১ হাজার কেজির মিসাইল ছুড়ছে ইরান

নাগরিক প্রতিবেদক

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধের ১১তম দিনে রণকৌশলে বড় ধরনের পরিবর্তনের ঘোষণা দিয়েছে তেহরান। রোববার ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) অ্যারোস্পেস ফোর্সের কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাজিদ মুসাভি জানিয়েছেন, এখন থেকে ইরান শুধু সেসব মিসাইল ব্যবহার করবে, যেগুলোর পেলোড বা গোলাবারুদ বহন ক্ষমতা ১ হাজার কেজি বা তার বেশি।

এই ঘোষণা যুদ্ধের ময়দানে সংখ্যা কমানোর পরিবর্তে ‘বিধ্বংসী ক্ষমতা’ বাড়ানোর কৌশল হিসেবে দেখছেন সামরিক পর্যবেক্ষকরা।

যুদ্ধের শুরুতে ইরানের কৌশল ছিল শাহেদ-১৩৬ ড্রোনের মতো সাশ্রয়ী প্রযুক্তি ব্যবহার করে শত্রুশিবিরের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে ব্যস্ত রাখা। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল ‘স্যাচুরেশন অ্যাটাক’ বা একসঙ্গে প্রচুর ড্রোন ও মিসাইল ছুড়ে ইসরায়েল ও আমেরিকার দামি ইন্টারসেপ্টর মিসাইল খরচ করিয়ে ফেলা। তবে এখন ইরান সরাসরি খোররামশাহর-৪ বা খাইবারের মতো ভারী ব্যালিস্টিক মিসাইলের ওপর জোর দিচ্ছে, যা ড্রোনের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি ধ্বংসযজ্ঞ চালাতে সক্ষম।

জেনারেল মুসাভি জানান, এই মিসাইলগুলো ম্যাক-৮-এর বেশি গতিতে চলতে পারে এবং এর গতিপথ পরিবর্তনের সক্ষমতা রয়েছে, যা ইসরায়েলের ‘অ্যারো-৩’-এর মতো উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে ফাঁকি দিতে পারবে। একটি এক টনের মিসাইল যদি লক্ষ্যভেদে সফল হয়, তবে তা একটি বিমানঘাঁটি বা ভূগর্ভস্থ কমান্ড সেন্টার অচল করে দেওয়ার মতো সক্ষমতা রাখে।

লেবানিজ সংবাদমাধ্যম ‘আল মায়াদিন’-এর বরাতে জানা গেছে, দুবাই বিমানবন্দর এবং সৌদি আরবের রাস তানুরাজ তৈল শোধনাগারের মতো আঞ্চলিক অবকাঠামো এখন ইরানের প্রধান লক্ষ্যবস্তুর তালিকায় রয়েছে।

বর্তমানে ইরানের অস্ত্রাগারে ১ হাজার ৮০০ কেজি বিস্ফোরক বহনে সক্ষম খোররামশাহর মিসাইল রয়েছে, যা ২ হাজার কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে। এছাড়া সলিড ফুয়েলচালিত মাঝারি পাল্লার সেজিল মিসাইল এবং ৩ হাজার কিলোমিটার পাল্লার সুমার ক্রুজ মিসাইলও ইরানের হাতে রয়েছে। সুমার মিসাইল পারমাণবিক অস্ত্র বহনেও সক্ষম বলে ধারণা করা হয়।

প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক শানাকা আনসেলম পেরেরার মতে, ইরান এখন যুদ্ধের ‘ইন্টারসেপ্ট ম্যাথ’ বা গাণিতিক সমীকরণ বদলে দিচ্ছে। আগে একটি ড্রোন ধ্বংস করতে ৪ মিলিয়ন ডলারের প্যাট্রিয়েট মিসাইল ব্যয় করাটা ছিল অর্থনৈতিক চাপ, কিন্তু এখন ভারী মিসাইল ঠেকাতে ইন্টারসেপ্টর মিসাইল মিস হলে তার পরিণতি হবে ভয়াবহ।

এতে আকাশ প্রতিরক্ষাকারীদের দ্রুত ইন্টারসেপ্টর মজুত শূন্য হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। আমেরিকার ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’র জবাবে তেহরানের এই ‘হেভি পেলোড’ নীতি মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের তীব্রতা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

মাটির নিচে এখনো অক্ষত ইরানের ইউরেনিয়ামের বড় মজুত—ধারণা আইএইএ প্রধানের

ইরানের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের বড় একটি অংশ এখনো ইসফাহানের ভূগর্ভস্থ টানেল কমপ্লেক্সে অক্ষত থাকতে পারে বলে জানিয়েছেন জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থা (আইএইএ)-এর মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রোসি।

তিনি বলেন, ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর ওপর গত বছরের জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পরও ইসফাহানের ওই টানেল কমপ্লেক্সটি বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েনি। সেখানে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ করা ইউরেনিয়ামের উল্লেখযোগ্য অংশ সংরক্ষিত ছিল এবং সেটি এখনো সেখানেই থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

আইএইএ-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুনে ইসরায়েল প্রথমবার হামলা চালানোর সময় ইরানের বিভিন্ন পারমাণবিক স্থাপনায় মোট প্রায় ৪৪০.৯ কেজি ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ছিল। এর প্রায় অর্ধেকই ইসফাহানে সংরক্ষিত ছিল বলে ধারণা করা হয়। আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থার সর্বশেষ পরিদর্শনের সময়ও সেখানে ২০০ কেজির বেশি এই ধরনের ইউরেনিয়াম ছিল বলে জানিয়েছেন গ্রোসি।

এ ছাড়া প্রথমবার হামলার ঠিক আগে ইরানের কোম শহরের কাছে একটি পাহাড়ের ভেতরে নির্মিত ফোরদো পারমাণবিক স্থাপনা থেকেও সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের একটি বড় বহর সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল বলে মনে করে আইএইএ। উপগ্রহ চিত্রে দেখা গিয়েছিল, একটি কনভয় সেখান থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ উপাদান সরিয়ে নিচ্ছে। তবে ঠিক কোথায় তা নেওয়া হয়েছে, সেই বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য নেই। আরও ধারণা করা হচ্ছে, কিছু উপাদান এখনো নাতাঞ্জ পারমাণবিক কেন্দ্রেও থাকতে পারে।

গ্রোসি বলেন, এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী ইসফাহান থেকে ইউরেনিয়াম সরিয়ে নেওয়ার কোনো স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি। উপগ্রহ চিত্রসহ বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ পদ্ধতিতে নজরদারি করা হলেও সেখানে উল্লেখযোগ্য কোনো স্থানান্তরের ইঙ্গিত দেখা যায়নি।

তবে গত বছরের হামলার পর থেকে ইরান তাদের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের অবস্থা বা অবস্থান সম্পর্কে আইএইএকে কোনো তথ্য দেয়নি। একই সঙ্গে জাতিসংঘের পারমাণবিক পরিদর্শকদেরও ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাগুলোতে পুনরায় প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়নি।

ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে ঘিরেই ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র তাদের সাম্প্রতিক হামলার যৌক্তিকতা তুলে ধরেছে। তাদের দাবি, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতার খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। তবে আইএইএ বলেছে, সমন্বিত কোনো পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচির নির্ভরযোগ্য প্রমাণ তারা পায়নি।

গ্রোসি মনে করেন, এই সংকটের একমাত্র সমাধান কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে সম্ভব। ফরাসি গণমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, দুই দশকের বেশি সময় ধরে চলা এই বিরোধের স্থায়ী সমাধান পেতে আলোচনার টেবিলে ফিরতেই হবে।

তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, চলমান সংঘাতের কারণে ইরানের কিছু মহলে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে ভাবনা তৈরি হতে পারে। এমন পরিস্থিতি এড়াতে দ্রুত কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়া জরুরি বলেও মন্তব্য করেন আইএইএ প্রধান।

তেলে পশ্চিমাদের কাবু করতে চাইছে ইরান

মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার পর জ্বালানি তেলের দাম অস্থির হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে ইউরোপে তেলের দাম অনেকটাই বেড়ে গিয়েছিল। যুদ্ধ শিগগির শেষ হবে, ট্রাম্পের সোমবারের এই কথার পরদিনই আবার দাম অনেকটা পড়ে যায়। কিন্তু ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের দোদুল্যমানতা এবং অব্যাহত যুদ্ধের কারণে হুট করেই তেলের বাজার ঠান্ডা হওয়ার কারণ নেই।

বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, ইরানের হুমকির কারণে হরমুজ প্রণালি আরও কিছুদিন বন্ধ থাকলে দাম আরও বাড়তে পারে। ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার জবাব দেওয়ার পাশাপাশি তেলকেও অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের পথে হাঁটছে ইরান। মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে মার্কিন সামরিক স্থাপনার পাশাপাশি দেশগুলোর তেলসংক্রান্ত স্থাপনায় হামলা করে যাচ্ছে তারা। কিছু ক্ষেত্রে অবশ্য তেলের স্থাপনায় হামলা না করার দাবিও করেছে ইরান।

যুদ্ধ শুরুর পরপরই তেলের দাম আন্তর্জাতিক বাজারে বাড়তে শুরু করে। গত সোমবার অপরিশোধিত তেলের দাম (ব্রেন্ট ক্রুড) ১১৯ ডলারে পৌঁছায়। এরপর ধনী দেশগুলোর জোট জি৭ তেলের বাজার স্থিতিশীল রাখতে পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণা দেওয়ার পর গতকাল মঙ্গলবার ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৮৫ ডলারে নেমে এসেছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই দাম স্থিতিশীল হবে না, যদি হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহন স্বাভাবিক না হয় এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো পুরোদমে তেল উৎপাদন শুরু না করে।

এ ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে চলমান পাল্টাপাল্টি হামলা। প্রথমে এই হামলা মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয় থাকা মার্কিন ঘাঁটি এবং কিছু বেসামরিক স্থাপনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও পরে বিভিন্ন দেশে তেলের স্থাপনায় হামলা চালায় ইরান। ২ মার্চ সৌদি আরবের রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানি সৌদি আরামকোর বৃহত্তম তেল শোধনাগার রাস তানুরায় ড্রোন হামলা চালায় ইরান। সেদিনই হামলার শিকার হয় তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) বিশ্বের বৃহত্তম রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান কাতারের রাস লাফান। গত সোমবার গভীর রাতে বাহরাইনের সিত্রা দ্বীপে ইরানি ড্রোনের হামলা হয়। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় বাপকো এনার্জিসের তেল শোধনাগার কেন্দ্র আল মামির। ওই দিন হামলা প্রতিহত করার খবর জানিয়েছে সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়। তারা জানায়, দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় তেলক্ষেত্র শায়বাহের দিকে ধেয়ে আসা চারটি ড্রোন ধ্বংস করা হয়েছে।

এসব হামলার পর থেকে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে তেল-গ্যাসের উৎপাদন ব্যাপকভাবে কমে আসছে। যেমন সৌদির রাস তানুরায় হামলার পর কার্যক্রম স্থগিত করা হয়। ওই কেন্দ্রে দৈনিক সাড়ে পাঁচ লাখ ব্যারেল তেল উৎপাদনের ক্ষমতা রয়েছে। উৎপাদন বন্ধ করেছে কাতার এনার্জিও।

হামলা হয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরাহ ও মুসাফ্ফাহ তেল টার্মিনালেও। সেখানে ইরানি ড্রোনের আঘাতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এ ছাড়া ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আশঙ্কায় ইসরায়েলের সমুদ্রবর্তী গ্যাসক্ষেত্র লেভিয়াথান ও তামার সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে।

গত সপ্তাহে ইরানি ড্রোনের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ওমানের দুকম ও সালালাহ বন্দর। এতে একটি জ্বালানি সংরক্ষণ ট্যাংক ও একটি ট্যাংকার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। হামলা হয়েছে অ্যাথে নোভাসহ কয়েকটি তেলবাহী জাহাজে। এ ছাড়া ওমানের উপকূলে হামলার জেরে এবং ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের হুমকির জেরে হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহন বন্ধ হয়ে যায়। এর পর থেকেই চড়তে থাকে তেলের দাম।

এ নিয়ে ডয়চে ভেলের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, ইরানের তেল হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হয়। ইরানের হুমকির কারণে এই পথে তেল পরিবহন বন্ধ হয়ে গেছে। এ প্রসঙ্গে নরওয়ের অসলোভিত্তিক জ্বালানি গবেষণা প্রতিষ্ঠান রিস্ট্যাড এনার্জির সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট জর্জ লেওন বলেন, ‘জোর করে প্রণালি বন্ধ করা হোক বা ঝুঁকি এড়িয়ে যাওয়ার কারণে এই পথে তেলের ট্রাংকারের যাত্রা বন্ধ হোক—এসবের প্রভাব মূলত একই রকম। যদি দ্রুত উত্তেজনা হ্রাসের সংকেত না আসে, তাহলে আমরা সপ্তাহের শুরুতে তেলের মূল্য উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধির আশঙ্কা করছি।’

এ নিয়ে বুলগেরিয়াভিত্তিক গণমাধ্যম মডার্ন ডিপ্লোমেসির এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, হরমুজ বন্ধের ঘোষণা দিয়ে ইরান আসলে হুমকি দিয়েছে, তারা আসলে বিশ্বজুড়ে বিদ্যমান জ্বালানিব্যবস্থা ধ্বংস করে দিতে চায়। এর মধ্যে দিয়ে পশ্চিমা এবং জ্বালানি আমদানিকারী দেশগুলো এবং তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করতে চায়। এর মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সামনে একটি চ্যালেঞ্জ হাজির হয়েছে। সেটি হলো, তাদের সামরিক অভিযান চালানোর পাশাপাশি বিশ্ব যাতে জ্বালানির সংকটে না পড়ে, সেই দিকে নজর দিতে হচ্ছে।

হামলা জোরদারের হুমকি

যুদ্ধের নবম দিনে ইরানের ৫টি তেলের স্থাপনা হামলার শিকার হয়। এরপর আরব দেশগুলোয় এমন হামলা চালানোর ইঙ্গিত দিয়েছে ইরান। দ্য গার্ডিয়ানের খবরে বলা হয়েছে, তেহরানের আশপাশে তাদের তেলের স্থাপনায় হামলার জেরে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে তেলের স্থাপনায় হামলার হুমকি দিয়েছে ইরান। আইআরজিসির এক মুখপাত্র বলেন, ‘আপনারা যদি প্রতি ব্যারেল তেল ২০০ ডলারের ওপর কিনতে চান, তবে এই খেলা চালিয়ে যান।’ ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, তেহরানে যা হয়েছে, এই অঞ্চলজুড়ে একই ধরনের ঘটনা ঘটবে।

তেলের স্থাপনায় হামলা নিয়ে গতকাল আরও কঠোর বার্তা দিয়েছে ইরান। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা অব্যাহত থাকলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে ‘এক লিটার তেলও’ রপ্তানি হবে না বলে হুমকি দিয়েছে আইআরজিসি। এক বিবৃতিতে তারা বলেছে, মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর হাতে। মার্কিন বাহিনী এ যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটাতে পারবে না।

এর জবাবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পাল্টা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল সরবরাহ বন্ধ করলে ইরানকে আগের চেয়ে অনেক গুণ শক্তিশালী হামলার মুখে পড়তে হবে।

ট্রাম্প এর আগে যুদ্ধ ‘শিগগির’ শেষ হবে বলে মন্তব্য করেছিলেন। জবাবে আইআরজিসি বলেছে, তারাই ‘যুদ্ধের সমাপ্তি নির্ধারণ’ করবে।

তেল নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের গণমাধ্যম সিএনবিসির এক বিশ্লেষণ বলা হয়েছে, এই যে সংকট আরও বাড়তে পারে। তেলে দাম ব্যারেল প্রতি ২০০ ডলারে ঠেকতে পারে, যদি না যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানে আলোচনার টেবিলে ফিরে না আসে। এ প্রসঙ্গে লন্ডনের গবেষণা প্রতিষ্ঠান জন হল অ্যাসোসিয়েটসের জ্বালানি বিশ্লেষক জন হল বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনার কারণে তেলের বাজার ইতিমধ্যেই উত্তাল। যদি ইরানের মতো ওপেকের কোনো দেশ যেকোনো কারণে আক্রান্ত হয়, তাহলে বাজার অস্থির হয়ে উঠবে। তেলের দাম যেকোনো জায়গায় যেতে পারে।

মার্কিন হামলা জোরদার

এদিকে ইরানের তেহরানসহ সারা দেশে হামলা আরও জোরদার করার ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ। গতকাল সকালে তিনি হুমকি দিয়ে বলেন, মঙ্গলবার হবে ইরানে ‘সবচেয়ে তীব্র হামলার দিন’।

হেগসেথের এই ঘোষণার আগে ব্রিটেনের ঘাঁটিতে বি-৫২সহ কয়েকটি বড় বোমারু বিমান নিয়ে গেছে যুক্তরাষ্ট্র। এ ছাড়া গতকাল হামলা জোরদার করেছে মার্কিন বাহিনী। তাদের লক্ষ্যবস্তুর তালিকায় ছিল ইরানের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কেন্দ্র, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন তৈরির কারখানা এবং সামরিক যোগাযোগ অবকাঠামো। গতকালও রাজধানী তেহরানসহ বিভিন্ন শহরে মার্কিন–ইসরায়েলি যৌথ হামলা চলেছে। হামলায় কেঁপে উঠেছে ইসফাহান, তাবরিজ ও আহভাজসহ দেশটির বিভিন্ন শহর।

তেহরানে একটি হামলায় ৪০ জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এ পর্যন্ত ইরানে ১ হাজার ৩০০ জনের বেশি নিহত হয়েছে। ইসরায়েল হামলা জোরদার করেছে লেবাননেও। সেখানে তাদের সামরিক অভিযানে গতকাল পর্যন্ত ৫০০ নিহত হয়েছে বলে জানা গেছে।

আইআরজিসির ক্ষেপণাস্ত্র হামলা

আল জাজিরার খবরে বলা হয়, আইআরজিসির বিবৃতিতে জানা গেছে, মার্কিন এবং ইসরায়েলি লক্ষ্যবস্তুতে ৩৪তম হামলা চালিয়েছে ইরানের এই বাহিনী। এসব হামলায় তিন ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র এবং হাইপারসনিক (শব্দের চেয়ে পাঁচ গুণ বেশি গতির) ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে। ইরানের এসব হামলায় সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবির কাছে আল-ধাফরা বিমানঘাঁটি এবং বাহরাইনের জুফায়ার বিমানঘাঁটিতে অবস্থিত মার্কিন সেনাদের নিশানা করা হয়। পাশাপাশি লক্ষ্যবস্তু করা হয় ইসরায়েলের রামাত ডেভিড বিমান ঘাঁটি এবং হাইফার বেসামরিক বিমানবন্দরকে।

আইআরজিসির বিবৃতিতে দাবি করা হয়, তেল আবিবের পূর্বাঞ্চলে ইসরায়েলের গোপন ক্ষেপণাস্ত্র লঞ্চারগুলোতে আঘাত হেনেছে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র। পাশাপাশি, বাহরাইনে মার্কিন সেনাসদস্য ছিল এমন একটি হোটেলে ড্রোন হামলার দাবি করেছে ইরান। হামলা হয়েছে ইরাকের কুর্দিস্তানে আমিরাতের কনস্যুলেটেও।

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *