আদালতে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর গায়ে ময়লা পানি নিক্ষেপ

■ নাগরিক প্রতিবেদন ■

রিমান্ড শুনানি শেষে হাজতখানায় নেওয়ার পথে মানবপাচার মামলায় গ্রেফতার এক-এগারোর সময়ের কুখ্যাত সাবেক সেনা কর্মকর্তা মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর ওপর ময়লা পানি নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে।

মঙ্গলবার (২৪ মার্চ) বিকেলে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালত প্রাঙ্গণে এ ঘটনা ঘটে। এর আগে, আদালত মানবপাচার আইনের একটি মামলায় তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

এদিন বিকেলে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে কড়া নিরাপত্তায় আদালতে তোলা হয়। পরে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আসামির ৫ দিনের রিমান্ড আবেদন করেন ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। শুনানি শেষে আদালত তা মঞ্জুর করেন।

রাষ্ট্রপক্ষে ঢাকা মহানগরের পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী রিমান্ডের পক্ষে বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, ‘তথাকথিত এক-এগারো সরকারের সময় এই আসামিসহ (জেনারেল মাসুদ) অন্যরা মিলে ট্রুথ কমিশন গঠন করে ব্যবসায়ীদের ধরে এনে নির্যাতন করতো। তাদের ক্ষমা করে দেওয়ার কথা বলে তাদের কাছ থেকে টাকা আদায় করতো। বিশেষ করে মাইনাস টু ফর্মুলার নামে জিয়া পরিবারকেই শেষ করে দিতে চেয়েছিল। কিন্তু ভাগ্যের কি পরিহাস। যাকে (তারেক জিয়া) টর্চার করে হত্যা করতে চেয়েছিল, তিনিই এখন দেশের প্রধানমন্ত্রী।’ 

অন্যদিকে মাসুদ উদ্দিনের পক্ষে তার আইনজীবীরা রিমান্ডের বিরোধিতা করে জামিন চান। শুনানি শেষে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আমিনুল ইসলাম জুনাইদ রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

সোমবার (২৩ মার্চ) রাতে অভিযান চালিয়ে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে হেফাজতে নেয় ডিবি পুলিশের একটি দল। পরে পল্টন থানায় হওয়া মানবপাচার মামলায় মঙ্গলবার তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়।

ডিবি প্রধান শফিকুল ইসলাম গণমাধ্যমকে জানান, মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর বিরুদ্ধে মানবপাচার ছাড়াও প্রতারণা, চাঁদাবাজি, হত্যাসহ মোট পাঁচটি মামলা রয়েছে। এছাড়া ফেনীতে করা বৈষম্যবিরোধী একটি মামলায় তার বিরুদ্ধে আগে থেকেই গ্রেফতারি পরোয়ানা রয়েছে।

সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে ডিবিপ্রধান বলেন, মাসুদ উদ্দিনের বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলো অনেক আগের। এমন নয় যে, এগুলো পুলিশ বাদী হয়ে করেছে। এগুলোর বেশির ভাগের বাদী সাধারণ মানুষ। আমরা কোনো ব্যক্তি বা কারও অবস্থান দেখি না; বরং তার কৃতকর্ম বা অপরাধের বিষয়টিই গুরুত্বপূর্ণ।

পুলিশ অর্থ ও মানব পাচারের মামলার কথা বললেও রাজনৈতিক কারণে কিংবা এক-এগারোর সময়ে ভূমিকার জন্য মাসুদ উদ্দিনকে গ্রেফতার করা হয়েছে কিনা– এমন প্রশ্নে শফিকুল ইসলাম বলেন, যেসব মামলা আছে সেগুলোই তারা তদন্ত করছেন এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখা ও সবার ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করাটাই তাদের লক্ষ্য।

মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী আটক হওয়ার পর থেকেই ক্ষমতাসীন বিএনপির নেতাকর্মী ও সমর্থক থেকে শুরু করে অনেকে ‘এক-এগারো’ ইস্যু সামনে এনে সামাজিক মাধ্যমে নানা মন্তব্য করছেন। তাদের অনেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ওই সময়ে আটক ও নির্যাতনের ঘটনায় মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকেই দায়ী করছেন।

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু মঙ্গলবার ফেসবুকে লিখেছেন, ‘প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ধন্যবাদ ১/১১-তে গণতন্ত্র হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার শুরু করার জন্য।’

এর আগে গত বছরের ২৮ আগস্ট ১০০ কোটি টাকা পাচারের অভিযোগে ফেনী-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীসহ ৩৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা করে অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।

সিআইডি’র তৎকালীন বিশেষ পুলিশ সুপার (মিডিয়া) জসিম উদ্দিন খান বলেছিলেন, ‘সিআইডি বনানী থানায় ১০০ কোটি ৭৮ লাখ টাকা পাচারের অভিযোগে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে মামলাটি দায়ের করেছে।’

মামলার বিবরণী অনুসারে, জনশক্তি রপ্তানি কোম্পানি ফাইভ এম ইন্টারন্যাশনাল -এর মাধ্যমে মালয়েশিয়ায় লোকজন পাঠাতেন মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী। আসামিরা যোগসাজশে জালিয়াতির মাধ্যমে ২০১৬ সালের ১৮ আগস্ট থেকে ২০২৪ সালের ৩০ মে পর্যন্ত ৯ হাজার ৩৭২ জন কর্মীকে মালয়েশিয়ায় পাঠিয়েছেন। এই সিন্ডিকেটের অন্যতম সদস্য মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী।

এই সময়ে, সরকার নির্ধারিত ৭৮ হাজার ৯৯০ টাকা ফি ছাড়াও জন প্রতি অতিরিক্ত দেড় লাখ টাকা করে আদায় করা হয়েছিল। এছাড়া পাসপোর্ট, কোভিড-১৯ পরীক্ষা, চিকিৎসা ও পোশাক বাবদ অতিরিক্ত ৩৬ হাজার ৫০০ টাকা করে আদায়ের প্রমাণ পাওয়া গেছে।

মামলায় ফাইভ এম ইন্টারন্যাশনালের পরিচালনা পর্ষদ ও সিন্ডিকেটের সদস্যদেরও আসামি করা হয়েছে।

সিআইডি ইতোমধ্যেই মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী ও তার সিন্ডিকেট সদস্যদের ৫ কোটি ৯১ লাখ টাকার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ করেছে।

মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী ২০০৭ সালে সেনাবাহিনীর নবম ডিভিশনের জিওসির দায়িত্বে ছিলেন। তিনি বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও সার্বভৌমত্ব ধ্বংস করা এক-এগারোর পটপরিবর্তনে অন্যতম খলনায়কের ভূমিকায় ছিলেন। তখন তিনি গুরুতর অপরাধ দমনসংক্রান্ত জাতীয় সমন্বয় কমিটির সমন্বয়ক হন। পদোন্নতি পেয়ে লেফটেন্যান্ট জেনারেল হন। এই কমিটির অধীনই তখন দুর্নীতিবিরোধী অভিযান পরিচালিত হয়। এই অভিযানের নাম করে মাসুদ নিজেই দুর্নীতির সাথে জড়িয়ে পরেন।

২০০৮ সালের ২ জুন তাকে সশস্ত্র বাহিনীর প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার থেকে ডিফেন্স সার্ভিসেস কম্যান্ড অ্যান্ড স্টাফ কলেজের কমান্ড্যান্ট পদে ও ৮ জুন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বদলি করা হয়। এরপর একই বছর ২ সেপ্টেম্বর তাকে অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশ হাইকমিশনের কমিশনার হিসেবে নিয়োগ করা হয়। ২০০৮ সালের ৪ নভেম্বর তিনি কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ২০১১ সালের ২৯ জুন তার চাকুরীর মেয়াদ শেষ হলেও পরবর্তীতে তার মেয়াদ বাড়ানো হয় এবং ২০১৪ সাল পর্যন্ত তিনি অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশের হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর অবসর গ্রহণ করেন।

সেনাবাহিনীর চাকরিতে যোগদানের পূর্বে তিনি বিতর্কিত জাতীয় রক্ষীবাহিনীর সদস্য ছিলেন। ১৯৭৪ সালে তিনি চট্টগ্রামে সরকারী তত্বাবধানে ন্যায্যমূল্যের দোকান বা কসকরের ট্যালী ক্লার্ক ছিলেন। সেই বছরের দুর্ভিক্ষের সময় তিনি ত্রান হিসাবে আসা ২ ট্রাক নারিকেল তেল চোরাকারবারীদের কাছে উচ্চমূল্যে বিক্রি করে দেন, যা ময়মনসিংহে খালাস হয়। এ ঘটনায় চট্টগ্রাম থেকে ময়মনসিংহ পর্যন্ত বিভিন্ন থানায় মাসুদসহ অন্যান্যদের বিরুদ্ধে মামলা হয়। মামলা হতে বাঁচার জন্যই রক্ষী বাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন তিনি। পঁচাত্তরের পটপরিবর্তনের পরে রক্ষীবাহিনী বিলুপ্ত করে এ বাহিনীর সদস্যদের সেনাবাহিনীর বিভিন্ন বিগ্রেডে অন্তর্ভূক্ত করা হয়। ষষ্ঠ জেআরবি হতে মাসুদের অন্তর্ভুক্তি হয় সেনাবাহিনীতে।

মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী জাতীয় পার্টির (জাপা) মনোনয়নে দুই দফায় (২০১৮ ও ২০২৪) ফেনী-৩ আসনের (সোনাগাজী-দাগনভূঞা) সংসদ সদস্য ছিলেন।

২০১৮ সালে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ফেনী-৩ আসনে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী প্রথমে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চেয়ে ফরম কিনে জমা দিয়েছিলেন। পরে তিনি জাতীয় পার্টিতে যোগ দেন। দলটির নীতিনির্ধারণী পর্ষদ সভাপতিমণ্ডলীর সদস্যপদ পান। জাপার মনোনয়নে নির্বাচন করেন। কথিত আছে, ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার পরামর্শে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে জাপার চেয়ারম্যান পদে নিয়োগের চাপ দেওয়া হয়। এইম এম এরশাদ ও জিএম কাদেরের শক্ত অবস্থানের কারণে সেটি ব্যর্থ হয়।

উল্লেখ্য, বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার ছোট ভাই মেজর (অব.) সাঈদ এস্কান্দার মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর বোন নাসরীন সাঈদ মাসুদের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন তিনি।

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *