■ মুহাম্মদ শামীম ■
রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়, কলকাতার বাংলা সিনেমা ও নাট্যজগতের এক অনন্য নাম । তাঁর অভিনয়জীবন শুধু পর্দায় সীমাবদ্ধ নয়—থিয়েটারের মঞ্চ থেকে শুরু করে টেলিভিশন নাটক এবং চলচ্চিত্র-সব জায়গাতেই তিনি নিজের স্বতন্ত্রতা প্রতিষ্ঠা করেছেন। একজন অসাধারণ শিল্পী হিসেবে তিনি যে চরিত্রই পেয়েছেন, তাকে নিজের অন্তর্গত আবেগ দিয়ে জীবন্ত করে তুলেছেন।
রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায় চলচ্চিত্রজীবনের কথা বলতে গেলে প্রথমেই আসে ‘চিরদিনই তুমি যে আমার’ সিনেমার নাম। এই চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তিনি ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। এক তরুণ প্রেমিকের সরল আবেগ, সংগ্রাম ও ভালোবাসার গল্প তিনি এতটাই আন্তরিকভাবে ফুটিয়ে তুলেছিলেন যে, দর্শক সহজেই তাঁর সঙ্গে নিজেদের সংযোগ খুঁজে পায়। এই সিনেমা তাঁকে শুধু তারকা বানায়নি, বরং বাংলা বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রে একটি নতুন মুখ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
এরপর তিনি ধীরে ধীরে ভিন্নধর্মী সিনেমার দিকে ঝুঁকেন। ‘আসা যাওয়ার মাঝে’-তে তাঁর অভিনয় ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন মাত্রার। এই সিনেমায় প্রায় কোনো সংলাপ নেই, অথচ তাঁর চোখের ভাষা, শরীরী অভিব্যক্তি এবং নীরবতার মধ্যেই তিনি গভীর আবেগ প্রকাশ করেছেন। এটি প্রমাণ করে, একজন অভিনেতা হিসেবে তাঁর দক্ষতা কতটা বহুমাত্রিক।
চলচ্চিত্রের পাশাপাশি নাট্যাঙ্গনেও রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। থিয়েটার তাঁর অভিনয়ের ভিত্তি গড়ে দিয়েছে। মঞ্চে তিনি যে নিবেদন এবং জীবন্ততা নিয়ে অভিনয় করেন, তা দর্শকদের মুগ্ধ করে। থিয়েটারের প্রতি তাঁর ভালোবাসা তাঁকে সবসময় নতুন কিছু শেখার এবং নিজের সীমাবদ্ধতা ভাঙার অনুপ্রেরণা দিয়েছে। এই অভিজ্ঞতাই তাঁকে সিনেমাতেও আরও পরিণত অভিনেতা হিসেবে গড়ে তুলেছে।
টেলিভিশন নাটক ও সিরিজেও তিনি সমানভাবে সফল। বিশেষ করে গোয়েন্দা চরিত্রে তাঁর অভিনয় দর্শকদের কাছে বিশেষভাবে জনপ্রিয়। তাঁর অভিনয়ে এক ধরনের স্বাভাবিকতা আছে—যা কখনোই অতিরঞ্জিত মনে হয় না, বরং বাস্তব জীবনের মানুষের প্রতিচ্ছবি বলে মনে হয়। ফলে তিনি সহজেই দর্শকের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছেন।
ব্যক্তিগত জীবনের নানা উত্থান-পতন সত্ত্বেও রাহুল ব্যানার্জি কখনোই তাঁর শিল্পচর্চা থেকে বিচ্যুত হননি। বরং সেই অভিজ্ঞতাগুলোই তাঁর অভিনয়কে আরও গভীর করেছে। একজন শিল্পীর জীবনে যে সংগ্রাম থাকে, তা তাঁর কাজের মধ্যেই প্রতিফলিত হয়—এবং রাহুল তার উজ্জ্বল উদাহরণ।
সবশেষে বলা যায়, রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায় শুধু একজন অভিনেতা নন, তিনি একজন গল্পকার—যিনি তাঁর অভিনয়ের মাধ্যমে মানুষের জীবন, ভালোবাসা, কষ্ট ও স্বপ্নকে তুলে ধরেন। বাংলা চলচ্চিত্র ও নাট্যজগতে তাঁর অবদান স্মরণীয় হয়ে থাকবে, আর তাঁর কাজ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিল্পীদের জন্য প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।
এই মানুষটির তাঁর ছেলেকে লেখা একটি চিঠি একবার আনন্দবাজারে ছাপা হয়েছিল। সম্ভবত অনলাইন। পিতৃদিবসে ছেলেকে তিনি উত্তরাধিকার দিয়েছিলেন নদী, পাহাড়, অরণ্য আর বাংলাভাষার। সেদিনই মানুষটাকে আর পাঁচজন ‘স্টার’ এর থেকে আলাদা মনে হয়েছিল। তার লেখা চিঠির সেই সারাংশটুকু দিলাম।
‘আমি তোমাকে আমার ভাগের সব ক’টা নদী, পাহাড়, জঙ্গল উত্তরাধিকার সূত্রে দিয়ে যাচ্ছি। বইমেলার ধুলো, কলেজ স্ট্রিটের ফুটপাথগুলোকেও পৈতৃক সম্পত্তি ভাবতে পারো এর পর থেকে। আর হ্যাঁ, তোমাকে দিয়ে দিলাম আমার একটা প্রচণ্ড অহংকারের জিনিস। আমার ভাষা। বাংলা। হ্যাঁ, বাংলা ভাষা। আর শুধু সেই বাংলা ভাষা নয়, যেটা আমরা দক্ষিণ কলকাতায় বলি। বাংলা তার সমস্ত উপভাষা, ডায়ালেক্ট নিয়ে যে প্রবল ঐশ্বর্যের অধিকারী, সেই সব ঐশ্বর্য তোমাকে দিয়ে দিলাম। সবই দিয়ে দিলাম, যা যা আমার বলে আমি জানি। শুধু তোমার একটা প্রশ্নের উত্তর ছাড়া। তখন তুমি সদ্য মায়ের সঙ্গে আলাদা হয়েছ। প্রায় এক বছর পর তুমি আমাদের বেডরুমে ঢুকে এদিক ওদিক দেখে আমাকে প্রশ্ন করেছিলে, ‘আমি এই ঘরে থাকতাম না বাবা?’ আমি উত্তর দিয়েছিলাম – হ্যাঁ। তুমি প্রশ্ন করেছিলে – ‘তার পর কী হল? এখন আর থাকি না কেন?’ বিশ্বাস করো, সেই প্রশ্নের উত্তর সে দিনও ছিল না, আজও নেই। ক্ষমা করো।
বাবা’
অপলক চেয়ে থাকে নির্লিপ্ত দু’চোখ
মেঘের কান্না বৃষ্টি মুছে দেয় শোক!
বিদায় রাহুল দা
