✒️ নাগরিক নিউজ ডেস্ক ✒️
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান রক্তক্ষয়ী সংঘাতের মাঝে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে দেওয়া ৪৮ ঘণ্টার একটি যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে ইরান। গত বুধবার একটি তৃতীয় দেশের মধ্যস্থতায় এই প্রস্তাবটি তেহরানের কাছে পাঠানো হয়েছিল।
সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, ইরান নিজেই যুদ্ধবিরতির জন্য আবেদন করছে। তবে তেহরান এই দাবিকে ‘ভিত্তিহীন’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে। ইরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তারা কোনো নতি স্বীকার করবে না। বরং যুক্তরাষ্ট্রের এই প্রস্তাবটিই প্রমাণ করে যে যুদ্ধের ময়দানে তারা সুবিধাজনক অবস্থানে নেই।
পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে অনুষ্ঠেয় একটি মধ্যস্থতা বৈঠক শুরু হওয়ার আগেই ভেস্তে গেছে। ইরান সাফ জানিয়ে দিয়েছে, আমেরিকানদের ‘অগ্রহণযোগ্য’ শর্তাবলি বহাল থাকা অবস্থায় তারা কোনো মার্কিন কর্মকর্তার সঙ্গে বৈঠকে বসবে না। তেহরানের প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে— মধ্যপ্রাচ্যের সমস্ত সামরিক ঘাঁটি থেকে মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহার; এক মাসের যুদ্ধে ধ্বংস হওয়া স্কুল, হাসপাতাল এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর জন্য উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ প্রদান।
তুরস্ক, মিসর এবং কাতার দীর্ঘ সময় ধরে মধ্যস্থতার চেষ্টা চালিয়ে এলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে নতুন জটিলতা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে কাতার এই মুহূর্তে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করতে অনীহা প্রকাশ করছে। মার্কিন ও অন্যান্য আঞ্চলিক দেশগুলো কাতারকে চাপ দিলেও তারা এখন পর্যন্ত কোনো ইতিবাচক সাড়া দেয়নি।
এক মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা এই যুদ্ধে মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনী ইরানের সক্ষমতা ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়ার দাবি করলেও বাস্তবতা ভিন্ন। গোয়েন্দা মূল্যায়নে দেখা গেছে, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র লাঞ্চার এবং কামিকাজে ড্রোনের প্রায় অর্ধেকই এখনো অক্ষত এবং ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত।
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরান একটি দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে। যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান এবং অনড় অবস্থান থেকে এটি স্পষ্ট যে, ইরান বর্তমানে আলোচনার চেয়ে মাঠের লড়াইকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। ট্রাম্প প্রশাসনের ‘সম্পূর্ণ ধ্বংস’ করার হুমকির মুখেও ইরানের এই অবস্থান ওয়াশিংটনের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিমান-ড্রোন-ক্ষেপণাস্ত্র শিকারে ইরানের নয়া কৌশল
ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) গতকাল শুক্রবার রাতে এক বিশেষ বিবৃতিতে দাবি করেছে, ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ইউনিটগুলো গত ২৪ ঘণ্টায় মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনীর একটি অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান এবং পাঁচটি ড্রোন ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করেছে। আইআরজিসি এই দিনটিকে শত্রুপক্ষের আকাশশক্তির জন্য একটি ‘অন্ধকার দিন’ হিসেবে অভিহিত করে নিজেদের আকাশসীমায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দিয়েছে।
আইআরজিসির অ্যারোস্পেস ফোর্সের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার ইরানের বিভিন্ন অঞ্চলে সমন্বিত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে এই অভিযানগুলো পরিচালিত হয়। ধ্বংস করা লক্ষ্যবস্তুগুলোর মধ্যে রয়েছে:
এমকিউ-৯, ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র, হার্মিস ড্রোন,
দুটি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র: খোমেন ও জানজান প্রদেশের আকাশে এগুলোকে ইন্টারসেপ্ট বা বাধা দিয়ে ধ্বংস করা হয়।
দুইটি এমকিউ-৯ অ্যাটাক ড্রোন: অত্যন্ত শক্তিশালী ও উন্নত এই ড্রোন দুটিকে ইসফাহানের আকাশে ধ্বংস করা হয়েছে।
একটি হার্মিস ড্রোন: ইসরায়েলি প্রযুক্তির এই ড্রোনটি বুশেহর প্রদেশের আকাশে ভূপাতিত করা হয়।
অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান: মধ্য ইরানে একটি অজ্ঞাত কিন্তু ‘অ্যাডভান্সড’ বা আধুনিক প্রযুক্তির যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করেছে আইআরজিসির ইউনিটগুলো।
আইআরজিসির বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ইরানের নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি সমন্বিত আকাশ প্রতিরক্ষা নেটওয়ার্কের অধীনে এই নিখুঁত অপারেশনগুলো চালানো হয়েছে। তারা দাবি করেছে, প্রতিনিয়ত উদ্ভাবনী রণকৌশল এবং কঠোর পর্যবেক্ষণের ফলে ইরানের আকাশসীমা এখন যেকোনো শত্রু বিমানের জন্য ‘মৃত্যুকূপ’ বা চরম অনিরাপদ হয়ে উঠেছে। মার্কিন ও ইসরায়েলি আগ্রাসন রুখে দিতে তারা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি দক্ষ।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলী খামেনি এবং বেশ কয়েকজন শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাকে হত্যার পর থেকে চলমান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে এই সাফল্যকে বড় অর্জন হিসেবে দেখছে আইআরজিসি। বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে, বেসামরিক অবকাঠামো ও সামরিক স্থাপনায় মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার জবাবে ইরান তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ও কামিকাজে ড্রোনের বহর ব্যবহার করে দখলকৃত অঞ্চল এবং আঞ্চলিক মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে প্রতিশোধমূলক হামলা অব্যাহত রেখেছে।
এদিকে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর দেওয়া তথ্যের সঙ্গে আইআরজিসি-র এই দাবি অনেকটা মিলে যাচ্ছে। গোয়েন্দা রিপোর্ট অনুযায়ী, যুদ্ধের এক মাস পার হলেও ইরানের অর্ধেক ক্ষেপণাস্ত্র লাঞ্চার ও ড্রোন এখনো অক্ষত রয়েছে। আইআরজিসি-র এই শক্তিশালী অবস্থান প্রমাণ করে যে, তারা কোনো স্বল্পমেয়াদি সংঘাত নয়, বরং একটি দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত এবং তাদের আকাশসীমা রক্ষায় তারা কোনো আপস করবে না।
অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান রুখতে ‘অ্যাম্বুশ’ রণকৌশল ইরানের
মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান সামরিক উত্তেজনার মধ্যে ইরান দাবি করেছে, তারা এ পর্যন্ত শত্রুপক্ষের ১৬০টিরও বেশি ড্রোন এবং বেশ কিছু অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান সফলভাবে ধ্বংস করেছে। ইরানের ন্যাশনাল এয়ার ডিফেন্সের জয়েন্ট হেডকোয়ার্টার্স জানিয়েছে, দেশটির সামরিক বাহিনী এখন যেকোনো উচ্চ প্রযুক্তির ড্রোন এবং পঞ্চম প্রজন্মের স্টেলথ ফাইটার জেট মোকাবিলায় সম্পূর্ণ স্বয়ংসম্পূর্ণ।
ইরানের এয়ার ডিফেন্সের কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলিরেজা এলহামি এক বিশেষ বিবৃতিতে জানান, ইরানি সৈন্যরা ‘আধুনিক দেশীয় পদ্ধতি ও সরঞ্জাম’ ব্যবহার করে শত্রু বাহিনীকে আকাশপথে অতর্কিত আক্রমণ বা ‘অ্যাম্বুশ’ করার জন্য প্রস্তুত। তিনি বলেন, ‘আমাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এখন এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যা পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান এবং উন্নত আনম্যান্ড এরিয়াল সিস্টেম (ইউএএস) বা ড্রোনকে অনায়াসেই শিকার করতে পারে।’
ইরানি সংবাদ সংস্থা ইরনা-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, জেনারেল এলহামি নিশ্চিত করেছেন, তাদের বাহিনী ইতিমধ্যেই ‘হার্মিস’ এবং ‘লুকাস’-এর মতো বিশ্বসেরা প্রযুক্তির ড্রোনসহ কয়েক ডজন ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করেছে। তিনি দাবি করেন, এই সাফল্য মূলত ইরানের নিজস্ব প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার উদ্ভাবন ও নতুন রণকৌশলের ফল, যা বর্তমানে শত্রুপক্ষকে চরম বিভ্রান্তির মধ্যে ফেলেছে।
এদিকে, ইরানে ভূপাতিত মার্কিন এফ-১৫ যুদ্ধবিমানের নিখোঁজ ক্রু সদস্যকে খুঁজে বের করতে এক ‘ভয়ঙ্কর ও বিপজ্জনক’ উদ্ধার অভিযান শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষায়িত বাহিনী। প্রাথমিক তথ্যে বিমানের একজন পাইলটকে উদ্ধারের খবর পাওয়া গেলেও দ্বিতীয় সদস্যের সন্ধানে এখনও ইরানের দুর্গম এলাকায় চিরুনি তল্লাশি চালানো হচ্ছে।
মার্কিন বিমান বাহিনীর অত্যন্ত দক্ষ ‘প্যারা-রেসকিউ জাম্পার’ দল এই অভিযানে অংশ নিচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা এই মিশনকে ‘কমব্যাট সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ’ (সিএসএআর) হিসেবে বর্ণনা করেছেন। সাবেক সামরিক কমান্ডাররা জানিয়েছেন, ব্ল্যাক হক হেলিকপ্টার এবং রিফুয়েলিং এয়ারক্রাফটের সহায়তায় অন্তত ২৪ জন প্যারা-রেসকিউ জাম্পার এই অভিযানে নিয়োজিত আছেন। শত্রুপক্ষের সীমানার গভীরে ঢুকে নিখোঁজ সদস্যকে খুঁজে বের করা এবং চিকিৎসা সেবা দিয়ে নিরাপদে ফিরিয়ে আনাই তাদের মূল লক্ষ্য।
ইরানি সামরিক কর্মকর্তারা বলছেন, তারা তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় এমন সব ‘উদ্ভাবনী’ কৌশল যোগ করেছেন যা আগে কখনো দেখা যায়নি। জেনারেল এলহামির মতে, ইরানের এই প্রযুক্তিগত অগ্রগতি শত্রুর ড্রোন ও ফাইটার জেটের কার্যকারিতাকে প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিয়েছে। বিশেষ করে হার্মিসের মতো ড্রোন ভূপাতিত করা ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সক্ষমতারই প্রমাণ দেয়।
বর্তমানে ইরানি সৈন্যরা যেকোনো ড্রোন বা ফাইটার জেটের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ এবং সেগুলোকে ধ্বংস করতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে বলে দাবি করেছে দেশটির জয়েন্ট হেডকোয়ার্টার্স।
