বইমেলায় ৫৭০টি প্রতিষ্ঠানের বিক্রি মাত্র ১৭ কোটি টাকা

■ নাগরিক প্রতিবেদন ■ 

অমর একুশে বইমেলায় প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্মিলিত বিক্রি মাত্র ১৭ কোটি টাকা। রোববার বইমেলার সমাপনী অনুষ্ঠানে মেলা পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব মো. সেলিম রেজা প্রতিবেদনে এ তথ্য তুলে ধরেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়, এবারের মেলায় অংশগ্রহণকারী ৫৮৪টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৫৭০টি ছিল প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে ২৬৯টি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী মেলার ১৭ দিনে তাদের মোট বই বিক্রি হয়েছে প্রায় ৮ কোটি টাকা। এই হিসাবের গড় ধরে ধারণা করা হয়েছে, সব মিলিয়ে ৫৭০টি প্রতিষ্ঠানের বিক্রির পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১৭ কোটি টাকা।

তথ্য বিশ্লেষণে একটি উল্লেখযোগ্য বিষয়ও সামনে এসেছে। দেখা গেছে, অনেক ক্ষেত্রে বেশি ইউনিটের স্টল পাওয়া বড় প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের তুলনায় কম ইউনিটের স্টল পাওয়া ছোট প্রতিষ্ঠানগুলোর বিক্রি বেশি হয়েছে। অর্থাৎ স্টলের আকার নয়, পাঠকের আগ্রহই নির্ধারণ করেছে বিক্রির পরিমাণ।

এদিকে মেলার আয়োজক প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমিও নিজস্ব স্টল থেকে বই বিক্রির হিসাব প্রকাশ করেছে। ১৪ মার্চ পর্যন্ত ১৭ দিনে বাংলা একাডেমি বিক্রি করেছে ১৭ লাখ ৪ হাজার ৬২৯ টাকার বই। মেলায় বাংলা একাডেমিসহ সব প্রতিষ্ঠানের বই ২৫ শতাংশ কমিশনে বিক্রি হয়েছে।

এবারের মেলায় নতুন বইয়ের সংখ্যাও ছিল উল্লেখযোগ্য। তথ্যকেন্দ্রের হিসাবে ১৪ মার্চ পর্যন্ত জমা পড়েছে ১ হাজার ৭৭১টি নতুন বই। তবে সব প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান তথ্যকেন্দ্রে বই জমা না দেওয়ায় প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়েও বেশি বলে ধারণা করা হচ্ছে। নিবন্ধন অনুযায়ী ২৫২টি বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করা হয়েছে।

বাংলা একাডেমি ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানজুড়ে এবারের মেলায় ৫৮৪টি প্রতিষ্ঠানকে ১০৬৮ ইউনিটের স্টল বরাদ্দ দেওয়া হয়। শিশুদের জন্য ৬৩টি প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হয় ১১১ ইউনিটের স্টল, আর লিটল ম্যাগাজিন চত্বরে ছিল ৯০টি লিটল ম্যাগ স্টল।

সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এবারের মেলায় স্টল ভাড়া মওকুফ করা হয়। যারা আগে স্টল ভাড়ার টাকা জমা দিয়েছিলেন, তাদের অর্থ ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে বলেও জানানো হয়।

প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, এবারের মেলার মূল প্রতিপাদ্য ছিল ‘বহুমাত্রিক বাংলাদেশ’। বিভিন্ন আয়োজন ও আলোচনাকে এই প্রতিপাদ্যের আলোকে সাজানো হয়েছিল। শিশুদের জন্য পৃথক চত্বর, শিশুপ্রহর, পাপেট শো ও বায়োস্কোপের আয়োজন ছিল বিশেষ আকর্ষণ।

মেলার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুরো এলাকা জুড়ে তিন শতাধিক সিসিটিভি ক্যামেরা বসানো হয়। বাংলাদেশ পুলিশ, র‍্যাব, আনসার, বিএনসিসি ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা যৌথভাবে নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করেছে। মেলা প্রাঙ্গণকে পলিথিন ও ধূমপানমুক্ত রাখার উদ্যোগ এবং নিয়মিত ধুলা নিবারণ ও পরিচ্ছন্নতার ব্যবস্থাও প্রশংসিত হয়েছে।

সমাপনী প্রতিবেদনে সদস্য সচিব বলেন, বইমেলা কেবল বই বিক্রির বাজার নয়; এটি আমাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অংশ। সেই অর্থে বইমেলা আজ সত্যিই এক ‘মিলনমেলা’ প্রাণের বইমেলা। সব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে সবার অংশগ্রহণে এবারের অমর একুশে বইমেলা সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

উল্লেখ্য, জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও পবিত্র রমজানের কারণে নির্ধারিত সময়ের অনেক পরে মেলা অনুষ্ঠিত হয়েছে। মেলা শুরু হয় গত ২৬ ফেব্রুয়ারি থেকে। এবারে মেলার মূল প্রতিপাদ্য ছিল ‘বহুমাত্রিক বাংলাদেশ’।

শনিবার এক সংবাদ সম্মেলনে ‘প্রকাশক ঐক্য’ জানিয়েছে, প্রায় পাঠকশূন্য এই মেলায় অংশ নিয়ে প্রকাশকরা ব্যাপক আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন।

তাদের তথ্য অনুযায়ী, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতার কারণে ২০২৫ সালের বইমেলায় বিক্রি ২০২৪ সালের তুলনায় প্রায় ৬০ শতাংশ কমেছিল। আর চলমান ২০২৬ সালের মেলায় বিক্রি কমেছে ২০২৫ সালের তুলনায় প্রায় ৮০ শতাংশ।

তাদের মতে, স্বাভাবিক বছরের তুলনায় এবার বই বিক্রি প্রায় ৭০ শতাংশ কম। এবারের বইমেলার ব্যবসায়িক পরিস্থিতি ২০২১ সালের করোনাকালীন মেলার চেয়েও খারাপ। অংশগ্রহণকারী প্রায় ৯০ শতাংশ প্রকাশকের স্টল নির্মাণের প্রাথমিক খরচও ওঠেনি। এর মধ্যে প্রায় ৩০ শতাংশ প্রকাশকের ৫ হাজার টাকার বইও বিক্রি হয়নি।

এদিকে মেলার শেষ সময়ে সাধারণত যখন শেষ মুহূর্তের কেনাবেচায় মুখর থাকার কথা, ঠিক তখনই প্রকৃতি বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

শুক্রবার সন্ধ্যার আকস্মিক বৃষ্টি ও ঝোড়ো হাওয়ায় মেলার দৃশ্যপট বদলে যায়। শনিবার মেলা প্রাঙ্গণ ঘুরে দেখা গেছে, উৎসবের আমেজের বদলে প্রকাশকদের চোখেমুখে এখন ক্ষয়ক্ষতির দুশ্চিন্তা ও হতাশা।

শনিবার মেলার তথ্যকেন্দ্রে নতুন বই জমা পড়েছে ১৫৭টি।

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে দ্য ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহরুখ মহিউদ্দিন বলেন, ‘নির্বাচিত নতুন সরকারের প্রতি সমর্থন ও সহযোগিতার বার্তা হিসেবেই নিজেদের নিশ্চিত ব্যবসায়িক ক্ষতির বিষয়টি জেনেও আমরা নির্বাচন-পরবর্তী এই প্রতিকূল বাস্তবতায় ও পবিত্র রমজান মাসে মেলায় অংশগ্রহণ করেছি। কিন্তু অত্যন্ত বেদনার সঙ্গে জানাতে হচ্ছে যে মেলা নিয়ে আমাদের প্রাথমিক আশঙ্কাই শেষ পর্যন্ত নির্মম বাস্তবে পরিণত হয়েছে।’

মাহরুখ মহিউদ্দিন বলেন, ‘আমরা স্বপ্ন দেখি একটি ১০০ কোটি টাকার বইমেলার। ১৮ কোটি মানুষের এই দেশে ৫০ লাখ থেকে ১ কোটি বই বিক্রি করার স্বপ্ন কোনো অবান্তর কল্পনা নয়। সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা, সমন্বিত উদ্যোগ এবং ৫০ লাখ থেকে ১ কোটি টাকার একটি সুনির্দিষ্ট মার্কেটিং বাজেট থাকলে আগামী তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যেই এই লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব।’

বইমেলার সামগ্রিক আয়োজনে প্রকাশকেরা যদি চালকের আসনে থাকেন এবং কর্তৃপক্ষ যথাযথ সহযোগিতা করে, তবে মেলার চেহারা পাল্টে দেওয়া সম্ভব বলে মনে করেন মাহরুখ মহিউদ্দিন। তিনি বলেন, ‘আমরা ঐতিহ্যের দায়বদ্ধতা থেকে মেলায় অংশ নিয়েছি। কিন্তু মেলায় যদি বই বিক্রিই না থাকে এবং প্রকাশকেরা সর্বস্বান্ত হতে থাকেন, তবে একসময় এটি একটি “মৃত ঐতিহ্যে” পরিণত হবে, যা কারও কাম্য নয়। এবারের মেলা আমাদের জন্য একটি বড় শিক্ষার জায়গা।’

বইমেলায় বিক্রির এমন অবস্থাকে ‘বিপর্যয়’ উল্লেখ করে এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে পাঁচটি সুপারিশ তুলে ধরেন আদর্শ প্রকাশনীর মাহাবুব রাহমান। সেগুলো হলো চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত প্রকাশকদের প্রত্যেকের অন্তত একটি করে মানসম্পন্ন বইয়ের ৩০০ থেকে ৫০০ কপি ক্রয়ের জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণ করা; প্রকাশনাশিল্পকে টিকিয়ে রাখতে সরকারি বই ক্রয়ের বাজেট বাস্তবসম্মতভাবে প্রণয়ন করা এবং সৃজনশীল প্রকাশনায় পেশাগত ও গুণগত দক্ষতা বৃদ্ধিতে সরকারি উদ্যোগে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা; স্কুল-কলেজের লাইব্রেরিগুলো উন্নত করা, বন্ধ হয়ে যাওয়া লাইব্রেরি আবার চালু করা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ‘লাইব্রেরি ক্লাস’ বাধ্যতামূলক করার দাবি জানান মাহাবুব রাহমান।

আগামী বছরের বইমেলার তারিখ এই মেলা শেষের পরপরই অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করে এখনই নির্ধারণ করা প্রয়োজন উল্লেখ করে তিনি আগামী মেলাগুলোর জন্য স্টলভাড়ার বিষয়ে প্রকাশকদের সঙ্গে আলোচনা করে একটি যৌক্তিক সিদ্ধান্তে আসার অনুরোধ জানান। একই সঙ্গে জাতীয় গ্রন্থনীতি বাস্তবায়নের দাবিও তোলেন এই প্রকাশক।

দেশের প্রকাশনা খাতে বাংলা একাডেমি, বাপুস এবং প্রকাশক ঐক্য—কেউ কারও প্রতিপক্ষ নয় বলে উল্লেখ করেন অনন্যা প্রকাশনীর প্রকাশক মনিরুল হক। তিনি বলেন, ‘লেখক, পাঠক ও প্রকাশক—সবার স্বার্থ সংরক্ষণ করে আমাদের বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনার দিকে মনোযোগ দিতে হবে। এখানে কোনো ব্যক্তিগত অহম বা স্বার্থ সামষ্টিক স্বার্থের ঊর্ধ্বে স্থান পেতে পারে না। অনর্থক বিভাজন আমাদের কারও জন্যই কাম্য নয়।’

সংবাদ সম্মেলনের শুরুতে বর্তমান সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন অ্যাডর্ন পাবলিকেশনের প্রকাশক সৈয়দ জাকির হোসাইন। তিনি বলেন, ‘শপথ গ্রহণের পরপরই মাননীয় মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী মহোদয় যেভাবে প্রকাশকদের কথা শুনতে ছুটে এসেছেন এবং সংকট নিরসনে আন্তরিকতা দেখিয়েছেন, তা সত্যিই অভাবনীয়। সব পক্ষকে নিয়ে একটি অংশগ্রহণমূলক বইমেলা আয়োজনের সদিচ্ছা এবং প্রকাশকদের স্টলভাড়া সম্পূর্ণ মওকুফ করার জন্য আমরা সরকারকে সাধুবাদ জানাই।’

প্রকাশক ঐক্যের দাবি মেনে নিয়ে প্যাভিলিয়ন প্রথা বাতিল করায় বাংলা একাডেমিকে ধন্যবাদ জানান সৈয়দ জাকির হোসাইন। পাশাপাশি তিনি পাঠক, লেখক, প্রকাশকদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানান।

মেলার ১৭তম দিনে শনিবার সকালে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান প্রাঙ্গণে গিয়ে দেখা যায়, অনেক স্টলের সামনে কাদা ও পানি জমে আছে। পলিথিন ও ত্রিপলের ওপর ভেজা বই সারিবদ্ধভাবে মেলে শুকাতে দেওয়া হয়েছে। রোদে বই শুকানোর দৃশ্যও দেখা গেছে। বিশেষ করে লেকপাড়ের স্টলগুলোর অবস্থা বেশি খারাপ।

বাংলা একাডেমি পরিচালিত বিভিন্ন পুরস্কারপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের নামের তালিকা

চিত্তরঞ্জন সাহা স্মৃতি পুরস্কার: ২০২৫ সালে প্রকাশিত বিষয় ও গুণমানসম্মত সর্বাধিকসংখ্যক গ্রন্থ প্রকাশের জন্য প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান কথা প্রকাশকে চিত্তরঞ্জন সাহা স্মৃতি পুরস্কার ২০২৬ দেওয়া হবে।

মুনীর চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার: ২০২৫ সালে প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্য থেকে গুণমান ও শৈল্পিক বিচারে সেরা গ্রন্থের জন্য প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ঐতিহ্য (প্রকাশিত: কালি-কলম আর কাগজের অড রিসার্চ, ফাউন্টেন পেন, আমিন বাবু); প্রথমা প্রকাশন (শিলালিপি: বাংলার আরবি-ফারসি প্রত্নলেখমালা, মুহম্মদ ইউসুফ সিদ্দিক) ও দ্য ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড (বরিশাল অ্যান্ড বেয়ন্ড: এসেজ অন বাঙলা লিটারেচার, ক্লিনটন বি সেলি)।

রোকনুজ্জামান খান দাদাভাই স্মৃতি পুরস্কার: পুরস্কারটি পাচ্ছে পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লিমিটেড। ২০২৫ সালে গুণমান বিচারে সর্বাধিকসংখ্যক শিশুতোষ গ্রন্থ প্রকাশের জন্য প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানটিকে এই পুরস্কার দেওয়া হচ্ছে।

সরদার জয়েনউদ্‌দীন স্মৃতি পুরস্কার: পুরস্কারটি পাচ্ছে সহজ প্রকাশ। ২০২৪ বা ২০২৫ সালের মেলায় যেসব প্রতিষ্ঠান প্রথম অংশগ্রহণ করে, তাদের মধ্য থেকে গুণগতমান বিচারে সর্বাধিকসংখ্যক গ্রন্থ প্রকাশের জন্য প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানটি এই পুরস্কারটি পাচ্ছে।

শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার: অমর একুশে বইমেলায় নান্দনিক অঙ্গসজ্জায় সেরা প্রতিষ্ঠান হিসেবে শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার পাচ্ছে ক্রিয়েটিভ ঢাকা পাবলিকেশনস, মাত্রা প্রকাশ ও বেঙ্গল বুকস।

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *