হাদি হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা অস্বীকার ফয়সাল করিমের

পশ্চিমবঙ্গ প্রতিনিধি

ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শহীদ শরিফ ওসমান বিন হাদি হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করে প্রধান আসামি ও সন্দেহভাজন ‘শুটার’ ফয়সাল করিম মাসুদ বলেছেন, ‘আমি হাদি হত্যার সঙ্গে জড়িত নই। আমাকে ফাঁসানো হয়েছে।’

রোববার (২২ মার্চ) পশ্চিমবঙ্গের আদালত প্রাঙ্গণে সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে ফয়সাল এই কথা বলেন।

ওসমান হাদি হত্যা মামলায় সম্প্রতি ভারতের পশ্চিমবঙ্গে গ্রেফতার হওয়া ফয়সাল ও তার সহযোগী আলমগীরকে এদিন আদালতে তোলা হলে বিচারক ১২ দিনের বিচারবিভাগীয় জেল হেফাজতে নেওয়ার আদেশ দেন।এই সময়কালে তাকে জেলে গিয়ে জেরা করতে পারবে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের বিশেষ টাস্কফোর্স (এসটিএফ)। আবার তাদের ২ এপ্রিল আদালতে তোলা হবে।

তাদের বিরুদ্ধে ইউএপিএ অ্যাক্ট ১৬ ও ১৮ ধারায় মামলা দেওয়া হয়েছে। এই মামলার অর্থ হলো—সন্ত্রাসী হামলার পরিকল্পনা করা, কাউকে সাহায্য করা বা প্ররোচনা দেওয়ার চেষ্টা করা।মূলত, এই ধরনের মামলায় ভারতীয় দণ্ডবিধি অনুযায়ী কমপক্ষে পাঁচ বছর থেকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ড হয়ে থাকে।

আদালত থেকে বের হওয়ার সময় সাংবাদিকরা ফয়সালের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি হাদিকে সরাসরি গুলি করেছি।রাজনৈতিকভাবে আমাকে ফাঁসানো হচ্ছে।’

ফয়সাল আরও বলেন, ‘আমি ওই সময় বাংলাদেশে ছিলাম। অবশ্যই আমাকে সিসিটিভির ফুটেজে দেখা গেছে। কিন্তু আমাকে গুলি করতে দেখা যায়নি।’ 

তবে বাংলাদেশ থেকে কী কারণে ফয়সাল ভারতে চলে এসেছেন—এমন প্রশ্ন করা হলে উত্তর দেননি তিনি।

এছাড়া গত জানুয়ারিতে তার নিজের করা ভিডিওর বিষয়ে সাংবাদিকরা ফয়সালের কাছে জানতে চান- ‘তুমি (ফয়সাল) দুবাইয়ের ভিডিও বানিয়ে বলেছিলে যে—তুমি দুবাইয়ে আছো’। এমন প্রশ্ন করা হলেও ফয়সাল কোনো কথা বলেননি।

গত ৭ মার্চ রাতে ফয়সাল এবং তার সহযোগী আলমগীরকে বাংলাদেশ সীমান্ত লাগোয়া পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগনা জেলার বনগাঁ এলাকা থেকে গ্রেফতার করে পশ্চিমবঙ্গ এসটিএফ। ৮ মার্চ তাদের স্থানীয় আদালতে তোলা হলে ১৪ দিনের পুলিশ রিমান্ডের নির্দেশ দেন বিচারক।

১৪ দিনের রিমান্ড শেষ রোববার (১৭ মার্চ) কলকাতার বিধাননগর আদালতে তোলা হয়েছিল ফয়সাল করিম ও আলমগীরকে। তার আগে তাদের শারীরিক পরীক্ষা করানোর জন্য হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।

এর আগে, শনিবার (২১ মার্চ) ওসমান হাদি হত্যা মামলায় বাংলাদেশি নাগরিক ফিলিপ সাংমাকে ১৪ দিনের জেল হেফাজত দেন আদালত। ফিলিপ প্রধান আসামি ফয়সাল ও তার সহযোগী আলমগীরকে ভারতে পালাতে সহায়তা করেন বলে বাংলাদেশের পুলিশের দাবি। জেল হেফাজতে থাকাকালে তাকে কারাগারে গিয়ে জেরা করতে পারবে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের বিশেষ টাস্কফোর্স (এসটিএফ)। তাকে আবার ৩ এপ্রিল আদালতে তোলা হবে।

১২ ডিসেম্বর জুমার নামাজের পর ঢাকার বিজয়নগরের বক্স কালভার্ট রোড এলাকায় প্রচারে যাওয়া ওসমান হাদিকে গুলি করে মোটরসাইকেলে আসা দুই সন্ত্রাসী। রিকশায় থাকা হাদি মাথায় গুলিবিদ্ধ হন। তাকে প্রথমে ঢাকায় চিকিৎসা দেওয়া হয়। পরে সিঙ্গাপুরে নেওয়া হলেও বাঁচানো যায়নি। ১৮ ডিসেম্বর তিনি মারা যান।

প্রথমে এ ঘটনায় একটি হত্যাচেষ্টা মামলা হয়, যা পরে হত্যা মামলায় রূপ নেয়। এতে প্রধান আসামি করা হয় সন্দেহভাজন শুটার ফয়সালকে। এছাড়া আসামি করা হয় ফয়সালের সহযোগী আলমগীর, তার স্ত্রী, শ্যালক ও বান্ধবী এবং তাকে ভারতে পালাতে সহায়তা করা ফিলিপ সাংমাসহ অন্য সহযোগীদের।

গত জানুয়ারিতে হাদি হত্যাকাণ্ডের মামলায় চার্জশিট দেয় গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। ৬ জানুয়ারি এ সংক্রান্ত সংবাদ সম্মেলনে ডিবির তৎকালীন প্রধান অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম জানান, আমরা ১৭ জনের নামে চার্জশিট দিয়েছি। এদের মধ্যে আছেন হাদিকে গুলি করা ফয়সাল করিম মাসুদ, মোটরসাইকেল চালক আলমগীর শেখ, তাদের পালাতে সহায়তা করা মানবপাচারকারী ফিলিফ, হত্যার নির্দেশদাতা যুবলীগ নেতা তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পী। এর পর যদি আর কারও সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়, তাহলে সম্পূরক চার্জশিট দেওয়া হবে।

হাদি গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর গত ১৪ ডিসেম্বর ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য সচিব আব্দুল্লাহ আল জাবের বাদী হয়ে হত্যাচেষ্টা মামলা দায়ের করেন। পরে মামলাটিতে হত্যার ৩০২ ধারা যুক্ত হয়। এরপর থানা পুলিশের হাত ঘুরে মামলার তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় ডিবি পুলিশকে।

তদন্ত শেষে সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পি, সাবেক ছাত্রলীগ কর্মী ফয়সাল করিম মাসুদসহ ১৭ জনকে আসামি করে গত ৬ জানুয়ারি হাদি হত্যা মামলার অভিযোগপত্র দেয় গোয়েন্দা পুলিশ।

অভিযোগপত্রভুক্ত আসামিরা হলেন- প্রধান অভিযুক্ত ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে রাহুল ওরফে দাউদ (৩৭), তার বাবা মো. হুমায়ুন কবির (৭০), মা হাসি বেগম (৬০), স্ত্রী সাহেদা পারভীন সামিয়া (২৪), শ্যালক ওয়াহিদ আহমেদ শিপু (২৭), বান্ধবী মারিয়া আক্তার লিমা (২১), মো. কবির (৩৩), মো. নুরুজ্জামান নোমানী ওরফে উজ্জ্বল (৩৪), ভারতে পালাতে সহায়তার অভিযোগ থাকা সিবিয়ন দিউ (৩২), সঞ্জয় চিসিম (২৩), মো. আমিনুল ইসলাম ওরফে রাজু (৩৭) ও হত্যায় ব্যবহৃত অস্ত্র-গুলি উদ্ধারের ঘটনায় গ্রেফতার মো. ফয়সাল (২৫), মো. আলমগীর হোসেন ওরফে আলমগীর শেখ (২৬), সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো. তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পী, ভারতে পালাতে সহায়তাকারী ফিলিপ স্নাল (৩২), মুক্তি মাহমুদ (৫১) ও জেসমিন আক্তার (৪২)। তাদের মধ্যে শেষের তিনজন পলাতক রয়েছেন।

এর মধ্যে ১ জানুয়ারি ফয়সাল করিমের দুটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওর মাধ্যমে ফয়সাল দাবি করেন, বর্তমানে তিনি দুবাইয়ে অবস্থান করছেন। হাদি হত্যাকাণ্ডে তার সংশ্লিষ্টতা নেই। এমনকি তিনি কিছু ফ্লাইট ও পাসপোর্ট সংক্রান্ত কিছু নথিও প্রকাশ করেন।

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *