ইরানে ভয়াবহ হামলার হুমকি ট্রাম্পের

নাগরিক নিউজ ডেস্ক

ইরানের ওপর চলমান বিমান হামলাকে আরও ভয়াবহ পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। শনিবার নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে তিনি এই হুমকি দেন। তবে এর বিপরীতে ইরানি প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, ইরান কখনোই শত্রুর কাছে আত্মসমর্পণ করবে না।

ট্রাম্প তাঁর পোস্টে লিখেছেন, ‘আজ রাতে ইরানে ভয়াবহ হামলা চালানো হবে!’ তিনি আরও বলেন, ‘ইরানের খারাপ আচরণের কারণে এমন কিছু এলাকা এবং জনসমষ্টিকে সম্পূর্ণ ধ্বংস ও নিশ্চিত মৃত্যুর জন্য বিবেচনা করা হচ্ছে, যা এর আগে লক্ষ্যবস্তু হিসেবে ভাবা হয়নি।’

এর আগে শুক্রবার ট্রাম্প ইরানের ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ’-এর দাবি তুলেছিলেন। এর জবাবে ইরানের প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান আজ রাষ্ট্রীয় টিভিতে সম্প্রচারিত ভাষণে বলেন, ‘যারা ভাবে ইরানি জনগণের নিঃশর্তভাবে আত্মসমর্পণ করবে, তাদের সেই আশা নিয়ে কবরে যেতে হবে।’

এ সময় তিনি প্রতিবেশী দেশগুলোর কাছে ক্ষমা চেয়ে বলেছেন, ‘প্রতিবেশী দেশগুলো, যারা আমাদের হামলার শিকার হয়েছে, তাদের কাছে আমি ক্ষমা চাওয়া প্রয়োজন বলে মনে করি। আমাদের কোনো প্রতিবেশী দেশ দখলের বিন্দুমাত্র অভিপ্রায় নেই।’

এদিকে আজ শনিবার ভোরে তেহরানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মেহরাবাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ও ধোঁয়া দেখা গেছে। বার্তা সংস্থা এএফপির ছবিতে বিমানবন্দরের ভেতর দাউ দাউ করে আগুন জ্বলতে দেখা গেছে। গত শনিবার থেকে শুরু হওয়া এই অভিযানে আজ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় হামলাগুলো চালিয়েছে ইসরায়েল। তাদের দাবি—একটি সামরিক একাডেমি, একটি আন্ডারগ্রাউন্ড কমান্ড সেন্টার এবং একটি ক্ষেপণাস্ত্রের ভান্ডারে আঘাত হানা হয়েছে।

সাত দিন ধরে টানা বিমান হামলার শিকার হলেও ইরান এখনো পাল্টা আক্রমণের সক্ষমতা ধরে রেখেছে। আজ দুবাই, মানামা এবং রিয়াদের কাছে বিমান হামলার সাইরেন ও বিস্ফোরণ শোনা গেছে। সৌদি আরব রিয়াদের কাছে একটি মার্কিন সেনা ঘাঁটিকে লক্ষ্য করে ছোড়া ব্যালিস্টিক মিসাইল ধ্বংস করার দাবি করেছে।

সংযুক্ত আরব আমিরাত জানিয়েছে, তারা ১৫টি মিসাইল ও ১১৯টি ড্রোন প্রতিহত করেছে। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভিডিওতে দেখা গেছে, বিশ্বের ব্যস্ততম দুবাই বিমানবন্দরে একটি প্রজেক্টাইল আঘাত হেনেছে। বিমানবন্দরের ভবন ও পার্ক করা বিমানের পাশে ট্রেনের কাছ দিয়ে যাওয়ার সময় একটি বিস্ফোরণের দৃশ্য এএফপি যাচাই করেছে। এ ছাড়া জর্ডানও দাবি করেছে, গত এক সপ্তাহে ইরান তাদের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা লক্ষ্য করে ১১৯টি মিসাইল ও ড্রোন ছুড়েছে।

ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডস জানিয়েছে, তারা উপসাগরীয় অঞ্চলে ‘প্রাইমা’ নামক একটি তেল ট্যাংকারে হামলা চালিয়েছে। জাহাজটি হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করার চেষ্টা করছিল। বর্তমানে ইরান এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথটি কার্যত বন্ধ করে রেখেছে।

যুদ্ধের দ্বিতীয় সপ্তাহে এসে মানবিক সংকটও চরম আকার ধারণ করেছে। ইরানি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, গত শুক্রবার পর্যন্ত ৯২৬ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত এবং প্রায় ৬ হাজার মানুষ আহত হয়েছেন। তবে ইরানিয়ান রেড ক্রিসেন্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত শনিবার থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি হামলায় এখন পর্যন্ত ইরানে কমপক্ষে ১ হাজার ৩৩২ জন নিহত হয়েছেন।

লেবাননেও ইসরায়েলি হামলা তীব্র হয়েছে। বৈরুতের ঘনবসতিপূর্ণ দক্ষিণ শহরতলী খালি করার নির্দেশ দিয়ে সেখানে অনবরত বোমাবর্ষণ করা হচ্ছে। ইসরায়েলি প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ লেবাননের প্রেসিডেন্টকে সতর্ক করে বলেছেন, হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্রীকরণ না করলে দেশটিকে ‘চরম মূল্য’ দিতে হবে। লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মতে, গত এক সপ্তাহে সেখানে ২১৭ জন নিহত হয়েছেন।

এই যুদ্ধের প্রভাব কেবল মধ্যপ্রাচ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বিশ্ব শেয়ার বাজারে ধস নেমেছে এবং অপরিশোধিত তেলের দাম আকাশচুম্বী হয়েছে। বিশ্লেষকেরা সতর্ক করেছেন, এই যুদ্ধের সমাপ্তির কোনো সহজ পথ নেই। মার্কিন ও ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের মতে, এই যুদ্ধ এক মাস বা তার বেশি সময় স্থায়ী হতে পারে।

প্রতিবেশী দেশে হামলা বন্ধের ঘোষণা দিল ইরান

সম্প্রতি কাতারে একটি বড় ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা প্রতিহত করার ঘটনার পর ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের একটি রেকর্ডকৃত ভিডিও বার্তা নতুন করে বিশ্বজুড়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ওই বার্তায় প্রেসিডেন্ট আশ্বস্ত করেছেন, প্রতিবেশী দেশগুলোর মাটি ব্যবহার করে ইরানের ওপর হামলা না চালানো হলে ইরানও তাদের লক্ষ্যবস্তু করবে না। তবে বাস্তব পরিস্থিতি এবং বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের কৌশলগত ও নিরাপত্তা-সংক্রান্ত বিষয়ে প্রেসিডেন্টের হাতে আদতে কোনো কার্যকর ক্ষমতা থাকে না।

ইরানি সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত ওই ভিডিওতে পেজেশকিয়ান প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার ইঙ্গিত দিলেও মাঠপর্যায়ের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। যখন তিনি এই শান্তির বার্তা দিচ্ছিলেন, ঠিক তখনই কাতার তাদের আকাশসীমায় (হামাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও আল-উদেইদ বিমান ঘাঁটি লক্ষ্য করে) আসা অন্তত ১০টি ড্রোন ও দুটি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র হামলার চেষ্টা প্রতিহত করার দাবি করে।

ইরানি রাজনীতি বিশ্লেষক রসুল সরদারের মতে, ইরানে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরা মূলত দৈনন্দিন রাষ্ট্রীয় কাজ এবং ‘অকৌশলগত’ বিষয়গুলো পরিচালনা করেন। সংবিধান অনুযায়ী প্রেসিডেন্ট পদমর্যাদায় দ্বিতীয় ব্যক্তি হলেও জাতীয় নিরাপত্তা এবং পররাষ্ট্রনীতির মতো ‘কৌশলগত’ বিষয়ে তাঁর সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা নেই বললে চলে।

ইরানের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর পর। বর্তমানে দেশটির সংবিধানে উল্লেখিত ‘অন্তর্বর্তীকালীন নেতৃত্ব কাউন্সিল’ রাষ্ট্র পরিচালনা করছে, যার সদস্য হিসেবে প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান থাকলেও ক্ষমতার প্রকৃত চাবিকাঠি এখন সামরিক বাহিনীর হাতে।

বিশেষ করে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) এখন সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে তাদের অপারেশন পরিচালনা করছে। বিশ্লেষকদের মতে, এখন দেশ যখন একটি ‘অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই’-এর মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তখন আইআরজিসির কমান্ডই চূড়ান্ত। তারা প্রতিবেশী দেশগুলোতে হামলা করবে কি করবে না, তা সম্পূর্ণভাবে তাদের সদর দপ্তর থেকে নির্ধারিত হচ্ছে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা বিশেষভাবে আইআরজিসির নতুন প্রধান আহমদ ওয়াহিদির কথা উল্লেখ করেছেন। ১ মার্চ তাঁকে এই বাহিনীর প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। ওয়াহিদি আইআরজিসির ইতিহাসে অন্যতম ‘কট্টরপন্থী বা র‍্যাডিক্যাল কমান্ডার’ হিসেবে পরিচিত এবং তিনি কুদস ফোর্সেরও প্রতিষ্ঠাতা কমান্ডার ছিলেন।

ওয়াহিদির মতো একজন কট্টরপন্থী এবং ছায়াযুদ্ধের কারিগর যখন সরাসরি কমান্ডে থাকেন, তখন পেজেশকিয়ানের মতো নরমপন্থী রাজনীতিবিদদের পক্ষে দেশের নিরাপত্তা বা সামরিক নীতিতে সামান্যতম প্রভাব বিস্তার করাও কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়ার কথা।

ইরানের এই ‘ফায়ার অ্যাট উইল’ বা স্বাধীনভাবে হামলা চালানোর ক্ষমতার কারণে কাতার ছাড়াও বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং সৌদি আরবেও ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার খবর পাওয়া গেছে। যদিও পেজেশকিয়ান প্রতিবেশী দেশগুলোর কাছে ব্যক্তিগতভাবে ক্ষমা চেয়েছেন এবং বলেছেন যে সশস্ত্র বাহিনীকে আর হামলা না করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে হামলাগুলো প্রমাণ করছে, সেই নির্দেশনার তোয়াক্কা সেনাপ্রধানেরা সম্ভবত করছেন না।

ইরানের প্রেসিডেন্টের সাম্প্রতিক বক্তব্য একটি আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক স্টান্ট বা শান্তিকামী ভাবমূর্তি ধরে রাখার চেষ্টা হিসেবেও দেখা যেতে পারে। তবে তেহরানের পরবর্তী সামরিক পদক্ষেপগুলো নির্ধারিত হবে মূলত আইআরজিসির সদর দপ্তর থেকে, প্রেসিডেন্টের দপ্তর থেকে নয়। আঞ্চলিক উত্তেজনার এই চূড়ান্ত মুহূর্তে পেজেশকিয়ানের আশ্বাসের চেয়ে আইআরজিসির ক্ষেপণাস্ত্রের গতিপথই আসল বাস্তবতা নির্ধারণ করবে।

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *