১৭০ বছর পর আবারও বন্ধ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি

■ নাগরিক নিউজ ডেস্ক ■

ভারতবর্ষে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের গোড়াপত্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী মূল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি আবার বন্ধ হয়ে গেছে। লন্ডনে বিলাসবহুল খুচরা ব্র্যান্ড হিসেবে পুনরুজ্জীবিত হওয়া কোম্পানিটির আধুনিক সংস্করণ দেউলিয়া হয়ে ব্যবসা গুটিয়ে নিয়েছে। এর মাধ্যমে দীর্ঘ ও বিতর্কিত ইতিহাস সৃষ্টিকারী এক ব্যতিক্রমী প্রতিষ্ঠানের বিলুপ্তি ঘটল।

মূল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি (ইআইসি) প্রায় পৌনে দুই শ বছর আগে প্রথম নিষ্ক্রিয় হয়ে গিয়েছিল। এর অনেক পরে ২০১০ সালে সঞ্জীব মেহতা নামে একজন ব্রিটিশ-ভারতীয় উদ্যোক্তা কোম্পানিটিকে পুনরায় চালু করেন। তিনি লন্ডনের মেফেয়ার এলাকায় উচ্চমানের চা ও উন্নত মানের খাদ্যপণ্য বিক্রির ব্র্যান্ড হিসেবে এটিকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন। কিন্তু সেই পুনর্জাগরণ চেষ্টাও শেষ পর্যন্ত আর্থিকভাবে টেকেনি।

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি লিমিটেড ২০২৫ সালের অক্টোবরে লিকুইডেটর নিয়োগ করে। তখন প্রতিষ্ঠানটির মোট ঋণের পরিমাণ ছিল সাড়ে ৯ লাখ ইউরোর বেশি। ব্যবসা গুটিয়ে ফেলা বা বন্ধ করে দেওয়ার লক্ষ্যে লিকুইডেটর নিয়োগ করা হয়। এই প্রক্রিয়ায় কোম্পানির সম্পদ বা সম্পত্তি বিক্রি করে তার দায়দেনা বা ধার পরিশোধ করা হয়। কোম্পানিটির ব্রিটিশ ভার্জিন দ্বীপপুঞ্জে নিবন্ধিত মূল প্রতিষ্ঠানের কাছে পাওনা ছিল ৬ লাখ ইউরোর বেশি, বকেয়া কর ১ লাখ ৯৩ হাজার ৭৮৯ ইউরো এবং কর্মীদের বকেয়া ১ লাখ ৬৩ হাজার ১০৫ ইউরো।

কোম্পানির ওয়েবসাইট এখন আর চালু নেই। লন্ডনের মেফেয়ারের ৯৭ নিউ বন্ড স্ট্রিটে অবস্থিত তাদের ফ্ল্যাগশিপ স্টোরটি খালি পড়ে আছে এবং ভাড়ার জন্য তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।

এ–সংক্রান্ত আরেকটি প্রতিষ্ঠান, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কালেকশনস লিমিটেডের বিরুদ্ধেও ঋণদাতারা উইন্ডিং-আপ পিটিশন করেছে। মেহতার সঙ্গে যুক্ত এবং ‘ইস্ট ইন্ডিয়া’ নাম ব্যবহারকারী আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানও বিলুপ্ত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

সঞ্জীব মেহতা ২০১০ সালে যখন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নাম ব্যবহারের অধিকার কেনেন, তখন বিষয়টি ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। অনেকেই এতে প্রতীকী তাৎপর্য দেখেছিলেন—যে প্রতিষ্ঠান একসময় ভারতবর্ষের বৃহৎ অংশ শাসন করেছিল, সেটির মালিকানা এখন একজন ভারতীয় ব্যবসায়ীর হাতে।

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে এটিকে ইতিহাসের এক উল্টো চিত্র হিসেবে বর্ণনা করা হয়—সাবেক উপনিবেশ স্থাপনকারীর প্রতিষ্ঠান এখন শাসিত ও শোষিত দেশের একজন নাগরিকের নিয়ন্ত্রণে।

মেফেয়ারে দুই হাজার বর্গফুটের একটি বিলাসবহুল স্টোর চালু করেন সঞ্জীব মেহতা। এতে প্রিমিয়াম চা, চকলেট, মসলা, কনফেকশনারি ও অন্যান্য উন্নত মানের পণ্য বিক্রি হতো। ব্র্যান্ডটিকে তিনি ফোর্টনাম অ্যান্ড ম্যাসনের মতো ঐতিহ্যবাহী ব্রিটিশ খুচরা বিক্রেতাদের কাতারে স্থান পাওয়ার চেষ্টা করেন।

২০১৭ সালে দ্য গার্ডিয়ানকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মেহতা তাঁর ব্র্যান্ড–ভাবনার কথা ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন, ‘একজন ভারতীয় নাগরিকের ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মালিক হওয়া কেমন দেখায়, কীভাবে একটি নেতিবাচক বিষয়কে ইতিবাচকে রূপ দেওয়া যায়, সে জন্যই তিনি এটি কেনেন। ঐতিহাসিক কোম্পানিটি গড়ে উঠেছিল আগ্রাসনের ভিত্তিতে, কিন্তু বর্তমানটি সহমর্মিতার প্রতীক।’

প্রতীকী গুরুত্ব ও প্রাথমিক আগ্রহ সত্ত্বেও আধুনিক কোম্পানিটি আর্থিকভাবে টিকে থাকতে পারেনি এবং শেষ পর্যন্ত কার্যক্রম বন্ধ করেছে।

১৬০০ সালের ৩১ ডিসেম্বর রানি প্রথম এলিজাবেথের দেওয়া রাজকীয় সনদের মাধ্যমে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি ছিল একটি যৌথ মূলধনি কোম্পানি, যেখানে বিনিয়োগকারীরা শেয়ার কিনে লাভ–লোকসান দুটোরই ভাগীদার হতেন।

১৬১২–১৬১৩ সালের দিকে সুরাটে কোম্পানিটি প্রথম বাণিজ্যকেন্দ্র স্থাপন করে। ১৮ শতকে এসে এটি একটি সাধারণ বাণিজ্য প্রতিষ্ঠান থেকে শক্তিশালী রাজনৈতিক ও সামরিক শক্তিতে রূপ নেয়। তারা দুর্গ নির্মাণ করে, স্থানীয় শাসকদের সঙ্গে জোট গড়ে এবং ইউরোপীয় প্রতিদ্বন্দ্বী ও ভারতীয় রাজ্যগুলোর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে।

কোম্পানির নীতির ফলে ব্যাপক শোষণ, নগদ ফসল চাষে বাধ্য করা এবং অর্থনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি হয়। এসব কর্মকাণ্ড বারবার দুর্ভিক্ষ ডেকে আনে, যার মধ্যে গ্রেট বেঙ্গল ফেমিন অন্যতম; এতে আনুমানিক তিন কোটি মানুষের মৃত্যু হয়।

১৮৫৭ সালে ভারতের প্রথম স্বাধীনতাযুদ্ধের পর ১৮৫৮ সালে ব্রিটিশ সরকার সরাসরি ভারতের শাসনভার গ্রহণ করে, যার মাধ্যমে কোম্পানির শাসনের অবসান ঘটে। পরবর্তী সময়ে ১৮৭৪ সালে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট আনুষ্ঠানিকভাবে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে বিলুপ্ত ঘোষণা করে এবং সব ক্ষমতা ব্রিটিশ রাজপরিবারের কাছে হস্তান্তর করে। এর মধ্য দিয়েই ভারতে ব্রিটিশরাজের সূচনা হয়।

১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধের পর তারা বাংলার মত অঞ্চল শাসনের সুযোগ পেয়ে যায়। কর আদায়, আদালত পরিচালনা এবং প্রশাসনিক কার্যক্রম শুরু করে। এক পর্যায়ে কিছু পণ্যের ক্ষেত্রে বিশ্ব বাণিজ্যের প্রায় অর্ধেকই তাদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। ভারতে তারা কার্যত সরকারের ভূমিকা পালন করত।

তবে তাদের শোষণ, নীলের মত অর্থকরী ফসল চাষে বাধ্য করা এবং রপ্তানিনির্ভর নীতির কারণে দুর্ভিক্ষ তীব্র রূপ পায়। ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের মধ্য দিয়ে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনের অবসান ঘটে। ভারতের শাসনভার চলে যায় ব্রিটিশ রাজের হাতে। ব্রিটিশ পার্লামেন্ট ১৮৭৪ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে এ কোম্পানি বিলুপ্ত করে।

সম্পর্কিত লেখা:

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *