■ নাগরিক প্রতিবেদন ■
ঈদুল ফিতরের ছুটিকে কেন্দ্র করে গত সাত দিনে সড়ক দুর্ঘটনায় ২০৪ জনের মৃত্যু হয়েছেন। বেসরকারি সংস্থাগুলো সাধারণত ঈদের আগে সাত দিন, পরের সাত দিন এবং ঈদের দিনসহ মোট ১৫ দিনকে ঈদযাত্রা হিসেবে গণ্য করে। অতীতে দেখা গেছে, এই সময়ের মধ্যে নিহতের সংখ্যা ৩০০ থেকে ৪০০ জন থাকে।
সরকারি হিসাবে সারাদেশে আহতের সংখ্যা ২১৭ জন বলা হলেও, পঙ্গু হাসপাতাল নামে পরিচিত রাজধানীর জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানে ঈদের আগের রাত ১২টা ১ মিনিট থেকে পরের দিন বিকেল ৫টা পর্যন্ত ১৫১ জন আহত রোগী আসেন। দেশের অন্যান্য হাসপাতালেও ছিল একই চিত্র। অধিকাংশ আহত রোগী ছিলেন মোটরসাইকেল, ব্যাটারির রিকশা কিংবা ইজিবাইক দুর্ঘটনায় আহত।
যাত্রী কল্যাণ সমিতির হিসাবে গত বছরের ঈদুল ফিতরের আগে-পরে ১৫ দিনে সড়ক-মহাসড়কে ৩১৫টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৩২২ জন নিহত হন। আহত হন ৮২৬ জন। সংগঠনটির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ঈদুল ফিতরের ১৫ দিনে ৩৭২ দুর্ঘটনায় ৪১৬ জন নিহত হয়েছিলেন। যা ছিল এক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ।
এবার ঈদের ছুটি শুরু হয় ১৭ মার্চ। সাত দিনের ছুটি চলে ২৩ মার্চ পর্যন্ত। গতকাল মঙ্গলবার ২৪ মার্চ অফিস-আদালত খুলেছে। তবে অধিকাংশ বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, কলকারখানায় এখনও চলছে ঈদের ছুটি। আগামী শনিবার থেকে খুলবে। এ হিসেবে ঈদযাত্রা এখনও চলছে।
সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) জানিয়েছে, ঈদের সাত দিনের (১৭-২৩ মার্চ) ছুটিতে সারাদেশে ৯২টি সড়ক দুর্ঘটনায় ১০০ জন নিহত এবং ২১৭ জন আহত হয়েছেন। তবে বেসরকারি সংস্থা রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের প্রাথমিক হিসাবে, একই সময়ে ২৬৮টি দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন অন্তত ২০৪ জন এবং আহত হয়েছেন ছয় শতাধিক মানুষ।
সরকারি তথ্যে অনেক দুর্ঘটনা অন্তর্ভুক্ত হয়নি। উদাহরণ হিসেবে কুমিল্লার পদুয়ার বাজার রেলক্রসিংয়ে সংঘটিত একটি ভয়াবহ বাস দুর্ঘটনায় ১২ জন নিহত হওয়ার ঘটনাও সরকারি হিসাবে নেই। বিআরটিএর ২১ মার্চ ২৪ ঘণ্টার তালিকায় কুমিল্লার কোনো নামই নেই।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ১৭ মার্চ ১২টি দুর্ঘটনায় ১৫ জন নিহত ও ১৫ জন আহত হন। পরদিন ১৮ মার্চ ১৮টি দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান ১৩ জন এবং আহত হন ৬২ জন। ১৯ মার্চ ১১টি দুর্ঘটনায় নিহত হন ৮ জন, আহত ৭ জন। ২০ মার্চ ছয়টি দুর্ঘটনায় ৮ জনের মৃত্যু ও ৩৬ জন আহত হওয়ার ঘটনা ঘটে। ২১ মার্চ ১৭টি দুর্ঘটনায় ১৫ জন নিহত এবং ২৫ জন আহত হন। ২২ মার্চ ১৯টি দুর্ঘটনায় সর্বোচ্চ ৩২ জন নিহত ও ৬০ জন আহত হন। আর ২৩ মার্চ ৯টি দুর্ঘটনায় ৯ জন নিহত এবং ১২ জন আহত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত যে তথ্য পাওয়া গেছে তা প্রাথমিক। ছুটি শেষে পূর্ণাঙ্গ তথ্য সংগ্রহ করা হলে প্রাণহানির সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। তার আশঙ্কা, এবারের ঈদযাত্রায় দুর্ঘটনায় মৃত্যুর নতুন রেকর্ড হতে পারে।
অন্যদিকে, যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, ঈদের পর কর্মস্থলে ফেরার সময় দুর্ঘটনা বাড়ার প্রবণতা থাকে। কারণ, এ সময় সড়কে নজরদারি ও আইন প্রয়োগ তুলনামূলকভাবে কমে যায়।
গাড়ির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ব্যাটারির রিকশা-অটোরিকশা চলাচলের কারণে দুর্ঘটনা বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বহু বছর ধরে এ মতামত দিয়ে রিকশা নিয়ন্ত্রণের পরামর্শ দিচ্ছেন। কিন্তু ৫ আগস্টের পর রিকশা চলাচল আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।
ব্যাটারিচালিত এই যানবাহনের প্রকৃত সংখ্যা কত, তা এখন আর কেউ জানে না। ধারণা করা হয়, অন্তত ১৫ লাখ ব্যাটারি রিকশা চলে সারাদেশে। কারও কারও দাবি, সংখ্যাটি ৪০ লাখ। অন্তর্বর্তী সরকার সিটি করপোরেশন এবং পৌরসভা আইনে সংশোধন করে ব্যাটারিচালিত যানবাহনকে নিবন্ধনের মাধ্যমে বৈধতার সুযোগ দিয়েছে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. হাদিউজ্জামান বলেন, দ্রুতগতির যান চলাচলের উপযোগী সড়ক-মহাসড়কে একই সঙ্গে যতদিন ব্যাটারির রিকশা, ইজিবাইক, অটোরিকশা চলবে, ততদিন দুর্ঘটনা ঠেকানো যাবে না। এসব যানবাহনে সামান্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেই। বাস, ট্রাকের মতো বড় যানবাহন ছাড়াও মাইক্রোবাস, পিকআপের মতো মাঝারি যানবাহনের সঙ্গে সাধারণ সংঘর্ষেও ভয়াবহ প্রাণহানি হচ্ছে।
ঈদযাত্রায় মোটরসাইকেল, ইজিবাইক, ব্যাটারি রিকশা-সংশ্লিষ্ট দুর্ঘটনায় অধিকাংশ প্রাণহানি হয়েছে। মোটরসাইকেল আরোহী ও চালকদের অধিকাংশ কিশোর। ড্রাইভিং লাইসেন্স ও হেলমেট ছাড়াই দাপিয়ে বেড়ায় তারা।
