খামেনি-পরবর্তী ইরানের হাল কে ধরবেন

■ নাগরিক নিউজ ডেস্ক ■

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মৃত্যুর পর দেশটির প্রায় চার দশকের স্থিতিশীল প্রশাসনিক কাঠামো এক বিশাল অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।

একদিকে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের বিধ্বংসী সামরিক অভিযান, অন্যদিকে ক্ষমতার কেন্দ্রে খামেনির শূন্যতা—এই দুই বাস্তবতার মাঝে ইরান এখন তার অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে লিপ্ত।

খামেনির মৃত্যু কেবল একজন ব্যক্তির বিদায় নয়, বরং এটি ইরানের ইসলামিক বিপ্লবের সেই স্তম্ভের পতন যা রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা, ধর্মীয় শাসন এবং বৈদেশিক নীতির চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করত।

এই মুহূর্তে তেহরানের রাজপথ থেকে শুরু করে গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরগুলোতে একই প্রশ্ন প্রতিধ্বনিত হচ্ছে—এখন ইরানের হর্তাকর্তা কে এবং খামেনির স্থলাভিষিক্ত হওয়ার দৌড়টি শেষ পর্যন্ত কোন দিকে মোড় নেবে? ইরান ইন্টারন্যাশনাল ও আলজাজিরা সেই উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছে।

অস্থায়ী নেতৃত্ব কাউন্সিল ও ক্ষমতার বর্তমান বিন্যাস

সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যুর পরপরই ইরানের সংবিধান অনুযায়ী ক্ষমতার কোনো শূন্যতা যাতে তৈরি না হয়, সেজন্য একটি অন্তর্বর্তীকালীন নেতৃত্ব কাউন্সিল গঠন করা হয়েছে।

সংবিধানের ১১১ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, নতুন নেতা নির্বাচিত হওয়ার আগ পর্যন্ত একটি তিন সদস্যের পরিষদ রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ দায়িত্ব পালন করে।

বর্তমান কাউন্সিলে রয়েছেন সংস্কারপন্থী হিসেবে পরিচিত প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, কট্টরপন্থী প্রধান বিচারপতি গোলাম-হোসেন মোহসেনি-এজেই এবং প্রভাবশালী আলেম আয়াতুল্লাহ আলিরেজা আরাফি। এই তিন ব্যক্তি এখন কার্যত একটি যৌথ নেতৃত্বের মাধ্যমে ইরান পরিচালনা করছেন।

তবে এই কাউন্সিলের ক্ষমতা স্থায়ী নয়; তাদের প্রধান কাজ হলো রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং নতুন সুপ্রিম লিডার নির্বাচনের জন্য ক্ষেত্র প্রস্তুত করা।

এই মুহূর্তে বিপ্লবী রক্ষীবাহিনী বা আইআরজিসির সঙ্গে সমন্বয় করে রণকৌশল নির্ধারণ করা এবং আঞ্চলিক মিত্রদের দিকনির্দেশনা দেওয়াই এই কাউন্সিলের প্রধান চ্যালেঞ্জ।

আয়াতুল্লাহ আলিরেজা আরাফি ও নেপথ্যের কলকাঠি

অন্তর্বর্তী কাউন্সিলের সদস্যদের মধ্যে আয়াতুল্লাহ আলিরেজা আরাফি বর্তমানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন।

যদিও সাধারণ জনগণের কাছে তার পরিচিতি মোহসেনি-এজেই বা পেজেশকিয়ানের মতো নয়, কিন্তু ধর্মীয় ও শাসনতান্ত্রিক কাঠামোতে তার শিকড় অনেক গভীরে।

আরাফি একইসঙ্গে গার্ডিয়ান কাউন্সিলের সদস্য ও সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচনের দায়িত্বে থাকা ‘অ্যাসেম্বলি অফ এক্সপার্টস’-এর ডেপুটি চেয়ারম্যান। খামেনির অত্যন্ত বিশ্বস্ত এই আলেম ইরানের মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থা এবং আল-মুস্তফা আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

খামেনির অনুপস্থিতিতে ধর্মীয় বৈধতা ও রাষ্ট্রীয় আনুগত্যের মেলবন্ধন ঘটানোর জন্য আরাফিই এখন সবচেয়ে শক্তিশালী মধ্যস্থতাকারী।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, নেপথ্যের ক্ষমতার দ্বন্দ্বে আরাফি এমন একজন ব্যক্তি যিনি কট্টরপন্থী ও আমলাতন্ত্র—উভয় পক্ষকেই সন্তুষ্ট রাখতে সক্ষম।

উত্তরাধিকার নির্বাচনের সাংবিধানিক ও ধর্মীয় প্রক্রিয়া

ইরানে সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচনের প্রক্রিয়াটি মূলত ‘অ্যাসেম্বলি অফ এক্সপার্টস’ বা বিশেষজ্ঞ পরিষদের ওপর ন্যস্ত।

৮৮ জন প্রবীণ আলেম ও ধর্মীয় পণ্ডিত নিয়ে গঠিত এই পরিষদটি প্রতি আট বছর অন্তর জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হয়। খামেনির মৃত্যু হওয়ায় এই পরিষদ এখন এক রুদ্ধদ্বার অধিবেশনে মিলিত হবে।

নিয়ম অনুযায়ী, পরিষদের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের উপস্থিতিতে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটের ভিত্তিতে নতুন নেতা নির্বাচন করা হবে।

প্রার্থীকে অবশ্যই একজন উচ্চপদস্থ মুজতাহিদ বা ধর্মীয় বিশেষজ্ঞ হতে হবে যার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং সাহসিকতা রয়েছে।

বর্তমান যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে এই পরিষদ দ্রুত সিদ্ধান্ত নেবে নাকি কৌশলগত কারণে সময় নেবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। কারণ যুদ্ধের ময়দানে নতুন নেতা নির্বাচিত হওয়া মানেই তাকে শত্রুর প্রধান লক্ষ্যে পরিণত করা।

তবে নেতৃত্বের এই প্রক্রিয়াটি যতটা ধর্মীয়, তার চেয়েও বেশি রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট।

ক্ষমতার দৌঁড়ে এগিয়ে থাকা সম্ভাব্য উত্তরসূরিদের চালচিত্র

খামেনি তার উত্তরসূরি হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে কারো নাম ঘোষণা করে যাননি, যা উত্তরাধিকারের এই লড়াইকে আরও জটিল করে তুলেছে।

সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকায় সবচেয়ে আলোচিত নাম হলো মোস্তফা খামেনি। খামেনির মেজ ছেলে হিসেবে তিনি পর্দার আড়ালে থেকে দীর্ঘদিন ধরে আইআরজিসি ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সঙ্গে কাজ করেছেন।

তবে ইরানে ১৯৫৩ সালের রাজতন্ত্রের তিক্ত অভিজ্ঞতা থাকায় ‘বংশগত উত্তরাধিকার’ বা বাবার পর ছেলের সিংহাসনে বসা অনেক ধর্মীয় নেতার কাছেই অগ্রহণযোগ্য।

অন্যদিকে, আলিরেজা আরাফি নিজে একজন শক্তিশালী দাবিদার কারণ তিনি বর্তমান ব্যবস্থার ভেতরে অত্যন্ত সক্রিয়।

তালিকায় আরও রয়েছেন মোহাম্মদ মেহেদি মিরবাঘেরি, যিনি তার কট্টর পশ্চিমাবিরোধী চিন্তাধারার জন্য পরিচিত।

সংস্কারপন্থীদের একাংশ হাসান খোমেনির নাম ভাবলেও কট্টরপন্থী নিয়ন্ত্রিত গার্ডিয়ান কাউন্সিলের বাধা পেরোনো তার জন্য প্রায় অসম্ভব।

তবে শেষ পর্যন্ত এমন কাউকেও দেখা যেতে পারে যার নাম আগে কখনো আলোচনায় আসেনি।

আইআরজিসির অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণ

ইরানের ক্ষমতার সমীকরণে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস বা আইআরজিসি এখন সবচেয়ে প্রভাবশালী শক্তি।

সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যুর পর ধর্মীয় নেতাদের চেয়েও সামরিক কমান্ডারদের ভূমিকা এখন অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক।

খামেনি তার শাসনামলে আইআরজিসিকে এমনভাবে শক্তিশালী করেছেন যে তারা এখন কেবল একটি সামরিক বাহিনী নয়, বরং দেশের অর্থনীতির বিশাল অংশ এবং বৈদেশিক নীতির মূল নিয়ামক।

বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে আইআরজিসির শীর্ষ কমান্ড পরবর্তী নেতা নির্বাচনের ক্ষেত্রে ‘ভেটো’ দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।

তারা এমন একজনকে চাইবে যিনি যুদ্ধের ময়দানে অটল থাকবেন এবং সামরিক বাহিনীর তহবিলে কোনো হস্তক্ষেপ করবেন না।

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপাচ্য বিষয়ক জেসন ব্রডস্কির মতো বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের বর্তমান সামরিক কর্মকাণ্ড এখন অনেকটা ‘অটো-পাইলট’ মোডে চলছে, যেখানে কেন্দ্রীয় নির্দেশের চেয়ে আঞ্চলিক কমান্ডারদের তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তগুলো বেশি কার্যকর হচ্ছে।

বিকেন্দ্রীভূত শাসনব্যবস্থা ও যুদ্ধের ধারাবাহিকতা

ইরানের শাসনব্যবস্থা এমনভাবে সাজানো হয়েছে যাতে শীর্ষ নেতৃত্বের পতনে পুরো রাষ্ট্র ভেঙে না পড়ে।

খামেনি গত কয়েক দশকে ক্ষমতাকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সামরিক শাখার মধ্যে বণ্টন করে দিয়েছিলেন।

এর ফলে তেহরানে বোমাবর্ষণ বা শীর্ষ নেতৃত্বের প্রাণহানির পরেও দেশটির ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা বা অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বাহিনীগুলো কাজ চালিয়ে যেতে পারছে।

আইআরজিসির বিকেন্দ্রীভূত চেইন অফ কমান্ডের কারণে মাঠ পর্যায়ের অফিসাররা খামেনির অনুপস্থিতিতেও ইসরায়েল বা মার্কিন ঘাঁটিতে ড্রোন হামলা অব্যাহত রেখেছে।

এই প্রশাসনিক স্থায়িত্বই প্রমাণ করে যে ইরান কেবল একজন ব্যক্তির ইচ্ছায় চলে না, বরং এটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক একনায়কতন্ত্র যা যেকোনো আঘাত সহ্য করার মতো সক্ষমতা রাখে।

তবে দীর্ঘমেয়াদে এই বিকেন্দ্রীকরণ ক্ষমতার দ্বন্দ্বে রূপ নিতে পারে কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

আঞ্চলিক রাজনীতি ও প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর প্রভাব

খামেনির মৃত্যু এবং পরবর্তী অস্থিরতা কেবল ইরানের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়; এটি পুরো মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিকে কাঁপিয়ে দিয়েছে।

ইরাক, লেবানন, ইয়েমেন ও সিরিয়ায় ইরানের যে ‘প্রক্সি’ বা ছায়া গোষ্ঠীগুলো রয়েছে, তারা এখন তেহরান থেকে স্পষ্ট কোনো নির্দেশের অপেক্ষায় আছে।

কাতার, ওমান ও সৌদি আরবের মতো প্রতিবেশীরা এই ভয়ে আছে যে, ইরান যদি গৃহযুদ্ধে জড়ায় বা তার নিয়ন্ত্রণ হারায়, তবে এই অঞ্চলের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।

অন্যদিকে, ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আলবুসাইদির মতো কূটনীতিকরা এখনও পর্দার আড়ালে উত্তেজনা প্রশমনের চেষ্টা করছেন।

তবে ইরানের পাল্টা হামলায় উপসাগরীয় দেশগুলোর অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় আঞ্চলিক দেশগুলোর অবস্থান এখন দোলাচলে। তারা একদিকে ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র, অন্যদিকে তারা জানে যে ইরানের ক্ষোভের সরাসরি লক্ষ্যবস্তু হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেশি।

মুদ্রাস্ফীতি, জনরোষ ও অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার ঝুঁকি

যুদ্ধের খরচে এবং অবরোধের মুখে ইরানের অর্থনীতি আগে থেকেই ভঙ্গুর ছিল। খামেনির মৃত্যুর পর রিয়ালের মান দ্রুত পড়ে যাওয়া এবং গ্যাসের দাম বৃদ্ধি জনমনে তীব্র অসন্তোষ তৈরি করেছে।

যদিও খামেনির মৃত্যুতে অনেক সাধারণ ইরানিকে উদযাপন করতে দেখা গেছে, কিন্তু বাস্তবতা হলো বিরোধী পক্ষ এখনও অসংগঠিত।

ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানি জনগণকে রাজপথে নেমে আসার আহ্বান জানালেও নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর নজরদারির কারণে বড় কোনো গণঅভ্যুত্থান এখনও দৃশ্যমান নয়।

তবে যুদ্ধের দীর্ঘসূত্রতা যদি মানুষের জীবনযাত্রাকে অসহনীয় করে তোলে, তবে নেতৃত্বের এই সংকটের মাঝেই দেশটিতে অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহের আগুন জ্বলতে পারে।

মোহসেনি-এজেইর মতো কট্টরপন্থীরা এই সম্ভাবনা মাথায় রেখে আগেই কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে রেখেছেন। অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এখন অন্তর্বর্তী কাউন্সিলের প্রধান মাথাব্যথার কারণ।

যে সন্ধানে মধ্যপ্রাচ্যের ‘সিংহাসন’ 

ইরান এখন তার অস্তিত্ব রক্ষার এক ঐতিহাসিক চৌরাস্তায় দাঁড়িয়ে। বিশ্বও এখন তাকিয়ে আছে তেহরানের সেই রুদ্ধদ্বার কক্ষগুলোর দিকে, যেখানে নির্ধারিত হবে পরবর্তী ‘সর্বোচ্চ নেতা’র নাম এবং ইরানের আগামী কয়েক দশকের ভবিষ্যৎ।

খামেনি-পরবর্তী যুগে দেশটি কি আরও কট্টরপন্থার দিকে ঝুঁকবে, না কি সামরিক বাহিনীর অধীনে একটি নতুন রূপ ধারণ করবে, তা আগামী কয়েক সপ্তাহের ঘটনাপ্রবাহই বলে দেবে।

উত্তরাধিকারের এই দৌড়টি কেবল একজন নতুন ধর্মীয় নেতার নির্বাচন নয়, বরং এটি ইরানের ইসলামিক বিপ্লবের ৪৬ বছরের আদর্শিক যুদ্ধের একটি পরীক্ষা।

যদি অ্যাসেম্বলি অফ এক্সপার্টস ও আইআরজিসি দ্রুত কোনো ঐকমত্যে পৌঁছাতে না পারে, তবে দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধ বা সামরিক শাসনের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

বর্তমানের এই রক্তাক্ত অধ্যায়টি হয়তো ইরানে এক নতুন শাসনব্যবস্থার জন্ম দেবে, যা মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা কাঠামোকে চিরতরে বদলে দেবে।

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *