৩১৫ কোটি ডলার বিদেশি ঋণ নিচ্ছে সরকার

𓂃✍︎ নাগরিক প্রতিবেদন 𓂃✍︎

বিশ্ববাজারে দর বৃদ্ধির প্রভাবে শুধু বিদ্যুৎ ও জ্বালানিতে গত মার্চ থেকে আগামী জুন পর্যন্ত সময়ে সরকারের অতিরিক্ত খরচ হবে ৩৯ হাজার কোটি টাকা। সব মিলিয়ে দায়িত্ব নিয়েই আর্থিক সংকটে পড়েছে সরকার। পুরো অর্থবছরের জন্য নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে এরই মধ্যে বেশি ঋণ নিয়েছে সরকার। এখন বিদেশি উৎস থেকে ৩১৫ কোটি ডলার ঋণ নেওয়ার চেষ্টা করছে। 

আর্থিক খাত-সংশ্লিষ্টরা জানান, নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় এসে সুদহার কমাবে এবং বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়বে– এমন প্রত্যাশা করা হচ্ছিল। সুদহার কমানোর জন্য একটি বৈঠকও ডাকেন নতুন গভর্নর। তবে যুদ্ধ শুরু হওয়ায় শেষ পর্যন্ত সেই বৈঠক আর হয়নি। আপাতত যুদ্ধবিরতি দিলেও খুব সহসা সংকটের সমাধান হবে কিনা, তা নিয়ে শঙ্কা রয়েছে। ফলে সুদহার কমবে না। 

রেমিট্যান্সে উচ্চ প্রবৃদ্ধির কারণে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে কিছুটা স্বস্তি রয়েছে। গত এক মাস ধরে কেন্দ্রীয় ব্যাংক আর বাজার থেকে ডলার কিনছে না। এতে করে ব্যাংকগুলোর কাছে এখন ১০০ কোটি ডলারের মতো বৈদেশিক মুদ্রার তারল্য রয়েছে। যুদ্ধ শুরুর প্রথম দিকে ডলারের দর সামান্য বেড়ে ১২২ টাকা ৭৫ পয়সায় উঠেছে। এই দরেই স্থিতিশীল রয়েছে। আর বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩৪ দশমিক ৪৭ বিলিয়ন ডলারে রয়েছে। 

চলতি অর্থবছরের শুরু থেকেই রাজস্ব আদায়ে লক্ষ্যমাত্রা পূরণে পিছিয়ে রয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। জুলাই থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রথম আট মাসে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় শুল্ক-কর আদায় কম হয়েছে প্রায় ৭১ হাজার ৪৭২ কোটি টাকা। সরকারের মোট রাজস্ব আয়ের প্রায় ৮০ শতাংশই আসে এনবিআর থেকে। এনবিআরবহির্ভূত রাজস্ব আহরণেও আশানুরূপ অগ্রগতি নেই। 

বর্তমানে সরকারের ঋণ রয়েছে ২৩ লাখ কোটি টাকার মতো। এর মধ্যে বিদেশি উৎসে রয়েছে ৯ হাজার ৩৪৬ কোটি ডলার। বাংলাদেশি টাকায় বর্তমানে যা প্রায় সাড়ে ১১ লাখ কোটি টাকা টাকা। বাকিটা দেশি উৎস থেকে নেওয়া। সঞ্চয়পত্রে রয়েছে তিন লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা। ব্যাংকসহ বিভিন্ন উৎসে রয়েছে প্রায় আট লাখ কোটি টাকা। বিপুল অঙ্কের এই ঋণের বিপরীতে সুদ পরিশোধে সরকারের উল্লেখযোগ্য একটি অংশ চলে যাচ্ছে। 

চলতি অর্থবছরের তিন মাস বাকি থাকতেই পুরো অর্থবছরের জন্য নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি ঋণ নিয়েছে সরকার। এবার ব্যাংক থেকে এক লাখ চার হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হয়। তবে গত ৩০ মার্চ পর্যন্ত সরকার নিয়েছে এক লাখ ছয় হাজার ৫১ কোটি টাকা। এতেই সরকারের চাহিদা পূরণ না হওয়ায় বিশেষ নিলাম ডেকে নেওয়া হয়েছে আরও ১০ হাজার কোটি টাকা।

বর্তমানে সরকারের ঋণ চাহিদা মেটাতে ট্রেজারি বিল, বন্ডে নিয়মিত নিলাম ক্যালেন্ডারের বাইরে বিশেষ নিলাম ডাকতে হচ্ছে। বিশেষ নিলাম ডেকে ১ এপ্রিল পাঁচ হাজার কোটি টাকা নিয়েছে সরকার। ৮ এপ্রিল বিশেষ নিলামে আরও পাঁচ হাজার কোটি টাকা নিয়েছে। ফলে এবার শেষ পর্যন্ত ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ঋণ অনেক বেড়ে যেতে পারে। গত অর্থবছরের মূল বাজেটে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকার এক লাখ ৩৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছিল। তবে সংশোধিত বাজেটে ৯৯ হাজার কোটি টাকা ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়। শেষ পর্যন্ত সরকার নিয়েছিল মাত্র ৭২ হাজার ৩৭২ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের এ পর্যন্ত নেওয়া ঋণের মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক সরবরাহ করেছে ৩২ হাজার ১৯৩ কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংক ঋণ সরবরাহ করার মানে টাকা ছাপিয়ে দেওয়ার মতো, যা মূল্যস্ফীতি উস্কে দেয়। সব মিলিয়ে গত মার্চ পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংকে সরকারের ঋণস্থিতি বেড়ে এক লাখ ৩০ হাজার ৬১৬ কোটি টাকা হয়েছে। আর বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে সরকার ৯ মাসে নিয়েছে ৭৩ হাজার ৮৫৮ কোটি টাকা। এতে ঋণস্থিতি ঠেকেছে পাঁচ লাখ ২৬ হাজার ৩৩৯ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের শুরুর দিকেও সরকারের ঋণ চাহিদা কম ছিল। গত অক্টোবর পর্যন্ত অর্থবছরের প্রথম চার মাসে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকার ঋণ নেওয়ার চেয়ে পরিশোধ বেশি ছিল ৫০৩ কোটি টাকা।

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও গ্যাসের দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যাওয়ায় দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বড় ধরনের আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের শেষ চার মাসে এ খাতে অতিরিক্ত প্রায় ৩৯ হাজার কোটি টাকার ভর্তুকি প্রয়োজন হবে। চলতি বাজেটে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে মোট বরাদ্দ রয়েছে ৪২ হাজার কোটি টাকা।

এর বাইরে কৃষি ও সারের ভর্তুকিও বাড়তে পারে। পাশাপাশি নতুন সরকার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে কৃষকদের কৃষিঋণ মওকুফ, ফ্যামিলি কার্ড করেছে, কৃষি কার্ড চালুর পর্যায়ে রয়েছে। দুর্বল পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠনের জন্যও চলতি বাজেট থেকেই ২০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে বাড়তি ব্যয়ের চাপ কীভাবে সামাল দেওয়া হবে, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছে সরকার।

অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটে বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি বাবদ ৩৭ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হলেও সংশোধিত বাজেটে তা কমিয়ে ৩৬ হাজার কোটি টাকা করা হয়। তবে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের পর পরিস্থিতি পুরোপুরি পাল্টে গেছে। বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র যুক্ত হওয়ায় আর্থিক চাপ বাড়ছে। এ প্রেক্ষাপটে চলতি অর্থবছরের অবশিষ্ট ১০ মাসের জন্য অতিরিক্ত ২০ হাজার ১৩৬ কোটি টাকা ভর্তুকি চেয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ। 

চলতি বাজেটে গ্যাস (মূলত এলএনজি আমদানি) খাতে বরাদ্দ রয়েছে ছয় হাজার কোটি টাকা। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম দ্বিগুণের বেশি বেড়ে যাওয়ায় শেষ চার মাসে এ খাতে অতিরিক্ত প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হতে পারে। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক বাজারদরের সঙ্গে সমন্বয় করে জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণ করায় চলতি বাজেটে এ খাতে ভর্তুকির কোনো বরাদ্দ ছিল না। তবে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতায় তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় স্থানীয় বাজারে দাম সমন্বয় না করলে প্রায় ১৯ হাজার কোটি টাকার ভর্তুকি প্রয়োজন হবে।

আমদানিনির্ভর জ্বালানি হওয়ায় এই অতিরিক্ত ৩৯ হাজার কোটি টাকার পুরোটা বৈদেশিক মুদ্রায় পরিশোধ করতে হবে। তবে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে এ অর্থ ব্যয় করতে চায় না সরকার। তাই আগামী জুন পর্যন্ত ৩১৫ কোটি মার্কিন ডলার সংগ্রহে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার কাছ থেকে ঋণ নেওয়ার চেষ্টা চলছে।
এ অর্থ জোগাড়ে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ), বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) এবং এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংকের (এআইআইবি) কাছ থেকে বাজেট সহায়তা নেওয়ার চেষ্টা করছে সরকার। এর মধ্যে আইএমএফ থেকে প্রায় দেড় বিলিয়ন ডলার সহায়তা প্রত্যাশা করা হচ্ছে। এ ছাড়া এডিবির কাছ থেকে ২৫ কোটি ডলার ইতোমধ্যে চাওয়া হয়েছে এবং বিশ্বব্যাংক ও এআইআইবির কাছেও সহায়তা চাওয়া হবে।

তবে এ ক্ষেত্রে আশানুরূপ প্রতিশ্রুতি এখনও পাওয়া যায়নি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রায় ৩৫০ কোটি ডলার বাজেট সহায়তা পাওয়া গেলেও চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটে লক্ষ্য ধরা হয়েছিল ১৮০ কোটি ডলার, যা সংশোধিত বাজেটে কমিয়ে ১২০ কোটি ডলারে নামানো হয়েছে। এমনকি আইএমএফের চলমান কর্মসূচির আওতায় জুনের আগেই দুই কিস্তির অর্থ পাওয়ার সম্ভাবনাও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

আইএমএফের সঙ্গে চলমান ঋণ কর্মসূচির আওতায় ষষ্ঠ ও সপ্তম কিস্তির প্রায় ১৩০ কোটি ডলার জুনের মধ্যে ছাড় হওয়ার কথা ছিল। এ প্রেক্ষাপটে সংস্থাটির এশিয়া ও প্যাসিফিক অঞ্চলের পরিচালক কৃষ্ণ শ্রীনিবাসনের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল সম্প্রতি ঢাকা সফর করে এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে। তবে আইএমএফ এখন জুনের পরিবর্তে জুলাইয়ে পর্যালোচনা মিশন শেষ করে অর্থ ছাড় করতে চায়। কর্মকর্তারা বলছেন, নতুন সরকারের প্রথম বাজেটে কর্মসূচির শর্তগুলো কতটা বাস্তবায়ন হচ্ছে– তা দেখেই সিদ্ধান্ত নিতে চায় সংস্থাটি

এদিকে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বসন্তকালীন বৈঠকে অংশ নিতে শুক্রবার ওয়াশিংটনের উদ্দেশে রওনা দেবে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন প্রতিনিধি দল। সেখানে তারা জুনের মধ্যেই দুই কিস্তির অর্থ ছাড় ও অতিরিক্ত অর্থায়নের জন্য অনুরোধ জানাবেন। তবে আইএমএফের শর্ত অনুযায়ী বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ভর্তুকি কমাতে হবে। কিন্তু বাস্তবে এ খাতে ব্যয় বাড়ছে। ফলে ভর্তুকি কমানোর পাশাপাশি জ্বালানি তেল ও বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর বিষয়টি বিবেচনা করছে সরকার। 

কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় রাজস্ব না আসায় ব্যয় নির্বাহে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন উৎস থেকে ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়াতে হচ্ছে সরকারকে। তাই বাজেটের একক বৃহত্তম খাত হিসেবে দাঁড়িয়েছে ঋণের সুদ পরিশোধ। চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে মোট ব্যয়ের প্রায় ২৬ শতাংশ, অর্থাৎ ৬৬ হাজার ২৪৪ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে দেশি-বিদেশি ঋণের সুদ পরিশোধে। এর মধ্যে দেশীয় ঋণের সুদে ৫৬ হাজার ৩১৭ কোটি টাকা এবং বিদেশি ঋণের সুদে ৯ হাজার ৯২৭ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। গত অর্থবছরের একই সময়ে সুদ বাবদ ব্যয় ছিল ৬৪ হাজার ১৪৮ কোটি টাকা।

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *