শংকরের প্রয়ান বাংলাসাহিত্যের নক্ষত্রের পতন

কাজল ঘোষ

২০০৫ সালের কথা। আমি একই সঙ্গে চ্যানেল আই এবং মানবজমিন পত্রিকায় কাজ করি। হঠাৎ জানতে পারি দুই বাংলার বিখ্যাত একজন সাহিত্যিক ঢাকায়। তিনি চ্যানেল আইতে আসবেন। একটি টেলিভিশন সাক্ষাৎকার অনুষ্ঠানে অংশ নিতে।

দুই বাংলার কোনো সাহিত্যিক ঢাকায় অথচ দেখা হবে না। এটা ভাবতে পারছিলাম না। কারণ, সুনীল গঙ্গোপাধ্যাায়, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় দু’জনের সাক্ষাৎকার নেয়ার সুযোগ হয়েছে। কথা বলতে পেরেছি, আড্ডা দিয়েছি। সেই স্মৃতি আজও মনে হলে আপ্লুত হই। এই তালিকা আরও দীর্ঘ হোক না। তাতে দোষের কি?

চ্যানেল আইতে যোগাযোগ করে জানতে পারি শংকর ঢাকায়। আমি তখনও জানতাম না এটা লেখকের ছদ্ম নাম। বোধকরি আমার মতো অনেকেই শংকরের প্রকৃত নাম কি তা জানে না। তিনি উঠেছিলেন ঢাকার হোটেলে। ভাগ্যক্রমে ওনাকে বিজয়নগর এলাকার একটি হোটেল থেকে চ্যানেল আইতে নিয়ে আসার দায়িত্ব বর্তালো। নির্ধারিত সময়ের আগেই হাজির হলাম। হাতে কিছুটা সময় থাকায় আমার সঙ্গে আলাপচারিতা শুরু করেন। আমার কৌতূহল ছিল একটা প্রশ্নেই। একজন মানুষ সাধারণত কেরানি থেকে কী করে মস্ত বড় একজন লেখক হলেন? কী করে মাথায় এলো ‘চৌরঙ্গী’ লেখার আইডিয়া?

চৌরঙ্গী উপন্যাসের কালজয়ী সেই উক্তি। যা বাঙালি পাঠক মাত্রেই হৃদয় ছুঁয়েছে। শংকর লিখছেন, “পৃথিবীর এই সরাইখানায় আমরা সবাই কিছুক্ষণের জন্য আশ্রয় নিয়েছি। আমাদের মধ্যে কেউ কেউ ব্রেকফাস্ট খেয়েই বিদায় নেবে, কয়েকজন লাঞ্চ শেষ হওয়া মাত্রই বেরিয়ে পড়বে। প্রদোষের অন্ধকার পেরিয়ে, রাত্রে যখন আমরা ডিনার টেবিলে এসে জড়ো হবো তখন অনেক পরিচিতজনকেই আর খুঁজে পাওয়া যাবে না; আমাদের মধ্যে অতি সামান্য কয়েকজনই সেখানে হাজির থাকবে। কিন্তু দুঃখ করো না, যে যত আগে যাবে তাকে তত কম বিল দিতে হবে।”

সোজাসাপ্টা বললেন, চৌরঙ্গী মোড়ে ইংরেজ সাহেব বারওয়েলের অফিসে কেরানি ছিলেন। কাজের ফাঁকে ফাঁকে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকতেন। ব্যস্ত কলকাতায় কত মানুষের পথচলা। রোজকার কথা ঘটনা চোখে পড়ে। ইংরেজ সাহেবের ফুট ফরমায়েশ খাটি আর ভাবি এই যে রোজকার জীবন তা দিনান্তের আলো গিয়ে যেভাবে অন্ধকারে ঢেকে যায়, অগুনতি মানুষের কত না ঘটনা তা চৌরঙ্গীর মোড় থেকে ইতিহাসের অতলে মিলিয়ে যায়। নিজের ভেতরে কেবলই আঁকিবুকি করছিল কিছু একটা। ঠাকুর চাইছিলেন আমি যেন কিছু একটা করি। কেরানির টেবিলে মন বসাতে পারছিলাম না কোনোভাবেই। একদিন ভেতরকার তাগিদ আমাকে অস্থির করে তোলে। আমি খড়কুটো নিয়ে লেখার টেবিলে বসি। ধীরে ধীরে লিখতে শুরু করি। চৌরঙ্গী লেখা হিসেবে দাঁড়াবে তখনও ভাবতে পারিনি।

সময়টা সন তারিখের হিসাবে ১৯৬১ সাল। ধারাবাহিক প্রকাশ হতে থাকে ‘দেশ’ পত্রিকায়। তখন সম্পাদক ছিলেন সাগরময় ঘোষ। ১৯৬২ সালে এটি বই আকারে প্রকাশ হয়। তারপর কেন জানি না পাঠক আমাকে তাদের করে নিয়েছে। আমাকে আর বারওয়েল সাহেবের অফিসে ছুটতে হয়নি। কীভাবে যেন আমি আজকের শংকর হয়ে উঠি।

প্রশ্ন ছিল, শংকর তো আপনার লেখক নাম। ছদ্ম নাম। কখনও ঈর্ষাবোধ করেন কিনা? একজন মণিশংকর মুখোপাধ্যায় -এর চেয়ে শংকর তো অনেক খ্যাত? ঠোঁটের কোণে অল্প হাসির রেখায় বুঝিয়ে দিলেন, সব দুঃখ কষ্ট যন্ত্রণা তিনি ভাগ করে নেন এই দু’টি চরিত্রের মধ্য দিয়ে। দু’টি চরিত্র একেবারেই আলাদা। শংকর তার লড়াই চালিয়ে যায় লেখক সত্তা নিয়ে। সে কথা বলে তার নিজের অচলায়তন নিয়ে। সে ব্যস্ত থাকে তার বলয় নিয়ে। মণিশংকর তো তার তল্পিবাহক মাত্র। এই বলেই খানিকটা থামেন তিনি।

চৌরঙ্গী উপন্যাসের কালজয়ী সেই উক্তি। যা বাঙালি পাঠক মাত্রেই হৃদয় ছুঁয়েছে। শংকর লিখছেন, “পৃথিবীর এই সরাইখানায় আমরা সবাই কিছুক্ষণের জন্য আশ্রয় নিয়েছি। আমাদের মধ্যে কেউ কেউ ব্রেকফাস্ট খেয়েই বিদায় নেবে, কয়েকজন লাঞ্চ শেষ হওয়া মাত্রই বেরিয়ে পড়বে। প্রদোষের অন্ধকার পেরিয়ে, রাত্রে যখন আমরা ডিনার টেবিলে এসে জড়ো হবো তখন অনেক পরিচিতজনকেই আর খুঁজে পাওয়া যাবে না; আমাদের মধ্যে অতি সামান্য কয়েকজনই সেখানে হাজির থাকবে। কিন্তু দুঃখ করো না, যে যত আগে যাবে তাকে তত কম বিল দিতে হবে।”

যিনি কর্মজীবনের শুরুতে ছিলেন ফেরিওয়ালা। পরে পেশা বদলে টাইপরাইটার ক্লিনারের কাজ করতেন। ছিলেন কেরানি। শংকরের লেখক হওয়া ছিল মিরাকল। বাংলা সাহিত্যের সবথেকে জনপ্রিয় লেখকদের অন্যতম শংকরের জন্ম যশোরের বনগাঁয় ১৯৩৩ সালে। যার পারিবারিক নাম মণিশংকর মুখোপাধ্যায়। কলকাতা হাইকোর্টের শেষ ইংরেজ ব্যারিস্টার নোয়েল ফ্রেডরিক বারওয়েলের অধীনে কাজ করার সময় লেখক সত্তার বিকাশ। নোয়েল বারওয়েলই তাকে সাহিত্যচর্চায় উৎসাহিত করেন।

লিখতে পড়তে জানে অথচ ‘চৌরঙ্গী’ পড়েনি, এমন বাঙালি খুঁজে পাওয়া খুবই কঠিন। বর্তমান প্রজন্মের কাছেও শংকর তুমুল জনপ্রিয়। শংকরের দু’টি উপন্যাস অবলম্বনে সত্যজিৎ রায় সিনেমা বানিয়েছেন ‘সীমাবদ্ধ’ এবং ‘জন অরণ্য’। শংকর বেঁচে থাকবেন তার লেখনীর মাধ্যমে। বাংলাসাহিত্যের বিরলপ্রজ লেখক শংকরের প্রয়ানে বাংলাসাহিত্য হারালো উজ্জ্বল নক্ষত্রকে।

লেখক: সাংবাদিক ও মিডিয়া ব্যক্তিত্ব

সম্পর্কিত লেখা:

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *