হাম ও উপসর্গ নিয়ে চব্বিশ ঘণ্টায় ১২ জনের মৃত্যু

নাগরিক প্রতিবেদক

রাজধানীসহ সারা দেশে হামে আক্রান্ত হয়ে গত ২৪ ঘণ্টায় ২ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে উপসর্গ নিয়ে আরও ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে।

রোববার (৫ এপ্রিল) এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।

এতে বলা হয়, শনিবার (৪ এপ্রিল) সকাল ৮টা থেকে রোববার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় হামে আক্রান্ত হয়ে একজন ঢাকা বিভাগে ও আরেকজন ময়মনসিংহে মারা গেছেন। এ ছাড়া হামের উপসর্গ নিয়ে খুলনা বিভাগে ৫ জন, রাজশাহী বিভাগে ৩ জন এবং চট্টগ্রাম বিভাগে ২ জনের মৃত্যু হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, গত ২৪ ঘণ্টায় নিশ্চিত হাম রোগীর সংখ্যা ৫৪ জন এবং সন্দেহজনক হাম রোগীর সংখ্যা ৯৭৪ জন। এ নিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে রোববার সকাল ৮টা পর্যন্ত সারা দেশে নিশ্চিত হাম রোগীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯২৯ জন এবং সন্দেহজনক হাম রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৪৭০ জন।

এ ছাড়া গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়েছে ৩ হাজার ৩৮০ জন রোগী।

এপ্রিলে প্রতিদিন গড়ে হাম শনাক্তের হার ৩৫ শতাংশ

দেশে হামের সংক্রমণ উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। চলতি এপ্রিল মাসে রোগ শনাক্তের হার প্রতিদিন গড়ে ৩৫ শতাংশে পৌঁছেছে, যা গত মাসের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। সংক্রমণের পাশাপাশি ল্যাবে বাড়ছে নমুনা পরীক্ষার চাপও।

রোববার (৫ এপ্রিল) দুপুরে রাজধানীর মহাখালী জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের (আইপিএইচ) ভাইরোলজি বিভাগের হাম ও রুবেলা পরীক্ষাগার ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে।

প্রতিষ্ঠানটি থেকে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত কয়েক দিনে নমুনা পরীক্ষায় শনাক্তের হার ওঠানামা করলেও সার্বিকভাবে তা ঊর্ধ্বমুখী। ৩১ মার্চ ১৪১টি নমুনার মধ্যে ৭১টি (প্রায় ৫০%), ১ এপ্রিল ১৮৯টি নমুনার মধ্যে ৬৪টি (৩৪%) পজিটিভ পাওয়া যায়, ২ এপ্রিল ২৮৮টি নমুনার মধ্যে ১০৬টি (৩৭%) এবং ৩ এপ্রিল ২৮৫টি নমুনার মধ্যে ৬৯টি (২৫%) পজিটিভ পাওয়া যায়, ৪ এপ্রিল ১৪৬টি নমুনার মধ্যে ৭০টি (৪৭%) শনাক্ত হয়। 

এ ছাড়া আজ (৫ এপ্রিল) বিকেল ৫টা পর্যন্ত ৩৬০টি নমুনা পরীক্ষার জন্য জমা পড়েছে, যা ল্যাবের ওপর তীব্র চাপের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

ল্যাব টেকনিশিয়ানরা জানান, স্বাভাবিক অবস্থায় এই ল্যাবে প্রতিদিন ১২০ থেকে ১৩০টি নমুনা পরীক্ষা করা সম্ভব। তবে বর্তমানে আগের চেয়ে তিনগুণ বেশি পরীক্ষা করতে হচ্ছে।

বান্দরবানের আলীকদম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে নমুনা নিয়ে আসা শাকিল বলেন, আমি দুর্গম এলাকা থেকে ১৫ ঘণ্টা জার্নি করে এখানে নমুনা নিয়ে এসেছি। ফিরে যেতে আরও ১৫ ঘণ্টা লাগবে। এর আগেও আমি ১০-১২ বার নমুনা নিয়ে এসেছি। আজ বেলা ১২টায় পৌঁছালেও ভিড়ের কারণে নমুনা জমা দিতে আড়াইটা বেজে গেছে। মাত্র দুই-তিন জন কর্মী নমুনা গ্রহণ করায় অনেক দেরি হচ্ছে।

ভাইরোলজি বিভাগের চিকিৎসক ডা. আমিরুল হুদা ভূঁইয়া বলেন, দেশের বিভিন্ন হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে এখানে নমুনা পাঠানো হয়। দেশে হাম ও রুবেলা পরীক্ষার জন্য এটিই একমাত্র কেন্দ্র হওয়ায় প্রতিনিয়ত নমুনার চাপ বাড়ছে।

তিনি আরও বলেন, এপ্রিল মাসে গড়ে প্রায় ৩৫ শতাংশ নমুনায় হাম শনাক্ত হচ্ছে। মার্চের মাঝামাঝি সময়ে এই হার ছিল ২০ থেকে ৩০ শতাংশের মধ্যে। বর্তমানে নমুনার সংখ্যা এত বেশি যে ল্যাব পরিচালনায় হিমশিম খেতে হচ্ছে। আমাদের স্বাভাবিক সক্ষমতার চেয়ে দ্বিগুণ পরীক্ষা করতে হচ্ছে।

গত দুই বছরে নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রমে বড় ঘাটতি

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিশ্লেষণ বলছে, গত দুই বছরে নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রমে বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। ২০১৯ সালে পূর্ণ টিকাদান হার ছিল ৮৩ দশমিক ৯ শতাংশ, যা ২০২৩ সালে নেমে আসে ৮১ দশমিক ৬ শতাংশে। সংখ্যাটি আপাতদৃষ্টিতে সামান্য হলেও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি ‘ক্রিটিক্যাল থ্রেশহোল্ড’-এর নিচে নেমে যাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ পরিবর্তন। এই ঘাটতির ফলে তৈরি হয়েছে একটি বড় ‘ইমিউনিটি গ্যাপ’, যা এখন হামের বিস্ফোরণে রূপ নিয়েছে।

দেশের বিভিন্ন এলাকায় নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটেছে। বিশেষ করে ইপিআই কার্যক্রমে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। স্বাস্থ্যকর্মীদের তথ্য অনুযায়ী–টিকা সরবরাহে ঘাটতি, অনিয়মিত ক্যাম্পেইন, মাঠপর্যায়ে জনবলসংকট, নজরদারিতে দুর্বলতা; ফলে অনেক শিশু সময়মতো টিকার আওতার বাইরে থেকে যাচ্ছে।

ঢাকার সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালসহ একাধিক হাসপাতালে শয্যাসংকট দেখা দিয়েছে। রাজশাহীতে এই অবস্থা শোচনীয়। রোগীদের করিডর ও বারান্দায় চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। ঢাকাসহ সারা দেশের চিকিৎসকরা অভিযোগ করে বলছেন, রোগীর চাপ বাড়লেও অবকাঠামো ও জনবল একই জায়গায় স্থবির হয়ে আছে। ভেন্টিলেটর, ওষুধ এবং জরুরি সরঞ্জামের ঘাটতিও পরিস্থিতিকে আরও সংকটাপন্ন করেছে।

১৯৯৮ সাল থেকে চালু থাকা অপারেশনাল প্ল্যান (ওপি) কাঠামোর মাধ্যমে দেশের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, টিকাদান, রোগ নিয়ন্ত্রণ এবং পুষ্টি কর্মসূচি পরিচালিত হতো। কিন্তু বিকল্প কাঠামো ছাড়া এই পরিকল্পনা বাতিল হওয়ায় কেন্দ্র থেকে জেলা পর্যন্ত সমন্বয় ভেঙে গেছে। পরিকল্পনা বাস্তবায়নে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি শুধু প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং জনস্বাস্থ্যব্যবস্থার ‘সিস্টেমিক ব্রেকডাউন’-এর একটি অংশ। 

স্বাস্থ্য খাতে দীর্ঘদিনের জনবল ঘাটতি এখন প্রকট আকার ধারণ করেছে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে অভিজ্ঞ জনবলের অভাব দেখা দিচ্ছে। একই সঙ্গে নীতিগত সিদ্ধান্তে ধারাবাহিকতার অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। এই পরিস্থিতিতে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ‘সঠিক মানুষ সঠিক জায়গায় না থাকলে পুরো স্বাস্থ্যকাঠামো অকার্যকর হয়ে পড়ে।’

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতির পেছনে তিনটি প্রধান কারণ রয়েছে–টিকাদানে দীর্ঘমেয়াদি ঘাটতি, স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় কাঠামোগত দুর্বলতা, প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে ধারাবাহিকতার অভাব ইত্যাদি কারণে হামের বর্তমান বিস্তার ভবিষ্যতে অন্য প্রতিরোধযোগ্য রোগের পুনরাবির্ভাবের ইঙ্গিত দিতে পারে।

সংকট মোকাবিলায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সব চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীর ছুটি বাতিল করেছে। সরকারের পক্ষ থেকে জরুরি চিকিৎসাসেবা চালু রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে মাঠপর্যায়ে বাস্তবতা ভিন্ন–জনবলসংকট ও সরবরাহ ঘাটতির কারণে এই উদ্যোগ পুরোপুরি কার্যকর হচ্ছে না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সতর্ক করেছে, দ্রুত কার্যকর টিকাদান কর্মসূচি না বাড়ালে সংক্রমণ আরও ছড়িয়ে পড়তে পারে। নতুন এলাকাও ঝুঁকির মধ্যে আসতে পারে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, হামের এই বিস্ফোরণ শুধু একটি রোগের গল্প নয়; এটি একটি স্বাস্থ্যব্যবস্থার সক্ষমতা, পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের গভীর সংকটের প্রতিচ্ছবি। টিকাদান ঘাটতি থেকে শুরু করে নীতিগত শূন্যতা–সব মিলিয়ে এটি এমন এক পরিস্থিতি, যেখানে দেরি মানেই আরও বড় মানবিক বিপর্যয়।

একজন সাবেক জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘শুধু মাঠপর্যায়ে নয়, কেন্দ্র ও জেলা পর্যায়ে দক্ষ জনবলের অভাব রয়েছে। ঠিক জায়গায় ঠিক মানুষ না থাকলে এই ধরনের সংকট বারবার দেখা দেবে।’ তার মতে, কমিউনিটি পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং ধারাবাহিক টিকাদান কার্যক্রম ছাড়া এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হবে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ বলেন, পাঁচ বছর মেয়াদি ধারাবাহিক কর্মসূচির কারণেই সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে সাফল্য এসেছে। দুই বছরের প্রকল্প দিয়ে এই অর্জন ধরে রাখা সম্ভব নয়। এতে রোগ বাড়বে, সেবা কমবে এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থা ভেঙে পড়বে।

সব মিলিয়ে হামের বর্তমান প্রাদুর্ভাব দেশের স্বাস্থ্য খাতের দুর্বল চিত্রকে সামনে নিয়ে এসেছে। টিকাদানব্যবস্থার ফাঁক, হাসপাতালের চাপ এবং জনবলসংকট–সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এমন একপর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে দ্রুত ও সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে সংকট আরও গভীর হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও সুস্বাস্থ্যের বাংলাদেশ এর সদস্যসচিব ডা. শামীম তালুকদার বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার অপারেশনাল প্ল্যান (ওপি) বাতিল করেছে। গত দুই বছরে যারা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় চালিয়েছেন তারা স্বাস্থ্য বোঝেন না। যার ফলে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *