৫৯ বছর পর আল-আকসায় ঈদের নামাজ নিষিদ্ধ

নাগরিক নিউজ ডেস্ক

মুসলিমদের তৃতীয় পবিত্রতম স্থান আল-আকসা মসজিদে ফিলিস্তিনিদের ঈদের নামাজ পড়ায় নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে ইসরায়েল। শুক্রবার (২০ মার্চ) পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে আল-আকসা মসজিদে ঈদের নামাজ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। ৫৯ বছর পর মসজিদটিতে ঈদের নামাজের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিলো ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ।

ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ যুদ্ধ পরিস্থিতির অজুহাতে এই নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। ফিলিস্তিনিরা শুক্রবার মুসল্লিদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, তারা যেন পুরনো শহরের কাছে জড়ো হয়ে যতটা সম্ভব আল-আকসা মসজিদের কাছাকাছি অবস্থান নিয়ে ঈদুল ফিতরের নামাজ আদায় করেন।

এর আগে, রমজান মাসে আল-আকসায় প্রবেশে বিধিনিষেধের প্রতিবাদে ওল্ড সিটির বাইরে নামাজ আদায়কারী ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরায়েলি পুলিশ লাঠি, সাউন্ড গ্রেনেড এবং টিয়ার গ্যাস ব্যবহার করেছে।

এদিকে উৎসবের এই সময়েও দখলকৃত পূর্ব জেরুজালেমে বিষণ্ন পরিবেশে কাটছে। সাধারণত ঈদের আগের দিনগুলোতে ওল্ড সিটি ফিলিস্তিনিদের ভিড়ে পরিপূর্ণ থাকে, কিন্তু এবার এলাকা প্রায় জনশূন্য এবং নীরব।

১৯৬৭ সালের পর এই প্রথম ঈদুল ফিতরের দিন আল-আকসা মসজিদ বন্ধ রাখা হয়। ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ মসজিদ চত্বরটি বন্ধ রাখায় ফিলিস্তিনিদের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পবিত্র ঈদুল ফিতরের নামাজ আদায়ের জন্য মুসল্লিরা বন্ধ করে দেওয়া ওই স্থাপনার যতটা সম্ভব কাছে জড়ো হন।

ইসরায়েলি নিষেধাজ্ঞার প্রতিবাদে আল-আকসার খতিব ও জেরুজালেমের সাবেক গ্র্যান্ড মুফতি শেখ ইকরিমা সাবরি একটি ধর্মীয় নির্দেশনা জারি করেন। তিনি মুসলিমদের মসজিদের নিকটতম স্থানে ঈদের নামাজ আদায়ের আহ্বান জানান।

শুক্রবার সকালে ইসরায়েলি পুলিশ জেরুজালেমের ওল্ড সিটির প্রবেশপথগুলোতে ব্যারিকেড দেওয়ায় শত শত মুসল্লি বাইরে নামাজ পড়তে বাধ্য হন। মুসল্লিদের একটি অংশ আল-আকসা মসজিদের দিকে যেতে চাইলে স্টান গ্রেনেড এবং কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করে তাঁদের ছত্রভঙ্গ করে দেওয়া হয়।

ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল চলমান যুদ্ধের কারণে নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগ দেখিয়ে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে আল-আকসা মসজিদের চত্বরটি কার্যত সিলগালা করে দেয় ইসরায়েল। এর ফলে হাজার হাজার ফিলিস্তিনি ওল্ড সিটির ফটকের আশপাশে জড়ো হয়ে ঈদের নামাজ আদায় করেন।

ফিলিস্তিনিদের দাবি, এটি ইসরায়েলের একটি বৃহত্তর কৌশলের অংশ। তাদের মতে, নিরাপত্তা উত্তেজনাকে পুঁজি করে আল-আকসা মসজিদ চত্বরের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর করতে চায় ইসরায়েল।

সাম্প্রতিক মাসগুলোতে জেরুজালেমের মুসল্লি ও ধর্মীয় নেতাদের গ্রেফতার ব্যাপক বেড়েছে। পাশাপাশি ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীরাও বারবার এই চত্বরে অনুপ্রবেশ করেছে। পুলিশ নামাজের সময়সহ বিভিন্ন সময়ে মসজিদ প্রাঙ্গণ থেকে লোকজনকে আটক করেছে এবং ফিলিস্তিনিদের প্রবেশে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে।

ঈদের আগের দিনগুলোতে জেরুজালেমের ওল্ড সিটি সাধারণত ফিলিস্তিনিদের ভিড়ে মুখর থাকে। কিন্তু ইসরায়েলি নিষেধাজ্ঞার কারণে এবার ঈদের দিনও এ শহর ছিল অনেকটা জনশূন্য। রাস্তাঘাট ছিল অস্বাভাবিক নিরিবিলি।

ফিলিস্তিনি দোকানদারদের বেশির ভাগ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান খুলতে দেওয়া হয়নি। শুরু ফার্মেসি ও জরুরি খাদ্যের দোকানগুলো খোলার অনুমতি ছিল। ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, এই পদক্ষেপের কারণে তাঁরা চরম আর্থিক সংকটে পড়েছেন।

আল-আকসা মসজিদ বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনায় বিশেষ করে পবিত্র রমজান মাসে মুসল্লিদের সেখানে যেতে না দেওয়ার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কো-অপারেশন (ওআইসি), আরব লিগ এবং আফ্রিকান ইউনিয়ন কমিশন। এক যৌথ বিবৃতিতে সংস্থাগুলো জানায়, এই পদক্ষেপ দখলকৃত জেরুজালেম শহরের ইসলামি ও খ্রিষ্টান পবিত্র স্থানগুলোর বিদ্যমান ঐতিহাসিক ও আইনি স্থিতাবস্থার গুরুতর লঙ্ঘন।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ‘দখলদার শক্তি হিসেবে এই অবৈধ ও উসকানিমূলক পদক্ষেপের ফলে উদ্ভূত পরিস্থিতির সব দায় ইসরায়েলকেই নিতে হবে।’ সংস্থাগুলো সতর্ক করে দিয়ে বলেছে, এ ধরনের কর্মকাণ্ড অব্যাহত থাকলে তা সহিংসতা ও উত্তেজনা বাড়িয়ে দেবে এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তাকে বিঘ্নিত করবে।

অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় মানবিক সংকট আরও ঘনীভূত হচ্ছে। চলমান বড় পরিসরের যুদ্ধের ছায়ায় সেটি ঢাকা পড়েছে। গাজায় ইসরায়েলি হামলা আগের চেয়ে বিক্ষিপ্ত হলেও থামেনি। এর মধ্যেই ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া শহরগুলোতে ঈদুল ফিতর উদ্‌যাপন করছেন লাখো মানুষ।

গাজায় এবারের ঈদ এক চরম বৈপরীত্যের রূপ নিয়েছে। শোক আর ক্ষণস্থায়ী আনন্দ, ক্ষুধা আর উদ্‌যাপন এবং বিলাপের সঙ্গে মিলেমিশে আছে প্রাত্যহিক জীবনের লড়াই। উত্তর গাজা থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে দেইর আল-বালাহতে আশ্রয় নেওয়া দুই সন্তানের জননী সাদিকা ওমর (৩২) বলেন, ‘ঈদের আনন্দ এবার অপূর্ণ। আমাদের কেউ ঘর হারিয়েছে, কেউ হারিয়েছে পরিবারের সদস্যকে। আমার স্বামী দূরে আছেন, সীমান্ত পারাপার বন্ধ থাকায় তিনি গাজায় ফিরতে পারছেন না। তবু আমরা যতটা সম্ভব ধর্মীয় শিক্ষা অনুসরণ করার চেষ্টা করছি।’

গাজায় এই নামমাত্র উদ্‌যাপনের আড়ালে রয়েছে হারানোর গল্প। মায়েরা সাম্প্রতিক হামলায় নিহত সন্তানদের জন্য শোক করছেন। আবার কেউ কেউ কোনো আনুষ্ঠানিকতা ছাড়াই নীরবে ঈদ পালন করছেন, যাঁদের সম্বল এখন কেবলই স্মৃতি।

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *