■ নাগরিক প্রতিবেদন ■
ভারত-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ পাইপলাইনের মাধ্যমে দেশে আবারও ডিজেল আমদানি শুরু হয়েছে। উত্তরাঞ্চলে জ্বালানি তেলের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে চলতি বছরে চতুর্থ দফায় এ কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়েছে।
শনিবার (২৮ মার্চ) সন্ধ্যা থেকে ভারতের আসামের নুমালিগড় রিফাইনারি থেকে দিনাজপুরের পার্বতীপুর রেলহেড অয়েল ডিপোর উদ্দেশ্যে ডিজেল পাম্পিং শুরু হয়।
মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেডের ম্যানেজার (অপারেশনস) কাজী মো. রবিউল আলম জানিয়েছেন, এবারের চালানে ৭ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল আসবে। পাম্পিং শুরু হওয়ার পর পাইপলাইনের মাধ্যমে এই তেল গন্তব্যে পৌঁছাতে ৪৮ থেকে ৭২ ঘণ্টা সময় লাগে। আশা করা হচ্ছে, আগামী ৩১ মার্চের মধ্যে পুরো ৭ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল পার্বতীপুর রিসিপ্ট টার্মিনালে জমা হবে।
পার্বতীপুর রেলহেড অয়েল ডিপোর ইনচার্জ আহসান হাবিব জানান, এর আগে গত শুক্রবার ৫ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল আসার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। এ নিয়ে চলতি বছরে চার দফায় মোট ২২ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল এই পাইপলাইনের মাধ্যমে দেশে এলো। ভারত থেকে আসা এই জ্বালানি তেল ডিপোর পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা— এই তিন রাষ্ট্রীয় তেল বিপণন কোম্পানির মাধ্যমে উত্তরাঞ্চলে সরবরাহ করা হচ্ছে।
দুই দেশের চুক্তি অনুযায়ী, আগামী ১৫ বছর এই পাইপলাইনের মাধ্যমে ভারত থেকে ডিজেল সরবরাহ অব্যাহত থাকবে। বর্তমানে বছরে ২ থেকে ৩ লাখ টন আমদানির লক্ষ্য থাকলেও ভবিষ্যতে তা বাড়িয়ে ১০ লাখ মেট্রিক টন পর্যন্ত নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে জাহাজের সূচি অনিশ্চিত হয়ে পড়ায় জ্বালানি সরবরাহে চাপ তৈরি হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে সমুদ্রপথের পাশাপাশি পাইপলাইনে ডিজেল আমদানিতে জোর দিচ্ছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। ভারতের নুমালিগড় রিফাইনারি থেকে এবার ৭ হাজার টন ডিজেল আসা শুরু হয়েছে।
সব তেল এসে পৌঁছাতে আরও এক থেকে দুই দিন সময় লাগতে পারে। জানতে চাইলে বিপিসির চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমান বলেন, ‘পাইপলাইনে সরবরাহ অব্যাহত আছে। বিকল্প উৎস সচল রাখায় বর্তমানে জ্বালানিসংকটের আশঙ্কা নেই।’
বিপিসি সূত্র জানায়, দেশের কৃষি সেচ, সড়ক পরিবহন ও বিদ্যুৎ উৎপাদন—সব ক্ষেত্রেই ডিজেলের ওপর নির্ভরতা বেশি। ফলে সরবরাহে সামান্য বিঘ্ন বড় প্রভাব ফেলতে পারে। চলতি মাসে ১৭টি জাহাজে দেশে ডিজেল আসার কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত এসেছে ৯টি। একটি জাহাজ পথে রয়েছে। বাকি ৭টির সূচি এখনো অনিশ্চিত।
এ ঘাটতি সামাল দিতে পাইপলাইনের ওপর নির্ভরতা বাড়ানো হয়েছে। ইতিমধ্যে ভারত থেকে পাইপলাইনে এসেছে প্রায় ১৫ হাজার টন ডিজেল। এর আগে ২৫ মার্চ পাঁচ হাজার টন ডিজেল সরবরাহ শুরু হয়।
জ্বালানি–বিশ্লেষকেরা বলছেন, বৈশ্বিক অস্থিরতার সময় বিকল্প সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। তবে দীর্ঘ মেয়াদে সংরক্ষণ সক্ষমতা না বাড়ালে এই সুবিধা পুরোপুরি কাজে লাগানো সম্ভব হবে না। এদিকে মাঠপর্যায়ে ইতিমধ্যে কিছু এলাকায় ডিজেলের সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ দেখা যাচ্ছে। কৃষি মৌসুম সামনে রেখে সরবরাহে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।
বিপিসির তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট জ্বালানি চাহিদার প্রায় ৬৩ শতাংশই ডিজেল। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ডিজেলের চাহিদা ছিল প্রায় ৪৩ লাখ ৫০ হাজার টন। এর বড় অংশ সরাসরি আমদানির মাধ্যমে মেটানো হয়। আর বছরে সাত থেকে সাড়ে সাত লাখ টন পাওয়া যায় অপরিশোধিত তেল পরিশোধন করে।
উল্লেখ্য, ১৩১ দশমিক ৫৭ কিলোমিটার দীর্ঘ এই পাইপলাইন প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর ২০১৮ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর স্থাপন করা হয় এবং ২০২৩ সালের ১৮ মার্চ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এর মাধ্যমে ডিজেল আমদানি শুরু হয়। এর ফলে আগে যেখানে খুলনা ও চট্টগ্রাম থেকে রেলে তেল আনতে ৬–৭ দিন সময় লাগত, এখন তা অনেক কম সময়ে সম্ভব হচ্ছে।
