জুলাই জাতীয় সনদ ও গণভোট কেন অবৈধ নয়

■ নাগরিক প্রতিবেদক ■

জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ, গণভোট অধ্যাদেশ ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথের চিঠি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট।

এই সংক্রান্ত পৃথক রিটের পরিপ্রেক্ষিতে আজ মঙ্গলবার (৩ মার্চ) বিচারপতি রাজিক আল জলিল ও বিচারপতি মো. আনোয়ারুল ইসলামের বেঞ্চ এই রুল জারি করেন।

আগামী চার সপ্তাহের মধ্যে রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে।

আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে শুনানিতে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেলের দায়িত্বে থাকা মোহাম্মদ আরশাদুর রউফ ও অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল অনীক আর হক।

রিট আবেদনকারীদের পক্ষে ছিলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী আহসানুল করিম, সৈয়দ মামুন মাহবুব, ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া ও জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের সাংগঠনিক সম্পাদক গাজী কামরুল ইসলাম সজল প্রমুখ। আর রিটের বিপক্ষে ছিলেন এনসিপির সিনিয়র আইনজীবী মোহাম্মদ হোসেন এবং জামায়াতের পক্ষে ছিলেন মোহাম্মদ শিশির মনির ও ইমরান এ সিদ্দিক।

গত ২৩ ফেব্রুয়ারি সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী চৌধুরী মো. রেদোয়ান-ই-খোদা জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ এবং গণভোট অধ্যাদেশের ৩ ধারা ও তফসিলের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে রিট করেন। আর জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ এবং এর আলোকে সংবিধান সংস্কার পরিষদ সদস্যের শপথের জন্য গত ১৬ ফেব্রুয়ারি দেওয়া চিঠির বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে গত সপ্তাহে রিট করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী গাজী মো. মাহবুব আলম। রিটকারীদের দুজনই বিএনপিপন্থী আইনজীবী।

এর আগে সোমবার (২ মার্চ) জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ, গণভোট অধ্যাদেশ ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে পৃথক রিট দায়ের করা হয়।

এদিকে গত ১৮ ফেব্রুয়ারি জুলাই জাতীয় সনদ বাতিল ও সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ঘোষণার নির্দেশনা চেয়ে আরেকটি রিট দায়ের করা হয়। রিটে জুলাই জাতীয় সনদের কার্যকারিতা স্থগিত চাওয়া হয়।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট ইউনুছ আলী আকন্দ জনস্বার্থে এ রিট দায়ের করেন।

রিটে মন্ত্রিপরিষদ সচিব, আইন সচিব, জাতীয় ঐক্যমত কমিশন, প্রধান নির্বাচন কমিশনার সহ সংশ্লিষ্টদের রিটে বিবাদী করা হয়েছে।

রিটকারী পক্ষের আইনজীবীরা শুনানিতে বলেন, সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির আদেশে সংবিধান সংস্কারের কোনো সুযোগ নেই। দেশের সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় সংসদে সংবিধান সংস্কারের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়।

অন্যদিকে রিটের বিপক্ষের আইনজীবীরা বলেন, গণভোট অধ্যাদেশ অসাংবিধানিক হলে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়েও প্রশ্ন উঠবে।

দীর্ঘ এক বছরের আলোচনা, সংলাপ ও তর্কবিতর্কের পর রাষ্ট্র সংস্কারের উদ্যোগগুলো নিয়ে জাতীয় সনদ চূড়ান্ত করা হয়, যা স্বাক্ষর হয় গত বছরের ১৭ অক্টোবর। তবে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন কীভাবে হবে, তা নিয়ে দলগুলোর মধ্যে তীব্র মতবিরোধ দেখা দেয়।

এরপর গতবছর ১৩ নভেম্বর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনই গণভোট আয়োজনের সময় দিয়ে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ জারি করা হয়। আর গণভোট আয়োজনে জারি করা হয় গণভোট অধ্যাদেশ।

জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশে বলা হয়, গণভোটে হ্যাঁ বিজয়ী হলে এই আদেশ জারির পর অনুষ্ঠেয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ীদের সমন্বয়ে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হবে, যা সংবিধান সংস্কার বিষয়ে সব ধরনের ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারবে। সেজন্য নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা আলাদাভাবে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবেও শপথ নেবেন।

গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে অনুষ্ঠিত গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হওয়ায় জুলাই সনদে অন্তর্ভুক্ত সংস্কার প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নের দায়িত্ব সংবিধান সংস্কার পরিষদের ওপর বর্তানোর কথা ছিল। কিন্তু নির্বাচনে দুই তৃতীয়াংশের বেশি আসনে জয় পাওয়া বিএনপির নির্বাচিতরা ১৭ ফেব্রুয়ারি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ না নিয়ে কেবল সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিলে শুরুতেই জটিলতা দেখা দেয়।

সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ না নেওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করে সালাহউদ্দিন আহমদ সেদিন শপথ ফর্ম তুলে ধরে বলেছিলেন, “আমরা কেউ সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসাবে নির্বাচিত হইনি এবং সংবিধানে এটা এখনও ধারণ করা হয়নি। গণভোটের রায় অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হলে সেটা সংবিধানে আগে ধারণ করতে হবে এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্যকে কে শপথ নেওয়াবেন, সেটা বিধান করতে হবে এবং কোনো এরকম ফর্ম—এটা সংবিধানে নেই।”

বিএনপি সংবিধান সংস্কার পরিষদ সদস্যের শপথ না নেওয়ায় জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপিসহ ১১ দলীয় জোট থেকে নির্বাচিতরা প্রথমে শপথ নিতে না চাইলেও পরে দুই শপথই নেন। বিএনপির ভূমিকার জন্য তারা কঠোর সমালোচনা করেন।

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *