■ এ কে এম শোয়াইবুল ইসলাম ■
আমরা যারা বর্তমান ভূ-রাজনীতিকে কেবল খবরের শিরোনাম বা সাধারণ ক্ষমতার লড়াই হিসেবে দেখছি, আমরা হয়তো একটি বিশাল বড় ছবি মিস করছি। চীনের অধ্যাপক জিয়াং এর গত ক্লাসের লেকচার এবং বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই সংঘাতের শিকড় যতটা না রাজনীতিতে, তার চেয়ে অনেক বেশি ধর্মতত্ত্ব বা Eschatology (শেষ জামানার জ্ঞান)-এ প্রোথিত।
আলোচিত ভিডিওতে চীনের অধ্যাপক জিয়াং সেই অন্ধকার সমীকরণগুলো সহজভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করেন, যা আমাদের বর্তমান বিশ্বব্যবস্থাকে বদলে দিতে পারে।
তিনটি চাঞ্চল্যকর ভবিষ্যৎবাণী
বর্তমান যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি নিয়ে তিনটি মৌলিক পূর্বানুমান আমাদের সামনে রয়েছে-
প্রথমত: যুক্তরাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত সরাসরি স্থলসেনা ইরানে পাঠাতে বাধ্য হবে। এর মানে হলো, ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রে একটি ‘জাতীয় ড্রাফট’ বা বাধ্যতামূলক সেনাবাহিনীতে নিয়োগের আইন জারি করবেন।
দ্বিতীয়ত: কোনো পক্ষই এই যুদ্ধে ‘ট্যাকটিক্যাল নিউক্লিয়ার ওয়েপন’ বা পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করবে না। অর্থাৎ, ধ্বংসলীলা হবে দীর্ঘস্থায়ী এবং প্রথাগত।
তৃতীয়ত: আল-আকসা মসজিদ-যা মুসলিম বিশ্বের তৃতীয় পবিত্রতম স্থান- এই যুদ্ধের ডামাডোলে ধ্বংস করার একটি গভীর ষড়যন্ত্র বাস্তবায়িত হতে পারে। তাদের লক্ষ্য সেখানে ‘তৃতীয় মন্দির’ (Third Temple) নির্মাণ করা।
দুই।
এস্কাটোলজিক্যাল কনভারজেন্স: ধর্মের গোলকধাঁধায় রাজনীতি (The Law of Eschatological Convergence)
এটি একটি অতি উন্নত গেম থিওরি। এস্কাটোলজি মানে হলো—পৃথিবী কিভাবে শেষ হবে তার গল্প। প্রতিটি প্রধান ধর্মের নিজস্ব একটি চিত্রনাট্য আছে। বর্তমানে আমরা যা দেখছি তা হলো একটি ‘ইউনিয়ন অফ স্ক্রিপ্টস’ বা বিভিন্ন ধর্মের শেষ জামানার ভবিষ্যৎবাণীগুলোর এক বিন্দুতে মিলন।
ইহুদি জায়োনিস্ট, খ্রিস্টান জায়োনিস্ট এবং রাশিয়ার অর্থোডক্স—এই তিনটি ভিন্ন পক্ষ এখন বিশ্বাস করছে যে, তাদের ধর্মগ্রন্থের প্রতিশ্রুত সময় ঘনিয়ে এসেছে। মজার ব্যাপার হলো, তাদের ধর্মীয় লক্ষ্যগুলো একে অপরের থেকে ভিন্ন হলেও, সেই লক্ষ্যে পৌঁছানোর ‘ঘটনাগুলো’ এখন একই সূত্রে গাঁথা। যখন অনেকগুলো ভিন্ন গোষ্ঠী একই ধ্বংসাত্মক পথে এগিয়ে যায়, তাকেই বলা হয় ‘এস্কাটোলজিক্যাল কনভারজেন্স’।
তিন।
কেন ন্যারেটিভ বা বয়ানই আসল শক্তি? (গণx জ্বালানীx সমন্বয়)
গেম থিওরি অনুযায়ী, কোনো দল বা জাতি তখনই জয়ী হয় যখন তাদের মধ্যে সমন্বয় থাকে। লেকচারটিতে একটি চমৎকার উদাহরণ দেওয়া হয়েছে—১৯৪০-এর দশকে নাৎসি অধিকৃত পোল্যান্ডের ভেতর থেকে একজন বড় ইহুদি রাব্বিকে উদ্ধারের জন্য খোদ নাৎসি অফিসার, আমেরিকান রাজনীতি এবং আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা সংস্থাগুলো গোপনে একযোগে কাজ করেছিল। কেন? কারণ তারা সবাই একটি সাধারণ ধর্মীয় লক্ষ্যের সাথে যুক্ত ছিল।
আজকের যুগেও, যখন কোনো এলিট গোষ্ঠী বিশ্বাস করে তারা কোনো ‘ঐশ্বরিক পরিকল্পনা’ বাস্তবায়ন করছে, তখন তারা দেশের সীমানা ছাপিয়ে একে অপরের সাথে এমনভাবে সমন্বয় করে যা সাধারণ মানুষের কল্পনাকেও হার মানায়।
চার
প্যাক্স জুডাইকা (Pax Judaica) ও প্রযুক্তির দাজ্জালীয় রূপ
এই নতুন বিশ্বব্যবস্থার নাম হতে পারে ‘প্যাক্স জুডাইকা’। এটি হবে একটি ওয়ান ওয়ার্ল্ড গভর্নমেন্ট, যা পরিচালিত হবে জেরুজালেম থেকে। এর মূল চালিকাশক্তি হবে উচ্চতর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং একটি ডিজিটাল সারভেইল্যান্স সিস্টেম।
আজকাল আমরা যে ডিজিটাল আইডি, বায়োমেট্রিক ট্র্যাকিং বা ডিজিটাল কারেন্সির কথা শুনছি, একে অনেকে ধর্মতাত্ত্বিক প্রেক্ষাপটে ‘মার্ক অফ দ্য বিস্ট’ (Mark of the Beast) বা দাজ্জালীয় নিয়ন্ত্রণের প্রাথমিক ধাপ হিসেবে দেখছেন। বিশ্বের বড় বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো এখন ইসরায়েলের দিকে ঝুঁকছে, যা একটি নতুন প্রযুক্তিনির্ভর সাম্রাজ্যের ইঙ্গিত দেয়।
পাঁচ।
আমেরিকার পতন ও রাশিয়ার ‘তৃতীয় রোম’ তত্ত্ব
ভবিষ্যৎবাণী বলছে, এই নতুন বিশ্ব ব্যবস্থায় আমেরিকা বা চীনের মতো বর্তমান পরাশক্তিগুলোর কোনো কেন্দ্রীয় ভূমিকা থাকবে না।
আমেরিকা যদি ইরান থেকে ফিরে আসে, তবে তাদের অর্থনীতি ধসে পড়বে কারণ মধ্যপ্রাচ্যের ডলারের প্রবাহ বন্ধ হয়ে যাবে।
আর যদি যুদ্ধে জড়ায়, তবে ‘জাতীয় ড্রাফট’-এর ফলে তরুণ প্রজন্মের বিদ্রোহ দেশটিকে একটি অভ্যন্তরীণ গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দেবে।
অন্যদিকে, রাশিয়া তার নিজস্ব ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী ‘তৃতীয় রোম’ (Third Rome) হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে চায়। তারা চায় ন্যাটো এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নকে ধ্বংস করে একটি নতুন অর্থোডক্স বিশ্ব গড়ে তুলতে।
সবশেষে, আমরা কি আসলেও শেষ অধ্যায়ে?
এই যুদ্ধটি কেবল তেলের নয়, কেবল সীমানার নয়—এটি একটি অস্তিত্বের লড়াই। ভূ-রাজনীতির বর্তমান অস্থিরতা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, পর্দার আড়ালে এক বিশাল বড় চিত্রনাট্য অভিনীত হচ্ছে। আমরা হয়তো ইতিহাসের এমন এক বাঁকে দাঁড়িয়ে আছি, যেখানে প্রতিটি পদক্ষেপ আমাদের চূড়ান্ত প্রলয়ের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।
লেখক: আর্থিক খাতের পরামর্শক
