ইরানের জয়-পরাজয়ে বিশ্বব্যবস্থা বদলে যেতে পারে

■ এ কে এম শোয়াইবুল ইসলাম ■ 

বহুল প্রচারিত একটি ভিডিওতে বর্তমান সময়ের আলোচিত চীনের অধ্যাপক জিয়াং এর আলোচনার মূল বিষয়বস্তু ছিল কীভাবে একটি যুদ্ধ কেবল সামরিক জয়-পরাজয় নয়, বরং একটি পুরো বিশ্বব্যবস্থাকে বদলে দিতে পারে। ভিডিওতে তাঁর আলোচনার সারমর্ম নিচে দেওয়া হল।

আমেরিকার ‘হিউব্রিস বা চরম অহংকার

​গত ২০ বছর ধরে ইরাক, লিবিয়া বা সিরিয়ায় অনায়াস জয় আমেরিকাকে মানসিকভাবে অন্ধ করে দিয়েছে। তারা মনে করেছিল ইরানকেও একইভাবে দুই সপ্তাহে গুঁড়িয়ে দেওয়া সম্ভব। কিন্তু ইরান কোনো সাধারণ দেশ নয়, বরং এটি একটি ‘পাহাড়ি দুর্গ’। ইরানের ভৌগোলিক অবস্থান এবং তাদের দীর্ঘদিনের সামরিক প্রস্তুতি আমেরিকার কৌশলকে ব্যর্থ করে দিচ্ছে।

ডলারের পনজি স্কিম ও অর্থনৈতিক ধস

​বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা টিকে আছে ‘পেট্রোডলার’-এর ওপর। অর্থাৎ, তেল কিনতে হলে ডলার লাগবেই। জিসিসি দেশগুলো তেল বিক্রি করে সেই ডলার আবার আমেরিকার শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ করে। আমেরিকার অর্থনীতি মূলত একটি ‘পনজি স্কিম’ বা কাগজের ঘরের মতো, যা টিকে আছে সারা বিশ্বে ডলারের আধিপত্যের ওপর।যদি রাশিয়া, চীন ও ইরান মিলে ইউরেশীয় ভূখণ্ডে একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক জোট ব্রিকস গড়ে তোলে, তবে ডলারের পতন অনিবার্য। এই ভয় থেকেই আমেরিকা যুদ্ধে জড়িয়েছে।

​ইরানের পাল্টা চাল

আমেরিকা যখন আকাশপথে বোমাবর্ষণ করে ইরানের স্থাপনা ধ্বংস করার চেষ্টা করছে, ইরান তখন এক ভিন্ন কৌশলে হাঁটছে। ইরান জানে আমেরিকার মূল শক্তি তাদের অর্থনীতি। ইরান তাদের সস্তা ড্রোন ব্যবহার করে আমেরিকার প্যাট্রিয়ট মিসাইল সিস্টেমকে অকেজো করে দিচ্ছে এবং দুবাই বা সৌদি আরবের মতো জিসিসি দেশগুলোর গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে আঘাত হানছে। ইরানের লক্ষ্য হলো এই দেশগুলোকে আমেরিকা থেকে বিচ্ছিন্ন করা। যদি হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যায়, তবে বিশ্বজুড়ে তেলের দাম ২০০ ডলারে পৌঁছাবে এবং বিশ্ব অর্থনীতি ধসে পড়বে।

​ফলাফল: যখন চীন, জাপান বা ইউরোপ দেখবে যে আমেরিকা আর তাদের নিরাপত্তা দিতে পারছে না, তখন তারা ডলার কেনা বন্ধ করে দেবে। এর ফলে আমেরিকায় ১৯৩০ সালের ‘গ্রেট ডিপ্রেশন’-এর চেয়েও ১০০ গুণ ভয়াবহ অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দেবে।

এসকাটোলজি বা শেষ সময়ের ধর্মতত্ত্ব

চীনের এই অধ্যাপকের তত্ত্ব মতে, ​এই যুদ্ধের পেছনে কিছু অদৃশ্য শক্তি বা ‘সিক্রেট সোসাইটি’ কাজ করছে যারা চায় পৃথিবী ধ্বংসের দিকে যাক।

​হুদি কট্টরপন্থা: তারা বিশ্বাস করে যুদ্ধের মাধ্যমে ইসরায়েলকে একটি থিওক্রেসি বা ধর্মতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত করা যাবে এবং মশীহ পৃথিবীতে আসবেন।

​খ্রিস্টান জায়োনিজম: আমেরিকার একটি বড় গোষ্ঠী বিশ্বাস করে যে এই যুদ্ধ হলো শেষ মহাযুদ্ধ, যার মাধ্যমে যিশু খ্রিস্ট ফিরে আসবেন।

এই গোষ্ঠীগুলো মনে করে, যুদ্ধের ফলে কোটি কোটি মানুষ মারা গেলেও তা ঈশ্বরের পরিকল্পনা সফল করার জন্য প্রয়োজনীয়।

আধুনিক জীবনের অবসান: তিনটি প্রধান পরিবর্তন

এই যুদ্ধের পর পৃথিবী আর আগের মতো থাকবে না। তিনটি বড় পরিবর্তন আসবে:

ক) ডি-আরবানাইজেশন : বড় বড় মেগাসিটি বা শহরগুলো অচল হয়ে পড়বে। কারণ সস্তা জ্বালানি ছাড়া শহরে খাবার এবং পানি পৌঁছানো অসম্ভব হবে। মানুষ বাধ্য হয়ে গ্রামে ফিরে যাবে এবং নিজের খাবার নিজে উৎপাদন করার চেষ্টা করবে।

খ) কৃত্রিম বুদ্ধিমাত্রা বা ​এআই এবং প্রযুক্তির মোহভঙ্গ: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে পেট ভরবে না। যখন বিদ্যুৎ এবং সস্তা জ্বালানি থাকবে না, তখন এই উচ্চাভিলাষী প্রযুক্তিগুলো মূল্যহীন হয়ে পড়বে।

গ) ​জাতীয়তাবাদের প্রত্যাবর্তন: বিশ্বায়নের ধারণা মুছে যাবে। প্রতিটি দেশ নিজের সম্পদ রক্ষা করতে চরম জাতীয়তাবাদী এবং সামরিকবাদী হয়ে উঠবে।

ভবিষ্যৎ পৃথিবীতে তারাই শান্তিতে থাকবে যারা অনেক বেশি সম্পদের আশা ছেড়ে দিয়ে পরিবার, প্রতিবেশী এবং নিজের কমিউনিটির প্রতি মনোযোগী হবে। দয়া, দানশীলতা এবং আধ্যাত্মিকতাই হবে সেই সময়ের আসল সম্পদ।

লেখক: আর্থিক খাতের পরামর্শক

সম্পর্কিত লেখা:

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *