জ্বালানি তেল ও গ্যাস পরিস্থিতি আরও কঠিন হবে এপ্রিলে

🖊️নাগরিক প্রতিবেদক 🖊️

এলএনজি, এলপিজি, গ্যাস অয়েল, বেস অয়েলসহ বিভিন্ন জ্বালানি নিয়ে বিকল্প দেশ থেকে মার্চের ৩১ দিনে ৩৮টি  জাহাজ এসেছে। তবে বুকিং থাকার পরও মার্চে এলএনজি ও এলপিজি নিয়ে ২৬ জাহাজের মধ্যে এসেছে মাত্র ১৫টি। এপ্রিলে যে বুকিং আছে, সেটিরও দুই-তৃতীয়াংশ নিশ্চিত হয়নি এখনও।  

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ আরও দীর্ঘায়িত হলে এই পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। আগাম প্রস্তুতি হিসেবে গত মঙ্গলবার স্পট ও জিটুজি পদ্ধতিতে দুই লাখ ৬০ হাজার টন জ্বালানি কেনার অনুমতি দিয়েছে ক্রয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি।

মার্চে ডিজেল ও ফার্নেস অয়েল নিয়ে ১৭টি জাহাজ আসার কথা ছিল বিপিসির। তবে পুরো মাসে এসেছে ১০টি জাহাজ; যেগুলোতে তেল ছিল মাত্র আড়াই লাখ টন। বুকিং থাকলেও আসেনি দেড় লাখ টন জ্বালানি তেলের বাকি ছয়টি জাহাজ। অভিন্ন চিত্র আছে এলএনজি নিয়েও। মার্চে ৯টি এলপিজি বোঝাই জাহাজ আসার কথা থাকলেও এসেছে পাঁচটি। বুকিং থাকলেও আসেনি প্রায় তিন লাখ টনের চারটি এলপিজির জাহাজ। একইভাবে সূচি নির্ধারিত থাকার পরও ক্রুড অয়েলের দুটি জাহাজের একটিও আসেনি। জ্বালানি তেল ও গ্যাসের এই সংকট দূর করতে বিকল্প দেশের দ্বারস্থ হয়েছে সরকার। ১২ দেশ থেকে সর্বশেষ মাসে দেশে জ্বালানি তেল ও গ্যাস এনেছে ৩৮টি জাহাজ। তবে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে বিকল্প দেশেরও দরজা আস্তে আস্তে বন্ধ হবে। তখন বেশি দামে স্পট মার্কেট থেকেও জ্বালানি কেনা কঠিন হবে।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের প্রভাব জ্বালানি তেল ও গ্যাসে পড়লেও বিকল্প ভাবনা আছে আমাদের। আশা করছি, এপ্রিল, মে মাসেও পরিস্থিতি সামাল দিতে পারব আমরা। তবে প্রয়োজনের চেয়ে অতিরিক্ত জ্বালানি কেনা, অবৈধ মজুতের প্রবণতা ও সীমান্তবর্তী এলাকা দিয়ে তেল পাচারের চেষ্টা বন্ধ করতে হবে। এ জন্য সামনে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। 

চট্টগ্রাম বন্দরের ‘ভেসেল অ্যারাইভাল লগ’ অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর মার্চ মাসের ৩১ দিনে ৩৮টি জাহাজের পণ্য খালাস করেছে তারা। এর মধ্যে এলএনজির আটটি, এলপিজি বোঝাই ৯টি, গ্যাস অয়েলের আটটি, এইচএসএফও বোঝাই চারটি, বেস অয়েলের দুটি, এমইজি বোঝাই একটি, ইথিলিনের একটি ও কনডেনসেটের জাহাজ ছিল একটি। এর মধ্যে কাতার, ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের জাহাজ ছিল ৯টি। মার্চে বেশির ভাগ জাহাজ এসেছে বিকল্প দেশ থেকে। সিঙ্গাপুর থেকে ৯টি, মালয়েশিয়া থেকে আটটি ও ভারত থেকে এসেছে পাঁচটি জাহাজ। এখন অস্ট্রেলিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও থাইল্যান্ড থেকে জ্বালানি আনছে কিছু জাহাজ। চলতি এপ্রিল মাসে এখন পর্যন্ত এসেছে তিনটি জাহাজ। গতকাল শুক্রবার ২৭ হাজার টন গ‍্যাস অয়েল নিয়ে একটি জাহাজ নোঙর করেছে বন্দরে। চলতি মাসে এলএনজি ও ইথিনিল নিয়ে এসেছে আরও দুটি জাহাজ।

এলএনজি আমদানির স্থানীয় প্রতিনিধি প্রতিষ্ঠান ইউনি গ্লোবাল বিজনেস লিমিটেডের সিনিয়র ডিজিএম মো. নুরুল আলম বলেন, প্রতি মাসে গড়ে ৯ থেকে ১০টি জাহাজ এলএনজি আমদানি করা হয় আমাদের মাধ্যমে। মার্চে এসেছে মাত্র পাঁচটি। আর এপ্রিলে জন্য এখন পর্যন্ত একটি এলএনজির জাহাজ এসেছে। এই জাহাজটির পণ্যও কেনা হয়েছে স্পট মার্কেট থেকে।’

বিপিসির মহাব্যবস্থাপক মুহাম্মদ মোরশেদ হোসাইন (বাণিজ্য ও অপারেশন) বলেন, চীনের ইউনিপেক ও মালয়েশিয়ার পেটকো ট্রেডিং বিপিসির বড় দুই সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান হলেও যুদ্ধের কারণে তাদের থেকে তেল যথাসময়ে পাইনি আমরা। গত ৩ মার্চ সৌদি আরবের রাস তানুরা টার্মিনাল থেকে এক লাখ টন অপরিশোধিত তেল আনার কথা থাকলেও জাহাজটি আটকে আছে হরমুজ প্রণালিতে। আবার আবুধাবি ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানি (অ্যাডনক) থেকে তেল আনার জন্য ভাড়া করা ‘এমটি ওমেরা গ্যালাক্সি’ নামে জাহাজটির চুক্তিও বাতিল হয়েছে। এ জন্য মার্চে অপরিশোধিত তেলের নতুন কোনো চালান দেশে আসেনি। হরমুজ প্রণালিতে বাধা পাওয়ায় বুকিং থাকার পরও মধ্যপ্রাচ্য থেকে গত মাসে আসেনি চার জাহাজ এলএনজি। ‘লিব্রেথা’ নামে একটি জাহাজ এলএনজি লোড করার পরও আসতে পারছে না চট্টগ্রামে। ‘ওয়াদি আল সেইল’ নামে আরেকটি জাহাজ এলএনজি লোড করার জন্য  হরমুজ প্রণালি পেরিয়ে যেতে পারছে না টার্মিনালে।

বিপিসির হিসাবে, দেশে বছরে ৬৫ থেকে ৬৮ লাখ টন জ্বালানি তেল আমদানি করা হয়। এর মধ্যে প্রায় ১৫ লাখ টন অপরিশোধিত তেল, যা মূলত সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে আসে। মোট চাহিদার ২০ শতাংশ অপরিশোধিত আকারে এনে দেশে পরিশোধন করা হয়, বাকি ৮০ শতাংশ পরিশোধিত অবস্থায় আমদানি করা হয়। আর প্রতি মাসে দেশে এলপিজি আনা হয় ছয় লাখ টনের বেশি। মার্চে এসেছে তিন লাখ টনের কম। যুদ্ধের কারণে এই সরবরাহ ব্যবস্থা এলোমেলো হয়ে গেছে।

চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, যুদ্ধের কারণে চাহিদামতো জ্বালানি আসছে না। যেটা আসছে, সেটাও ঠিকভাবে পাচ্ছেন না গ্রাহক। শৃঙ্খলা ফেরাতে এখন মাঠে নেমেছে বিজিবিও। কৃত্রিম সংকট ও পাচার রোধে ৯টি জেলার ১৯টি ডিপোতে অস্থায়ী বেস ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে।

ছুটির দিনেও ৭০০ মেগাওয়াট লোডশেডিং

শনিবার ছুটির দিনেও বিদ্যুতের চাহিদা সাড়ে ১৪ হাজার মেগাওয়াটে ওঠার সময় প্রায় ৭০০ মেগাওয়াট লোডশেডিং দেখা দেয়। আগের রাতে ঢাকায়ও বেশ কয়েকবার লোডশেডিংয়ের দেখা মেলে।

শনিবার সন্ধ্যা ৬টায় দেখা যায়, সারা দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ১৪ হাজার ৫০০ মেগাওয়াটে পৌঁছে গেছে। সেই সময় উৎপাদনও ১৪ হাজার মেগাওয়াট ছুঁয়েছে। এই সময় গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্র থেকে ৫ হাজার ১৪৬ মেগাওয়াট, তরল জ্বালানি থেকে ২২৬৪ মেগাওয়াট, কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র থেকে ৪ হাজার ৬৯০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়। চাহিদার বাকি বিদ্যুৎ আসে আদানি পাওয়ার ও ভারত থেকে আমদানি করা বিভিন্ন উৎস থেকে।

পেট্রোবাংলার অপারেশন বিভাগের পরিচালক রফিকুল ইসলাম জানান, গরমের মৌসুম শুরু হওয়ায় এপ্রিল মাসে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য গ্যাসের বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। মার্চে বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য দৈনিক ৮২০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস বরাদ্দ ছিল, এপ্রিলে সেই চাহিদা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯৩০ মিলিয়ন ঘনফুট।

জানা গেছে, গত মার্চ মাসের অধিকাংশ সময়জুড়ে দেশে কোনো লোডশেডিং ছিল না। ৩০ মার্চ থেকে দিনে সর্বোচ্চ ৩৫০ মেগাওয়াট লোডশেডিং দেখা দেয়। ২ এপ্রিল সেটা ৫০০ মেগাওয়াটের ধাপ অতিক্রম করে। এই সময় গ্রামের পাশাপাশি শহরাঞ্চলেও লোডশেডিং দেখা দেয়।

 ইরান যুদ্ধ পরিস্থিতি ও জ্বালানি তেলের সংকটের কারণে সরকার ইতিমধ্যে সাশ্রয়ী কর্মসূচি শুরু করেছে। চলতি বছর বিদ্যুতের দৈনিক সর্বোচ্চ ১৮ হাজার মেগাওয়াট চাহিদা হিসাব করে সেখান থেকে ৩ হাজার ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সাশ্রয় করার কথা ভাবছে সরকার। সে জন্য আগামী তিন মাস দেশব্যাপী সব ধরনের আলোকসজ্জা বন্ধ রাখা, সরকারি ও বেসরকারি অফিস, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত চালানো, সব অফিস ভবন, বিপণিবিতান, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে বন্ধ করা।

এ ছাড়া মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের গাড়ির জন্য জ্বালানি তেলের মাসিক বরাদ্দ ৩০ শতাংশ কমানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে।

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *