■ নাগরিক প্রতিবেদন ■
বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর পুলিশ বাহিনী ও র্যাবের শীর্ষ পদগুলোতে পরিবর্তনের আভাস মিলেছে। মহাপরিদর্শকসহ (আইজিপি) গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে নতুন নিয়োগের প্রস্তুতি ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে।
পদায়ন ও দায়িত্ব প্রদান হবে সম্পূর্ণ মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে। সেখানে রাজনৈতিক পরিচয়ের চেয়ে দক্ষতাকে প্রাধান্য দেওয়া হবে। নির্বাচনের পর কিছু ইউনিটে অভ্যন্তরীণ বদলি হলেও তা হবে নিয়মমাফিক ও পর্যায়ক্রমিক। রাজনৈতিক কারণে সব স্তরে গণহারে বদলির যে চর্চা আছে, তা অনুসরণ করা হবে না। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সদর দপ্তরের সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব জানা গেছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ একান্ত বৈঠকে তাঁর মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের বলেন, ‘কে কোন দলের ভোট দিয়েছেন, সেটা ভুলে যান। আজ থেকে আপনারা সবাই দেশের মানুষের জন্য কাজ করুন।’
পুলিশের মহাপরিদর্শকসহ (আইজিপি) শীর্ষ ছয়টি পদে পরিবর্তন আসছে। আইজিপি ছাড়াও ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার, র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) ডিজি, বিশেষ শাখার (এসবি) প্রধান, অতিরিক্ত আইজিপি (প্রশাসন) এবং ক্রিমিনাল ইনভেস্টিগেশন ডিপার্টমেন্টের (সিআইডি) প্রধান পদেও পরিবর্তন আসতে পারে। এই ছয়টি পদের মধ্যে প্রথম চারটিতে সবাই চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পেয়েছেন। তাদের চুক্তি বাতিল করা হতে পারে। অন্যদিকে শেষ দুইটি পদে যারা আছেন, তারা নিয়োগ পেয়েছেন একটি রাজনৈতিক দলের সুপারিশে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তাদের ভূমিকা ছিল অনেকটা বিএনপিবিরোধী। তাদের জায়গায়ও আসতে পারে নতুন মুখ। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং পুলিশের উচ্চ পর্যায়ের একাধিক সূত্রে জানা গেছে এসব তথ্য। বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, আইজিপি এবং ডিএমপি কমিশনারের চুক্তি বাতিল করে সেখানে নতুন দুজনকে এই দুটি পদে নিয়োগ দিতে এরই মধ্যে ফাইল পাঠানো হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে। এই দুইটি ফাইলে যে কোনো সময় স্বাক্ষর করতে পারেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। নতুন আইজিপি দায়িত্ব নেওয়ার পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সঙ্গে আলোচনা করে বাকি চারটি পদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। ওই চারটি পদের ফাইলও প্রস্তুত করা হয়েছে উল্লেখ করে সূত্র জানায়, আইজিপি-ডিএমপি কমিশনারসহ ছয়টি পদে পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত আসছে সরকারের একেবারে শীর্ষ পর্যায় থেকে। এ ক্ষেত্রে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর খুব একটা ভূমিকা থাকছে না।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আইজিপি ও ডিএমপি কমিশনারের পদে নতুন নিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় ফাইল ইতিমধ্যেই প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। নতুন আইজিপি ও কমিশনার দায়িত্ব নিলে বাকি শীর্ষ পদগুলোর বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে এই পদায়নের প্রক্রিয়া দেখা হচ্ছে।
পুলিশের ভেতরের সূত্র জানিয়েছে, আইজিপি, ডিএমপি কমিশনার ও র্যাব মহাপরিচালক পদে নিয়োগের জন্য ইতিমধ্যেই তদবির শুরু হয়েছে। নিয়োগপ্রার্থীরা বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ে যোগাযোগ করছেন। অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তারাও চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের জন্য তদবির করছেন। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে কাউকে বিশেষ সুবিধা বা প্রশ্রয় দেওয়ার কোনো পরিকল্পনা নেই বলে আশ্বস্ত করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি মন্ত্রণালয়ে কর্মকর্তাদের বলেছেন, শীর্ষ পদগুলোতে নিয়োগ হবে সম্পূর্ণ যোগ্যতার ভিত্তিতে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশ সদর দপ্তরের পদস্থ এক কর্মকর্তা বলেন, গণঅভ্যুত্থানের পর অনেক পুলিশের নামে মামলা হয়েছে, কেউ আত্মগোপনে চলে গেছেন। এরপর আবার গণহারে বদলির ফলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছিল। গত ১৮ মাসে পুলিশ পরিস্থিতি স্থিতিশীল করতে কিছুটা ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছে। সরকার চায় এখন এই ছন্দ ভেঙে না যাক।
কিছু জেলায় নির্বাচন-পরবর্তী নিয়মিত বদলি কার্যক্রম শুরু হয়েছে। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার বগুড়া জেলা পুলিশ মাঠপর্যায়ের এসআই পদমর্যাদার ১৬ জন কর্মকর্তার থানা বদল করেছে। তবে জেলা পুলিশ বলছে, এই বদলি সম্পূর্ণ নিয়মমাফিক এবং সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়েছে।
আইজিপি বাহারুল আলম আর থাকছেন না-এমন গুঞ্জন চলছে বেশ কয়েকদিন ধরেই। বুধবার আইজিপি সিনিয়র কর্মকর্তাদের একটি খুদে বার্তা দেন। ইংরেজিতে লিখা ওই খুদে বার্তার পর গুঞ্জন আরও জোরালো হয়। ওই বার্তায় বলা হয়, আমি চার্লস ডিকেন্সের সেই বিখ্যাত কথাটি স্মরণ করতে চাই-‘এটি ছিল শ্রেষ্ঠ সময়, এটি ছিল সবচেয়ে খারাপ সময়; এটি ছিল প্রজ্ঞার যুগ, এটি ছিল নির্বুদ্ধিতার যুগ, এটি ছিল বিশ্বাসের সময়, এটি ছিল অবিশ্বাসের সময়; এটি ছিল আলোর ঋতু, এটি ছিল অন্ধকারের ঋতু; এটি ছিল আশার বসন্ত, এটি ছিল হতাশার শীত।’ খুদে বার্তায় আরও বলা হয়, ‘গত ১৫ মাসে পুলিশের প্রতিটি সাফল্যের কৃতিত্ব আপনাদের। আর প্রতিটি ব্যর্থতার দায় আমার। সর্বশক্তিমান আল্লাহ আপনাদের সবার মঙ্গল করুন।–বাহারুল আলম, আইজিপি।’
বিডিআর হত্যাকাণ্ড এবং বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য নাসির উদ্দিন আহাম্মদ পিন্টুর মৃত্যু ঘিরে বিতর্ক রয়েছে বাহারুল আলমকে নিয়ে। পিন্টুর পরিবারসহ কয়েকটি সংগঠন দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে যে, তাকে বিডিআর হত্যা মামলায় জড়িয়ে রাজনৈতিক উদ্দেশে গ্রেফতার করা হয়। বাহারুল আলমের অপসারণ ও গ্রেফতারের দাবিতে আন্দোলন করে ‘পিন্টু স্মৃতি সংঘ’। আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর ওই বছরের ২০ নভেম্বর বাহারুল আলমকে চুক্তিভিত্তিক আইজিপি হিসাবে নিয়োগ দেওয়া হয়। সূত্রের দাবি, প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী খোদা বখস চৌধুরীর সুপারিশে এই নিয়োগ হয়েছিল। এমনকি আইজিপির মেয়েকে খোদা বখসের দপ্তরে বিশেষ সহকারী হিসাবেও নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল।
এদিকে পুলিশের শীর্ষ ছয় পদে পরিবর্তনের গুঞ্জন সর্বত্র। ওই পদগুলোতে কাদের নিয়োগ দেওয়া হতে পারে-সেই বিষয়েও জোর আলোচনা রয়েছে। এই পদগুলোতে যাদের পদায়নের সম্ভাবনা আছে তাদের মধ্যে রয়েছেন-হাইওয়ে পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (অতিরিক্ত আইজিপি) দেলোয়ার হোসেন মিঞা, আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক আলী হোসেন ফকির, পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি ছিবগাত উল্লাহ, র্যাবের মহাপরিচালক একেএম শহিদুর রহমান, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) কমিশনার (সুপার নিউমারি অতিরিক্ত আইজি) হাসিব আজিজ, গত সরকারের শেষের দিকে অবসরে যাওয়া অতিরিক্ত আইজিপি মতিউর রহমান শেখ, অবসরপ্রাপ্ত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার সমন্বয়ক (কো-অর্ডিনেটর, গ্রেড-১) আনসার উদ্দিন খান পাঠান, অতিরিক্ত আইজিপি (লজিস্টিকস অ্যান্ড অ্যাসেট অ্যাকুইজিশন) মোসলেহ্ উদ্দিন আহমদ, রেলওয়ে পুলিশে কর্মরত ব্যারিস্টার জিল্লুর রহমান, র্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক ফারুক আহমেদ, চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আহসান হাবীব পলাশ (সুপার নিউমারি অতিরিক্ত আইজি), অতিরিক্ত আইজিপি (উন্নয়ন) সরদার নুরুল আমিন প্রমুখ।
তবে আইজিপি হিসাবে আলী হোসেন ফকির, হাসিব আজিজ, মোসলেহ উদ্দিনের নাম বেশি আলোচনায়। তবে ১৫তম ব্যাচের ব্যারিস্টার জিল্লুর রহমান বা ১২তম ব্যাচের মতিউর রহমান শেখকে আইজিপি হিসাবে নিয়োগ দিলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। এই দুইজনের মধ্যে জুলাইযোদ্ধা হিসাবে ব্যাপকভাবে আলোচিত ব্যারিস্টার জিল্লুর রহমান। তিনি র্যাবের মহাপরিচালকের (ডিজি) দৌড়ে এগিয়ে আছেন। আর মতিউর রহমান শেখ অতিরিক্তি আইজিপি (প্রশাসন) পদ থেকে এলপিআর-এ যান কয়েকমাস আগে। তিনি তার চাকরির মেয়াদ এক বছর বাড়ানোর অবেদন করলেও অন্তর্বর্তী সরকার তা মঞ্জুর করেননি। যদিও ওই সময় এসবি প্রধান এবং র্যাব ডিজির চাকরির মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে।
ডিএমপি কমিশনার হিসাবে যাদের নাম শোনা যাচ্ছে তাদের মধ্যে হাসিব আজিজের নাম বেশি আলোচনায়। এ আলোচনায় আছে মোসলেহ উদ্দিনের নামও। র্যাবের মহাপরিচালক হিসাবে ব্যারিস্টার জিল্লুরের সঙ্গে বেশি উচ্চারিত হচ্ছে আহসান হাবিব পলাশের নাম। এসবি প্রধান হিসাবে সরদার নুরুল আমিন জোরে-শোরে উচ্চারিত হচ্ছে। এছাড়া আইজিপি, র্যাব ডিজি এবং ডিএমপি কমিশনার পদের জন্য লবিং করে যারা ব্যর্থ হবেন তাদের মধ্য থেকেই এসবি-সিআইডি প্রধান এবং অতিরিক্ত আইজি (প্রশাসন) পদে নিয়োগ দেওয়া হতে পারে বলে সূত্র জানিয়েছে।
