেক রহমান। এর আগে বাংলাদেশের ইতিহাসে এমনটি দেখা যায়নি।
জামায়াত আমিরের সঙ্গে বৈঠকে দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি, নির্বাচন-পরবর্তী সহনশীল পরিবেশ বজায় রাখা এবং ভবিষ্যৎ সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়। এই সাক্ষাৎকে রাজনীতিতে নতুন সংস্কৃতি বলে অভিহিত করেছেন জামায়াতের নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের।
এর আগে রোববার সন্ধ্যা ৭টা ১০ মিনিটে বিএনপির চেয়ারম্যান রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় জামায়াতের আমিরের বাসায় প্রবেশ করেন। ৭টা ৫৮ মিনিটে জামায়াত আমিরের বাসা ত্যাগ করেন।
প্রায় ৫০ মিনিটের ওই সাক্ষাৎকালে তার সঙ্গে ছিলেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান। অন্যদিকে জামায়াত আমিরের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন দলের নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের, মিডিয়া ও প্রচার বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জোবায়ের।
জামায়াত আমিরের সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে রাত ৮টা ২৫ মিনিটে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের বেইলি রোডের বাসায় যান বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এ সময় বাসার সামনে এগিয়ে এসে তারেক রহমানকে অভ্যর্থনা জানান নাহিদ। আধা ঘণ্টাব্যাপী এ বৈঠকেও তারেক রহমানের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান।
অন্যদিকে নাহিদ ইসলামের সঙ্গে ছিলেন এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন ও উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম।
পরে আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের প্রেস ব্রিফিংয়ে বলেন, সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সম্ভাব্য বিরোধীদলীয় নেতার বাসায় এসে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন। আমরা এটিকে স্বাগত জানিয়েছি। এটি রাজনীতিতে নতুন সংস্কৃতির সূচনা হয়েছে। আমরা ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে রাজপথে একসঙ্গে ছিলাম। ফ্যাসিবাদের বিদায়ের পর পৃথকভাবে নির্বাচন করেছি। সরকার ও বিরোধী দল মিলে জনগণের কল্যাণে আমরা কাজ করব। আমরা একমত হয়েছি যে জনগণের মৌলিক বিষয়াদিতে আলোচনাসাপেক্ষে সমাধানের চেষ্টা করব।
তিনি আরও বলেন, জামায়াত আমির দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিসহ উদ্ভূত জরুরি কিছু বিষয়ে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। তিনি এটিকে ইতিবাচক হিসাবে নিয়েছেন। যা রাজনীতির গুণগত পরিবর্তন। আমরা বলেছি, জনগণের প্রয়োজনে আমরা সংসদে গঠনমূলক বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করব।
এক প্রশ্নের জবাবে তাহের বলেন, জাতীয় সরকারে আমরা যোগ দেব না। বিরোধী দলে থেকে সংসদের ভেতরে-বাইরে ভূমিকা পালন করব।
সাক্ষাৎ শেষে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে তারেক রহমানের সঙ্গে তোলা ছবি প্রকাশ করেন জামায়াত আমির। ছবির ক্যাপশনে তিনি তারেক রহমানকে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করে অগ্রিম অভিনন্দন জানান।
জামায়াত আমির লেখেন, ‘তিনি আজ আমার আবাসিক কার্যালয়ে এসেছিলেন। তাঁর এই আগমন আমাদের জাতীয় রাজনীতির জন্য এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। আমি তাঁর এই আগমনকে স্বাগত জানাই এবং প্রত্যাশা রাখি, সংলাপ ও দায়িত্বশীলতার মাধ্যমে এটি রাজনৈতিক পরিপক্কতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার এক নতুন অধ্যায় সূচনা করবে।’
শফিকুর রহমান আরও লেখেন, ‘আমাদের আলোচনায় তিনি আশ্বস্ত করেছেন যে, নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা এবং বিরোধী দলের কর্মী ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর যেকোনো হামলা রোধে তিনি কার্যকর পদক্ষেপ নেবেন। আমি এই আশ্বাসকে সাধুবাদ জানাই। আমাদের প্রত্যাশা, কোনো নাগরিকই যেন ভয়ভীতি বা নিরাপত্তাহীনতার শিকার না হয়।’
জাতীয় স্বার্থের বিষয়ে নির্বাচিত সরকারকে পূর্ণ সহযোগিতা করবেন জানিয়ে শফিকুর রহমান আরও বলেন, ‘তবে একটি আদর্শিক বিরোধী দল হিসেবে আমাদের সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে আমরা আপসহীন থাকব। সরকারের জনকল্যাণমূলক কাজে আমাদের সমর্থন থাকবে, কিন্তু যেখানেই জবাবদিহিতার প্রয়োজন হবে, সেখানে আমরা সোচ্চার থাকবে।’
শফিকুর রহমান যোগ করেন, ‘আমাদের উদ্দেশ্য সংঘাত নয় বরং সংশোধন; বাধা দেওয়া নয় বরং পর্যবেক্ষণ। দেশের মানুষ এমন একটি সংসদ প্রত্যাশা করে, যা ন্যায়বিচার ও নাগরিক অধিকার রক্ষা করবে এবং স্থিতিশীলতার সাথে রাষ্ট্রকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।’
ইতঃপূর্বে বিএনপির সাবেক চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর সমবেদনা জানাতে বিএনপি চেয়ারম্যানের গুলশানের কার্যালয়ে যান জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান। শোকবইতে স্বাক্ষর করেন। এছাড়া হাসপাতালে থাকা অবস্থায়ও বেগম খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্যের খবর নিতে তিনি এভারকেয়ার হাসপাতালে গিয়েছিলেন। এনসিপিসহ অন্য দলের নেতারাও বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর তারেক রহমানকে সমবেদনা জানান।
সদ্য অনুষ্ঠিত হওয়া জাতীয় নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জয়লাভ করে বিএনপি। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আসনে জয় পায় বিএনপির এক সময়ের জোটসঙ্গী জামায়াতে ইসলামী। মূলত সৌজন্য সাক্ষাৎ করতেই জামায়াতের আমিরের বাসায় গেছেন বিএনপির চেয়ারম্যান।
এদিকে তারেক রহমানের আগমন উপলক্ষ্যে জামায়াত আমিরের বাসার সামনে উভয় দলের বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ ভিড় করেন।
