বিক্ষোভকারীদের কারণে গভর্নরের অসম্মানজনক বিদায়

■ নাগরিক প্রতিবেদন ■

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের ‘স্বৈরাচারী’ আচরণের প্রতিবাদে সংস্থাটির সর্বস্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রতিবাদ সভার আয়োজন করে বাংলাদেশ ব্যাংক অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিল। এতে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তা–কর্মচারীরা অংশ নেন।

এ দিকে বিভিন্ন দাবি পূরণ ও তিন কর্মকর্তাকে কারণ দর্শানো এবং বদলি প্রত্যাহারের দাবিতে সকালে প্রতিবাদ সমাবেশ করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা। এসব দাবি না মানলে আগামীকাল বৃহস্পতিবার থেকে গভর্নরের পদত্যাগের দাবিতে কলমবিরতিতে যাবেন কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা—এমন ঘোষণা দেওয়া হয় সমাবেশ থেকে।

এ নিয়ে জানতে চাইলে আহসান মনসুর বলেন, ‘পদত্যাগ করতে আমার মাত্র দুই সেকেন্ড সময় লাগবে। আমি এখানে এসেছি জাতির সেবা করতে। দেশের এই সংকটকালীন সময়ে জাতীয় কর্তব্য হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছি।’

কর্মকর্তাদের প্রতিবাদ সভার পর বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নর আহসান এইচ মনসুর এক তাৎক্ষণিক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নর।

আহসান এইচ মনসুর আরও বলেন, কিছু কর্মকর্তা স্বার্থান্বেষী মহলের ইশারায় পরিচালিত হয়ে প্রতিষ্ঠানের মান-মর্যাদা ক্ষুণ্ন করছেন। কর্মকর্তাদের অবশ্যই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সার্ভিস রুলস মেনে চলতে হবে। যদি কেউ প্রতিষ্ঠানের নীতিমালার বাইরে গিয়ে কাজ করতে চান, তবে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা রক্ষায় কোনো প্রকার অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা সহ্য করা হবে না।

তাৎক্ষণিক সংবাদ সম্মেলনে গভর্নর

প্রতিবাদ সভার কিছুক্ষণ পরই তাৎক্ষণিক সংবাদ সম্মেলনে গভর্নর আহসান এইচ মনসুর। তিনি বলেন, কিছু কর্মকর্তা স্বার্থান্বেষী মহলের ইশারায় প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছেন। তিনি স্পষ্ট করেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সার্ভিস রুলস মেনে চলা সবার জন্য বাধ্যতামূলক এবং নীতিমালার বাইরে গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা ও সক্ষমতা রক্ষার প্রশ্নে কোনো আপস হবে না বলেও জানান তিনি।

আর্থিক খাতে চলমান কাঠামোগত সংস্কার, আমানতকারীদের সুরক্ষা এবং দুর্বল ব্যাংক পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টাকে বর্তমান প্রশাসনের অগ্রাধিকার হিসেবে তুলে ধরেন গভর্নর।

পদত্যাগের দাবি প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, পদত্যাগ করতে তার ‘দুই সেকেন্ড’ লাগবে, তবে তিনি এসেছেন জাতির সেবা করতে এবং সংকটকালে দায়িত্ব নিয়েছেন জাতীয় কর্তব্য হিসেবে।

দুপুর গড়াতেই বিভিন্ন মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে—সরকার নতুন গভর্নর নিয়োগ দিতে যাচ্ছে।

সরিয়ে দেওয়ার খবর শুনে আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা ছাড়াই গভর্নর আহসান এইচ মনসুর কেন্দ্রীয় ব্যাংক কার্যালয় ত্যাগ করেন। বের হওয়ার সময় সাংবাদিকদের তিনি বলেন, তিনি পদত্যাগ করেননি; নিয়োগসংক্রান্ত খবর শুনেছেন মাত্র। নির্ধারিত সরকারি গাড়ি রেখে ব্যক্তিগত গাড়িতে তিনি ব্যাংক ত্যাগ করেন।

বিক্ষোভকারীদের কারণে গভর্নরের অসম্মানজনক বিদায়

গভর্নরের উপদেষ্টাকে লাঞ্ছিত করে বের করে দেন কর্মকর্তারা

এর মধ্যেই আরেকটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে। গভর্নরের উপদেষ্টা আহসান উল্লাহকে ‘মব’ করে বের করে দেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কিছু কর্মকর্তা। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, স্লোগান ও উত্তেজনার মধ্যেই তাকে গাড়িতে তুলে দেওয়া হয়। তারা ‘ধর ধর’ বলে স্লোগান দেন। কেউ কেউ গায়ে হাত তোলার চেষ্টা করেন। এ সময় আহসান উল্লার প্রতি ক্ষিপ্ত হয়ে তেড়ে আসেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালক তৌহিদুল ইসলাম। এসময় তিনি অকথ্য ভাষায় গালাগালিও করেন।

এছাড়া নির্বাহী পরিচালক সরোয়ার হোসেন, পরিচালক নওশাদ মোস্তফা, অতিরিক্ত পরিচালক তানভীর আহমেদসহ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রায় ২০/৩০ জন কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন।

ঘটনাটিকে দুঃখজনক আখ্যা দিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, নতুন সরকারের সময়ে এমন আচরণ গ্রহণযোগ্য নয়, যা সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে পারে। তিনি সবাইকে সংযম ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলার আহ্বান জানান।

সব মিলিয়ে দিনভর উত্তেজনা, পাল্টাপাল্টি বক্তব্য ও প্রশাসনিক অনিশ্চয়তায় অস্থির ছিল দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

বুধবার দুপুরের দিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কার্যালয় থেকে হঠাৎ বেরিয়ে গেছেন গভর্নর। এ সময় পদত্যাগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি এখন বাংলাদেশ ব্যাংকের কেউ না।’

বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে বের হওয়ার সময় ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘আমি পদত্যাগ করিনি এবং আমাকে রিমুভ করার আনুষ্ঠানিক চিঠি পাইনি। তবে শুনেছি যে আমি পদে নেই। সেজন্য শোনার পর বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে চলে যাচ্ছি।’

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক আহসান উল্লাহ এক বছরের চুক্তিতে গত বছরের জানুয়ারিতে নিয়োগ পান। বাংলাদেশ ব্যাংকের সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়নে গভর্নরকে সহায়তা করাই ছিল তাঁর দায়িত্ব।

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *