■ নাগরিক নিউজ ডেস্ক ■
ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি (৮৬) ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় নিহত হয়েছেন। সরকারি টেলিভিশন চ্যানেল আইআরআইবি তাদের প্রতিবেদনে বলেছে, “আমাদের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা শহীদ হয়েছেন। ইরানকে সমুন্নত রাখতে এই মহান পণ্ডিত এবং যোদ্ধা তার জীবন উৎসর্গ করেছেন।”
খামেনির নিহতের ঘটনায় ৪০ দিনের শোক ঘোষণা করেছে ইরান।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথ অভিযান চালিয়ে শনিবার ভোরের দিকে তেহরানে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে হত্যা করে। মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ ও ইসরায়েলি গোয়েন্দাদের শেষ মুহূর্তের তথ্যের ভিত্তিতে তেহরানে উচ্চপর্যায়ের অত্যন্ত গোপনীয় এক বৈঠক চলাকালীন ওই অভিযান পরিচালনা করা হয়। একেবারে গোপনীয় এবং সুরক্ষিত কক্ষে বৈঠকের সময় যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের নিখুঁত হামলা ইরানি নিরাপত্তা বাহিনীকে সেই সময় পুরোপুরি অপ্রস্তুত করে দেয়।
গতকাল (শনিবার) সকালে তার প্রাসাদকে লক্ষ্য করে হামলা চালায় ইসরায়েলি ও মার্কিন সেনারা। তারপর রাতের দিকে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু প্রথমে খামেনি নিহত হয়েছেন বলে জানান। পরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও, খামেনির নিহতের তথ্য নিশ্চিত করেন।
সরকারিভাবে ইরান প্রথমে খামেনির নিহতের তথ্য স্বীকার করেনি। অবশেষে আজ রোববার বাংলাদেশ সময় সকালে খামেনির নিহত হওয়ার তথ্য স্বীকার করেছে তেহরান।
ইরানে ক্ষমতাসীন শিয়াপন্থি ইসলামি প্রজাতান্ত্রিক সরকারের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দেশটির প্রতিরক্ষা বাহিনীর কমান্ডার ইন চিফ ছিলেন আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। সেই সঙ্গে পার্লামেন্ট, নির্বাহী বিভাগ, বিচার বিভাগ, অর্থ ও ব্যাংক ব্যবস্থা, রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা বিভাগ-সহ ইরানের সর্বক্ষেত্রে ছিল অত্যন্ত গভীর এবং সর্বব্যাপী। মূলত তার নির্দেশনাতেই ইরানের সরকার চলতো।
একাধিক মার্কিন সূত্র বলেছে, খামেনি শনিবার সকালে তেহরানের মধ্যাঞ্চলের একটি সুরক্ষিত ভবনে শীর্ষ উপদেষ্টাদের সঙ্গে বৈঠকে বসছেন বলে গোয়েন্দারা নিশ্চিত করেছিলেন।
মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ গত কয়েক মাস ধরে খামেনিকে নজরদারিতে রেখেছিল এবং তার অবস্থান সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট তথ্য তাদের কাছে ছিল। সেসব তথ্য প্রতি মুহূর্তে ইসরায়েলি গোয়েন্দাদের সঙ্গে ভাগাভাগি করে আসছিল সিআইএ।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল শুরুতে রাতের দিকে ইরানে হামলার পরিকল্পনা করেছিল। কিন্তু ইসরায়েলি গোয়েন্দারা জানতে পারেন, খামেনির নির্ধারিত বৈঠকটি সন্ধ্যার পরিবর্তে শনিবার সকালেই শুরু হয়েছে। গোয়েন্দাদের এই তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান দ্রুত এগিয়ে নেওয়া হয়।
মার্কিন সূত্র বলেছে, শীর্ষ উপদেষ্টাদের সঙ্গে খামেনির বৈঠকের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পরই মার্কিন-ইসরায়েলের যৌথ বিমান ও নৌ হামলা শুরু হয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথমে ইরানের সর্বোচ্চ নেতাকে লক্ষ্য করে হামলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কারণ সময় পেলে তিনি আত্মগোপনে যেতে পারেন; এমন ধারণা ছিল মার্কিন গোয়েন্দাদের।
ইরানি দুটি নিরাপত্তা সূত্র বলেছে, হামলার কিছুক্ষণ আগেই ইরানের সর্বোচ্চ এই নেতা দেশটির প্রতিরক্ষা পরিষদের সেক্রেটারি আলী শামখানি এবং সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সেক্রেটারি আলী লারিজানির সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন।
ইসরায়েলি সময় ভোর ৬টায় শুরু হওয়া এই অভিযানে ইসরায়েলের ও যুক্তরাষ্ট্রের কয়েক ডজন যুদ্ধবিমান তেহরানে পৌঁছাতে প্রায় দুই ঘণ্টা সময় নেয়। সকাল ৯টা ৪০ মিনিটে খামেনির ব্যাপক নিরাপত্তা বেষ্টিত ভবনে ৩০টি বোমা ফেলে তা পুরোপুরি ধ্বংস করে দেওয়া হয়।
নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প লিখেছেন, মার্কিন ট্র্যাকিং সিস্টেম খামেনির অবস্থান শনাক্ত করেছিল এবং এই হামলায় তাকেসহ অন্য ইরানি নেতাদের হত্যা করা হয়েছে। ইসরায়েলের জ্যেষ্ঠ এক কর্মকর্তাও খামেনির মরদেহ উদ্ধারের তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
ইসরায়েল বলেছে, খামেনির সঙ্গে আলী শামখানি এবং আইআরজিসির কমান্ডার মোহাম্মদ পাকপুরসহ কয়েকজন সামরিক ও রাজনৈতিক নেতাও নিহত হয়েছেন।
রোববার ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ইরনা ইসরায়েলি-মার্কিন হামলায় শামখানি ও পাকপুরের মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করেছে। এছাড়া বিপ্লবী গার্ডের অ্যারোস্পেস ফোর্সের কমান্ডার সৈয়দ মজিদ মুসাভি এবং গোয়েন্দা উপমন্ত্রী মোহাম্মদ শিরাজিসহ প্রায় ৪০ জন কর্মকর্তা ওই যৌথ হামলায় নিহত হয়েছেন।
দেশটির বার্তা সংস্থা ফারস নিউজ এজেন্সির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, খামেনির পরিবারের কয়েকজন সদস্যও হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন। তাদের মধ্যে তার মেয়ে, জামাতা, নাতি এবং এক পুত্রবধূ রয়েছেন। পরে ইরানি সশস্ত্র বাহিনীর চিফ অব স্টাফ মেজর জেনারেল আবদুর রহিম মুসাভির মৃত্যুর খবরও নিশ্চিত করা হয়েছে।
ইরান এই ঘটনায় ৪০ দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেছে এবং হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, হামলার আদেশদাতারা শিগগিরই তাদের কর্মকাণ্ডের জন্য অনুশোচনা করবে। খামেনির উপদেষ্টা মোহাম্মদ মোখবার বলেছেন, সংবিধান অনুযায়ী ‘অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস’ দ্রুত নতুন নেতা নির্বাচন করবে।
অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে প্রেসিডেন্ট, বিচার বিভাগীয় প্রধান এবং গার্ডিয়ান কাউন্সিলের একজন আলেমকে নিয়ে গঠিত তিন সদস্যের কাউন্সিল খামেনির দায়িত্ব পালন করবে।
মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ বলছে, খামেনির স্থলাভিষিক্ত হিসেবে আইআরজিসির কট্টরপন্থীরা ক্ষমতায় আসতে পারেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই অভিযানকে ইরানের জন্য বড় ধাক্কা হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
তিনি বলেছেন, এর ফলে একটি কূটনৈতিক সমাধানের পথ সুগম হয়েছে। মার্কিন গণমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ইরানে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য কয়েকজন ভালো প্রার্থী রয়েছেন।
