■ শান্তা মারিয়া ■
সেদিন ফেসবুকে একটি পোস্টে চোখ আটকে গেল। এক দম্পতি ঈদ শপিংয়ে গেছেন। স্ত্রীকে উচ্চমূল্যের জুতা কিনে দিতে পারেননি স্বামী। স্ত্রী জনসমক্ষেই অপমানজনক কথা বলেছেন। রাগে ক্ষোভে পাশের ফলের দোকানে রাখা ছুরি নিজের গলায় চালিয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন স্বামী। কতটা দুঃখ বা ক্ষোভ থেকে একজন মানুষ নিজের গলায় ছুরি চালায়।
ঈদ শপিং নিয়ে আগেও এরকম নিউজ প্রকাশিত হয়েছে। প্ছন্দের পোশাক কিনে না দেয়ায় অভিমানে স্ত্রী বা মেয়ের আত্মহত্যার খবর পড়েছি। আবার নতুন জামাইকে শ্বশুরবাড়ি থেকে দামী ঈদ উপহার, পাঞ্জাবি ইত্যাদি না দেয়ায় স্ত্রীকে তালাক দেয়ার বা নির্যাতনের ঘটনা প্রকাশ হয়েছে বহুবার। বাংলাদেশের অনেক পরিবারে নাকি একটা কুপ্রথা আছে। বিয়ের পর মেয়ের শ্বশুরবাড়ির সবাইকে ঈদের জামাকাপড় দিতে হয়। রোজায় ইফতার পাঠাতে হয়। কোরবানিতে গরু পাঠাতে হয়। এসব জানতে পারছি গত কয়েক বছরে ফেসবুকে বিভিন্ন জনের পোস্টের কারণে। আমার পরিবারে এসব কখনও দেখিনি বা শুনিনি।
এসবই হলো ঈদের উৎসবকে মধ্যবিত্তের জন্য দুঃস্বপ্নে পরিণত করা। একটি মধ্যবিত্ত পরিবারে অনেক সময়ই এই ঈদশপিং হয়ে দাঁড়ায় অনেক মান অভিমান, কলহ এবং দুঃখের কারণ।
ছোটবেলায় ঈদের সময় আমি কেনাকাটা করতে যেতাম বাবা মা ও ভাইয়ার সঙ্গে। আমরা চারজন আমাদের বেবি অস্টিন গাড়িতে চড়ে নিউ মার্কেট, বায়তুল মোকারম, এলিফেন্ট রোড বা স্টেডিয়ামের কোন কোন দোকানে কেনাকাটা করতাম।
ঈদ কেনাকাটা হওয়া উচিত আনন্দের জন্য। প্রিয়জনের ওপর জুলুম করার জন্য নয়। জোর জবরদস্তি করে, প্রিয়জনদের কষ্ট দিয়ে নিজের জন্য ঈদের উপহার আদায় করার মধ্যে যে কি আনন্দ আছে তাই বুঝি না।
আমার বাবা সরকারি চাকরিজীবী ও অত্যন্ত সৎমানুষ ছিলেন। তাই বোনাসের অল্প টাকা নিয়েই ঈদ শপিং করতাম আমরা। তবে কখনও কোনদিন শপিং নিয়ে কোন ঝগড়া বা মানঅভিমানের ঘটনা ঘটেনি। আমি বা আমার ভাই কেউই বাবার সাধ্যের অতিরিক্ত কিছু কখনও চাইতাম না। ইচ্ছাও করতো না।
আমার মা এবং বাবার কেনাকাটা ছিল যেন ও. হেনরির উপহার গল্পের রূপায়ণ। বাবা চাইতেন নিজের জন্য কিছু না কিনে মায়ের শাড়িটা দামি কিনতে। আর মা চাইতেন নিজের জন্য খুব সাধারণ একটি শাড়ি নিয়ে বাবার জন্য ভালো কিছু কিনতে। সবমিলিয়ে বেশ ভালোই কেনাকাটা হতো।
তখন এত লাখ টাকার শাড়ি, লেহেঙ্গা ছিল না। তখনকার কথা নাহয় বাদ দিলাম। আমি আমার ত্রিশ বছরের কর্মজীবনে যথেষ্ট টাকা রোজগার করেছি। কিন্তু কখনও পাঁচ হাজার টাকা দিয়েও শাড়ি কিনেছি বলে তো মনে পড়ে না। আমার শাড়ির দাম বড়জোর পনেরশ থেকে দুই হাজারে সীমাবদ্ধ।
ছোটবেলায় বাবার কাছে শুনতাম, প্লেইন লিভিং, হাই থিংকিং। সেটাই নাকি মানুষের আদর্শ হওয়া উচিত। আর এখন দেখি হাই লিভিং, পুওর থিংকিং চলছে দুনিয়া জুড়ে।
সোভিয়েতের পতনের পর আদর্শ, সাম্য, এসব শব্দ ব্রাত্য হয়ে গেছে। চারিদিকে শুধু ভোগবাদ আর ভোগী মানুষ। মানসিক দৈন্য আমরা কত আর জিডিপি দিয়ে ঢাকবো? যে দেশে এখনও ফুটপাথে মানুষ ঘুমায়, যে দেশে এখনও শিশুরা স্কুলে যাওয়ার বদলে কায়িক শ্রম দেয়, যে দেশে মানুষ এখনও বিনা চিকিৎসায় মরে সে দেশে কোন লজ্জায়, কোন মুখে লাখ টাকার পোশাক গায়ে চড়ায়?
ঈদের কেনাকাটায় আমি সারাজীবন চেষ্টা করেছি নিজের জন্য সামান্য কিছু কিনে বরং আত্মীয় বন্ধু সকলের জন্য অল্প দামের হলেও কিছু না কিছু কিনতে।
আমার ছোটবেলায় এবং তারুণ্যে এত ইলিয়নের (উচ্চারণটা কি এলিয়েন না ইলিয়ন?) পাঞ্জাবি ছিল না। এলিফেন্ট রোড অথবা পীর ইয়ামেনি মার্কেট থেকেই কিনতাম।
প্রেমিক প্রেমিকাদের মধ্যেও এত উচ্চদামের উপহার দেয়া নেয়ার চল ছিল না। সবচেয়ে বড় কথা বাড়িতে বাবা মায়ের শাসন ছিল। কোন ছেলে বা মেয়ের এত সাহস হয়েছে যে বাড়িতে প্রেমিকার বা প্রেমিকের দেয়া উপহার নিয়ে আসবে? বাবা মা প্রথমেই তো জিজ্ঞাসা করবে এটা কোথায় পেলি, কে দিল, কেনই বা দিল। প্রশ্নের ঠেলায় জীবন বেরিয়ে যাবে।
অথচ আজকাল নাকি বাবা মায়েরাই খোঁজ খবর নেয় কার বয়ফ্রেন্ড বা গার্লফ্রেন্ড কি দিয়েছে।
ঈদ কেনাকাটা হওয়া উচিত আনন্দের জন্য। প্রিয়জনের ওপর জুলুম করার জন্য নয়। জোর জবরদস্তি করে, প্রিয়জনদের কষ্ট দিয়ে নিজের জন্য ঈদের উপহার আদায় করার মধ্যে যে কি আনন্দ আছে তাই বুঝি না।
লেখক: শিক্ষক, কবি ও প্রাবন্ধিক
