■ নাগরিক প্রতিবেদক ■
এক-এগারোর সময়ের কুখ্যাত সাবেক সেনা কর্মকর্তা মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে মানবপাচার মামলায় গ্রেফতার করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)। তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত।
মঙ্গলবার (২৪ মার্চ) ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আমিনুল ইসলাম জুনাঈদ রিমান্ডের এ আদেশ দেন।
বিকেলে তাকে আদালতে হাজির করে ৫ দিনের রিমান্ড আবেদন করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) উপপরিদর্শক রায়হানুর রহমান।
জনাকীর্ন আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে মহানগর পিপি ওমর ফারুক ফারুকী রিমান্ড আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন। আসামিপক্ষে আইনজীবী রিমান্ড বাতিলসহ জামিন আবেদন করেন। শুনানি শেষে বিচারক তার ৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
এর আগে, সোমবার রাত দুইটার দিকে রাজধানীর বারিধারা ডিওএইচএস এলাকার ২ নম্বর লেনের ১৫৩ নম্বর বাসা থেকে লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে গ্রেফতার করা হয়।
জিজ্ঞাসাবাদের জন্য এই মামলায় তাঁর পাঁচ দিনের রিমান্ড চাওয়া হবে।
মঙ্গলবার দুপুরে এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে এসব কথা জানান ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) প্রধান মো. শফিকুল ইসলাম।
রাজধানীর মিন্টো রোডে ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে অনুষ্ঠিত এই ব্রিফ্রিংয়ে ডিবির প্রধান বলেন, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে পল্টন থানায় দায়ের করা মানব পাচার মামলায় লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। আদালতে পাঠিয়ে তাঁর পাঁচ দিনের রিমান্ড চাইবে পুলিশ।
তিনি বলেন, মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর বিরুদ্ধে রাজধানীর পল্টন, বনানী, কোতোয়ালি, মিরপুর ও হাতিরঝিল থানায় হত্যা, হত্যাচেষ্টা, মানব পাচারসহ বিভিন্ন গুরুতর অপরাধের অভিযোগে মামলা আছে।
এর আগে গত বছরের ২৮ আগস্ট ১০০ কোটি টাকা পাচারের অভিযোগে ফেনী-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীসহ ৩৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা করে অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।
সিআইডি’র তৎকালীন বিশেষ পুলিশ সুপার (মিডিয়া) জসিম উদ্দিন খান বলেছিলেন, ‘সিআইডি বনানী থানায় ১০০ কোটি ৭৮ লাখ টাকা পাচারের অভিযোগে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে মামলাটি দায়ের করেছে।’
মামলার বিবরণী অনুসারে, জনশক্তি রপ্তানি কোম্পানি ফাইভ এম ইন্টারন্যাশনাল -এর মাধ্যমে মালয়েশিয়ায় লোকজন পাঠাতেন মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী। আসামিরা যোগসাজশে জালিয়াতির মাধ্যমে ২০১৬ সালের ১৮ আগস্ট থেকে ২০২৪ সালের ৩০ মে পর্যন্ত ৯ হাজার ৩৭২ জন কর্মীকে মালয়েশিয়ায় পাঠিয়েছেন। এই সিন্ডিকেটের অন্যতম সদস্য মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী।
এই সময়ে, সরকার নির্ধারিত ৭৮ হাজার ৯৯০ টাকা ফি ছাড়াও জন প্রতি অতিরিক্ত দেড় লাখ টাকা করে আদায় করা হয়েছিল। এছাড়া পাসপোর্ট, কোভিড-১৯ পরীক্ষা, চিকিৎসা ও পোশাক বাবদ অতিরিক্ত ৩৬ হাজার ৫০০ টাকা করে আদায়ের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
মামলায় ফাইভ এম ইন্টারন্যাশনালের পরিচালনা পর্ষদ ও সিন্ডিকেটের সদস্যদেরও আসামি করা হয়েছে।
সিআইডি ইতোমধ্যেই মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী ও তার সিন্ডিকেট সদস্যদের ৫ কোটি ৯১ লাখ টাকার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ করেছে।
মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী ২০০৭ সালে সেনাবাহিনীর নবম ডিভিশনের জিওসির দায়িত্বে ছিলেন। তিনি বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও সার্বভৌমত্ব ধ্বংস করা এক-এগারোর পটপরিবর্তনে অন্যতম খলনায়কের ভূমিকায় ছিলেন। তখন তিনি গুরুতর অপরাধ দমনসংক্রান্ত জাতীয় সমন্বয় কমিটির সমন্বয়ক হন। পদোন্নতি পেয়ে লেফটেন্যান্ট জেনারেল হন। এই কমিটির অধীনই তখন দুর্নীতিবিরোধী অভিযান পরিচালিত হয়। এই অভিযানের নাম করে মাসুদ নিজেই দুর্নীতির সাথে জড়িয়ে পরেন।
২০০৮ সালের ২ জুন তাকে সশস্ত্র বাহিনীর প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার থেকে ডিফেন্স সার্ভিসেস কম্যান্ড অ্যান্ড স্টাফ কলেজের কমান্ড্যান্ট পদে ও ৮ জুন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বদলি করা হয়। এরপর একই বছর ২ সেপ্টেম্বর তাকে অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশ হাইকমিশনের কমিশনার হিসেবে নিয়োগ করা হয়। ২০০৮ সালের ৪ নভেম্বর তিনি কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ২০১১ সালের ২৯ জুন তার চাকুরীর মেয়াদ শেষ হলেও পরবর্তীতে তার মেয়াদ বাড়ানো হয় এবং ২০১৪ সাল পর্যন্ত তিনি অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশের হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর অবসর গ্রহণ করেন।
সেনাবাহিনীর চাকরিতে যোগদানের পূর্বে তিনি বিতর্কিত জাতীয় রক্ষীবাহিনীর সদস্য ছিলেন। ১৯৭৪ সালে তিনি চট্টগ্রামে সরকারী তত্বাবধানে ন্যায্যমূল্যের দোকান বা কসকরের ট্যালী ক্লার্ক ছিলেন। সেই বছরের দুর্ভিক্ষের সময় তিনি ত্রান হিসাবে আসা ২ ট্রাক নারিকেল তেল চোরাকারবারীদের কাছে উচ্চমূল্যে বিক্রি করে দেন, যা ময়মনসিংহে খালাস হয়। এ ঘটনায় চট্টগ্রাম থেকে ময়মনসিংহ পর্যন্ত বিভিন্ন থানায় মাসুদসহ অন্যান্যদের বিরুদ্ধে মামলা হয়। মামলা হতে বাঁচার জন্যই রক্ষী বাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন তিনি। পঁচাত্তরের পটপরিবর্তনের পরে রক্ষীবাহিনী বিলুপ্ত করে এ বাহিনীর সদস্যদের সেনাবাহিনীর বিভিন্ন বিগ্রেডে অন্তর্ভূক্ত করা হয়। ষষ্ঠ জেআরবি হতে মাসুদের অন্তর্ভুক্তি হয় সেনাবাহিনীতে।
মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী জাতীয় পার্টির (জাপা) মনোনয়নে দুই দফায় (২০১৮ ও ২০২৪) ফেনী-৩ আসনের (সোনাগাজী-দাগনভূঞা) সংসদ সদস্য ছিলেন।
২০১৮ সালে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ফেনী-৩ আসনে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী প্রথমে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চেয়ে ফরম কিনে জমা দিয়েছিলেন। পরে তিনি জাতীয় পার্টিতে যোগ দেন। দলটির নীতিনির্ধারণী পর্ষদ সভাপতিমণ্ডলীর সদস্যপদ পান। জাপার মনোনয়নে নির্বাচন করেন। কথিত আছে, ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার পরামর্শে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে জাপার চেয়ারম্যান পদে নিয়োগের চাপ দেওয়া হয়। এইম এম এরশাদ ও জিএম কাদেরের শক্ত অবস্থানের কারণে সেটি ব্যর্থ হয়।
উল্লেখ্য, বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার ছোট ভাই মেজর (অব.) সাঈদ এস্কান্দার মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর বোন নাসরীন সাঈদ মাসুদের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন তিনি।
