গ্যাস লাইটার কারখানায় আগুন: ৫ মরদেহ উদ্ধার

🖊️ নাগরিক প্রতিবেদক 🖊️

ঢাকার কেরানীগঞ্জের কদমতলী গোল চত্বর এলাকায় একটি গ্যাস লাইটার তৈরির টিনশেড কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় এখন পর্যন্ত পাঁচজনের মরদেহ উদ্ধার করেছে ফায়ার সার্ভিস।

ফায়ার সার্ভিসের পরিদর্শক আনোয়ারুল ইসলাম বিকাল চারটার পর এসব তথ্য নিশ্চত করেন।

তিনি জানান, আগুন নিয়ন্ত্রণে আসার পর কারখানার ভেতর থেকে এখন পর্যন্ত পাঁচজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। মরদেহগুলো মারাত্মকভাবে দগ্ধ হওয়ায় তাদের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি। বর্তমানে কারখানার ভেতরে আরও কেউ আটকে আছে কি না, তা জানতে তল্লাশি ও অনুসন্ধান অভিযান চালানো হচ্ছে।

ফায়ার সার্ভিস সূত্র জানায়, শনিবার দুপুর ১টার দিকে ওই কারখানাটিতে আগুনের সূত্রপাত হয়। খবর পাওয়ার ৫ মিনিটের মধ্যেই (দুপুর ১টা ১১ মিনিট) ফায়ার সার্ভিসের একটি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। পরবর্তীকালে আগুনের ভয়াবহতা বিবেচনায় আশপাশের আরও ৬টি ইউনিটসহ মোট ৭টি ইউনিট দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর দুপুর আড়াইটায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়।

ফায়ার সার্ভিসের মিডিয়া সেল জানিয়েছে, আগুনের প্রকৃত কারণ এবং ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ তদন্ত সাপেক্ষে পরবর্তীকালে জানানো হবে। উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

উদ্ধার পাঁচ মরদেহের মধ্যে তিনজন নারী

দগ্ধ পাঁচজনের মরদেহের মধ্যে তিনজনই নারী বলে নিশ্চিত করেছে পুলিশ। তাঁদের মধ্যে শুধু একজনের পরিচয় পাওয়া গেছে। এ ছাড়া দুজন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন।

আজ শনিবার রাত আটটার দিকে পুলিশের ঢাকা জেলার কেরানীগঞ্জ সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. জাহাঙ্গীর আলম এ তথ্য নিশ্চিত করেন।

পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, উদ্ধার হওয়া পাঁচ মরদেহের মধ্যে তিনজনই নারী। তাঁদের মধ্যে একজনের নাম ও পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে। মরদেহগুলো অতিরিক্ত পুড়ে যাওয়ায় প্রযুক্তির সহায়তা ছাড়া তাঁরা নারী না পুরুষ, তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। পুলিশ এ নিয়ে কাজ করছে।

নাম ও পরিচয় শনাক্ত হওয়া ওই নারী হলেন মিম আক্তার পাখি (১৮)। তাঁর বাবার নাম দেলোয়ার হোসেন। তিনি দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের আমবাগিচা লন্ডনি হাউস এলাকায় থাকতেন।

এদিকে এই অগ্নিকাণ্ডে দগ্ধ হয়ে দুজন শ্রমিক হাসপাতালে ভর্তি আছেন। তাঁদের মধ্যে মো. জিসান (১৮) ঢাকা মেডিকেল কলেজের বার্ন ইউনিটে ভর্তি আছেন। সেখানকার কর্তব্যরত চিকিৎসক জানিয়েছেন, আগুনে জিসানের শরীরের ২২ শতাংশ পুড়ে গেছে। আর মো. আসিফ (১৪) নামের এক কিশোর শ্রমিক জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন। আসিফের ১৫ শতাংশ পুড়ে গেছে বলে জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউটের আবাসিক চিকিৎসক ডা. শাওন বিন রহমান জানিয়েছেন।

অগ্নিকাণ্ডের সময় কারখানার প্রধান ফটক ছিল তালাবদ্ধ

অগ্নিকাণ্ডের সময় ঢাকার কেরানীগঞ্জের আকরাম গ্যাসলাইটার কারখানার প্রধান ফটক তালাবদ্ধ ছিল বলে অভিযোগ করেছেন শ্রমিকেরা। তাঁরা বলছেন, অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হওয়ার পর শ্রমিকেরা কারখানার দেয়াল টপকে বের হন।

কারখানার শ্রমিক সুমন মিয়া (২১) বলেন, ‘আমি সকাল সাড়ে আটটার দিকে কাজে আসি। বেলা পৌনে একটার দিকে বিকট শব্দ হয়। এরপর মুহূর্তের মধ্যে আগুন চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। প্রধান ফটক বন্ধ থাকায় আমি দৌড়ে দেয়াল টপকে কারখানা থেকে বেরিয়ে আসি।’

নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে কারখানার এক শ্রমিক বলেন, ‘দুপুরের দিকে হঠাৎ কইরা কঠিন আওয়াজ হুনি। তহন ডরাইয়া যাই। হেরপর দেহি কারখানার লুকজন মেইন গেটের দিকে দৌড়াইতাছে। মেইন গেট বন্ধ থাকায় ওরা দেয়াল বাইয়া বাইরে যায়। ওগো দেহাদোহি আমিও দেয়াল বাইয়া বাইর হইয়া যাই। কিন্তু তহন কম বয়সের শিশু কর্মচারীরা আর বাইর হতে পারে নায়। ওরা ওইহানে আটকা পইরা যায়।’

অগ্নিকাণ্ডের সময় কারখানার প্রধান ফটক বন্ধ ছিল উল্লেখ করে ডিপজল গলি এলাকার বাসিন্দা সালাউদ্দিন আহমেদ বলেন, এর আগেও এই কারখানায় আগুন লেগেছিল। তাঁরা কারখানাটি এলাকা থেকে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার জন্য মালিককে একাধিকবার বলেছিলেন, কিন্তু তিনি শোনেননি।

বিকেলে ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যান ঢাকা জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানা বিএনপির সভাপতি নিপুণ রায়। তিনি বলেন, বৈধ কাগজপত্র না থাকায় গত বছর কারখানাটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। বছরখানেক পর আজ কারখানাটি থেকে দগ্ধ পাঁচটি লাশ উদ্ধার করা হলো। তিনি আরও বলেন, ‘এ ধরনের কারখানা ফের কে খুলে দিল? এ কারখানা পুনরায় সচলের জন্য যে বা যারা উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, তাদের ছাড় দেওয়া হবে না। অবৈধ স্থাপনা ও প্রতিষ্ঠানের সাথে যত বড় হাতই জড়িত থাকুক না কেন, সেই হাতকে আইনের আওতায় নিয়ে আসা হবে।’

দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ রাজস্ব সার্কেল সহকারী কমিশনার (ভূমি) আফতাব আহমেদ বলেন, মৃত ব্যক্তিদের পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা চলছে। তিনি জানান, ঢাকা জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে মৃত ব্যক্তিদের পরিবারকে ২৫ হাজার টাকা দেওয়া হবে।

ফায়ার সার্ভিসের উপপরিচালক মোহাম্মদ ছালেহ উদ্দিন বলেন, কারখানাটি পরিচালনার জন্য বৈধ কোনো কাগজপত্র ছিল না। কারখানার ভেতরে কোনো অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থাও ছিল না।

অগ্নিকাণ্ডে হতাহতের ঘটনায় প্রধানমন্ত্রীর শোক

কেরানীগঞ্জে গ্যাস লাইটার উৎপাদনকারী টিনশেড কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে হতাহতের ঘটনায় গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলী শনিবার বিকেলে বাসসকে বলেন, “প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কেরানীগঞ্জের গ্যাস লাইটার কারখানার অগ্নিকাণ্ডে নিহতের ঘটনায় শোক প্রকাশ করেছেন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ঘটনাটি তদন্ত করার পাশাপাশি ভুক্তভোগীদের প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদানের নির্দেশ দিয়েছেন”।

তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রী স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেনের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলেছেন এবং আহতদের যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত করার নির্দেশনা দিয়েছেন।

প্রেস সচিব বলেন, তারেক রহমান স্থানীয় সংসদ সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ঢাকা জেলার ডেপুটি কমিশনার (ডিসি), পুলিশ সুপার (এসপি) এবং ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিচালকের সঙ্গেও ঘটনাটি নিয়ে কথা বলেছেন।

ঘটনাটি তদন্ত করে দায়ীদের বিচারের আওতায় আনতে প্রধানমন্ত্রী ফোনালাপে পৃথক তদন্ত কমিটি গঠনের নির্দেশনা দিয়েছেন।

এর আগে, শনিবর দুপুর ১টা ১১ মিনিটে কেরানীগঞ্জের কদমতলী গোল চত্বর এলাকায় গ্যাস লাইটার উৎপাদনকারী টিন-শেড কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটে। এতে পাঁচজন নিহত হয়েছেন।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, এদিন বিকেল ৪টা ৪৪ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে।

আগুনে দগ্ধ দুজনকে দেখতে গেলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী

কেরানীগঞ্জ কদমতলী এলাকায় গ্যাস লাইটার তৈরির কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় দগ্ধ দুজনকে জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয়েছে। দগ্ধ দুজনকে দেখতে গিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন।

আজ শনিবার রাত ৯টার দিকে বার্ন ইনস্টিটিউটে যান স্বাস্থ্যমন্ত্রী এবং দগ্ধ রোগীর খোঁজখবর নেন। এ ছাড়া ভর্তিরত অন্য রোগীদেরও খোঁজ নেন। এ সময় বার্ন ইনস্টিটিউটের পরিচারক অধ্যাপক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন উপস্থিত ছিলেন।

শনিবার (৪ এপ্রিল) বিকেলে দগ্ধ দুজনকে ভর্তি করা হয়। দগ্ধ ব্যক্তিরা হলেন কারখানার কর্মচারী আসিফ মোল্লা (১৬) ও জিসান (১৮)। তাঁদের দুজনের বাড়ি মাদারীপুর জেলায়।

পরিচালক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন বলেন, কেরানীগঞ্জের কদমতলী থেকে দুজন রোগী দগ্ধ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে জিসানের ২২ শতাংস ও আসিফের ১৫ শতাংস দগ্ধ হয়েছে। এ ছাড়া তাঁদের শ্বাসনালি ক্ষতিগস্ত হয়েছে। দুজনকে ভর্তি রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *