■ নাগরিক প্রতিবেদক ■
২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনে রাজপথে গুলিবিদ্ধ হওয়া টঙ্গীর ছাত্রদল নেতা মুহাম্মদ বাবলু ইন্তেকাল করেছেন। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রজিউন। দীর্ঘদিন খাদ্যনালীতে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি। শনিবার (৭ মার্চ) মাত্র ২১ বছর বয়সে মরণব্যাধি ক্যান্সারের বিরুদ্ধে দীর্ঘ লড়াই চালিয়ে যাওয়া বাবলু শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর কাছে হার মানলেন।
বাবলু শুধু একজন শিক্ষার্থীই ছিলেন না, ছিলেন একটি প্রজন্মের কণ্ঠস্বর। আওয়ামী স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে তিনি দীর্ঘদিন রাজপথে সক্রিয় ছিলেন। ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই ঢাকার উত্তরা বিএনএস সেন্টার এলাকায় সংঘটিত আন্দোলনের সময় পুলিশের গুলিতে তিনি আহত হন। সেই ঘটনার পর তার বুকে একটি ছররা গুলি রয়ে যায়।
জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে বাবলু বলেছিলেন, ‘আমি বাঁচতে চাই। পৃথিবীর আলো-বাতাসে নিশ্বাস নিতে চাই। আবার রাজপথে দাঁড়াতে চাই মানুষের অধিকারের জন্য।’
আক্ষেপ করে বাবলু বলেছিলেন, ‘আমি টঙ্গীর ৫৪ নম্বর ওয়ার্ড ছাত্রদলের দপ্তর সম্পাদক। আমার যৌবনের সব ভালোবাসা যে সংগঠনের জন্য উজাড় করে দিয়েছি সে সংগঠন থেকে আমি উল্লেখযোগ্য সহযোগিতা পাইনি। শুধু টঙ্গী পশ্চিম থানা বিএনপির এক নেতা ১০ হাজার টাকা আর মহানগর ছাত্রদলের এক নেতা ৫ হাজার টাকা দিয়েছেন। অথচ আমার চিকিৎসার জন্য অনেক টাকা প্রয়োজন।’
ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার ওসমানগঞ্জ ইউনিয়নের আবুল কাশেমের ছেলে মরহুম বাবলু গাজীপুরের টঙ্গী বেপারীবাড়ি এলাকায় বড় ভাইয়ের সঙ্গে থাকতেন। টঙ্গী সিটি কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন তিনি। বাবলু ছাত্রদলের টঙ্গী ৫৪ নম্বর ওয়ার্ড শাখার দপ্তর সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।
প্রায় দুই মাস আগে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে চিকিৎসকের কাছে গেলে তার খাদ্যনালীতে ক্যান্সার ধরা পড়ে। চিকিৎসা পরিভাষায় এই রোগটির নাম ‘গ্যাস্ট্রো-এসোফেজিয়াল অ্যাডেনোকার্সিনোমা গ্রেড-৩’ (Gastro-esophageal Adenocarcinoma Grade-III)। এরপর রাজধানীর ধানমন্ডির নিউ লাইফ হাসপাতালে তার চিকিৎসা শুরু হয়।
চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী বাবলুকে মোট আটটি কেমোথেরাপি নিতে হতো। এর মধ্যে তিনটি থেরাপি সম্পন্ন হয়েছিল। প্রতিটি কেমোথেরাপির পেছনে ব্যয় হচ্ছিল প্রায় ৪০ হাজার টাকার বেশি। চিকিৎসকদের মতে, কেমোথেরাপির পর তাকে জটিল অস্ত্রোপচার করাতে হবে, যার জন্য প্রয়োজন কয়েক লাখ টাকা।
চিকিৎসার খরচ নিয়ে জীবিত অবস্থায় বাবলু জানিয়েছিলেন, এখন পর্যন্ত তার চিকিৎসায় প্রায় তিন লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। তখনও তার পাঁচটি কেমোথেরাপি বাকি ছিল। তিনি বলেছিলেন, ‘অপারেশন তো দূরের কথা, পরের থেরাপিগুলোর খরচই জোগাড় করতে পারছি না। যেই দলের জন্য এত পরিশ্রম করেছি আমার বিপদে সেই দলকে পাইনি।’
বাবলুর বাবা আবুল কাশেম নিজ এলাকায় ব্যবসা করেন। ছেলের চিকিৎসার জন্য পরিবারের যা কিছু সঞ্চয় ছিল, তা ইতোমধ্যে ব্যয় হয়ে যায়। ফলে পরিবারটি চরম অর্থসংকটে পড়েছে।
টঙ্গী সরকারি কলেজের সদস্যসচিব আলাউদ্দিন সুমন বলেন, ‘অনেক দলীয় নেতারা সহায়তার আশ্বাস দিলেও উল্লেখযোগ্য কোনো সহায়তা আসেনি। দুঃখজনক হলেও সত্য বাবলু এত বড় একটা দলের কর্মী অথচ দুই থেকে তিন লাখ টাকার জন্য বাবলুর জীবন থমকে গেল। প্রতিনিয়ত মৃত্যুর দিকে এগিয়ে বাবলু চিকিৎসার অভাবে এগিয়ে গিয়েছিল।’
পরিবার ও সহপাঠীরা জানিয়েছেন, সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ ও শুভানুধ্যায়ীদের কাছে সহায়তার আবেদন জানানো হলেও বড় কোনো সহযোগিতা মেলেনি। বাবলুর পরিবারের পক্ষ থেকে সমাজের সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের প্রতি সহযোগিতার আহ্বান জানানো হয়েছিল।
