৪৭ বছর পর ওয়াশিংটন-তেহরান প্রথম উচ্চপর্যায়ের বৈঠক

𓂃✍︎ নাগরিক নিউজ ডেস্ক 𓂃✍︎

ইরানি নেতৃত্বের সঙ্গে ঐতিহাসিক এক বৈঠকে অংশ নিতে পাকিস্তানে পৌঁছেছেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ও তার নেতৃত্বাধীন প্রতিনিধি দল।

ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ চলাকালীন দুই সপ্তাহের বিরতির মধ্যে এই আলোচনা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার মধ্য দিয়ে এই সংঘাতের সূচনা হয়েছিল। মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ছড়িয়ে পড়া এই যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ব অর্থনীতিতেও বড় ধরনের ধাক্কা লাগে। পরবর্তীতে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় গত ৮ এপ্রিল একটি অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে। 

শনিবার সকালে ইসলামাবাদের নূর খান বিমানঘাঁটিতে অবতরণের পর ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্সকে স্বাগত জানান পাকিস্তানের উপ-প্রধানমন্ত্রী ইশহাক দার, প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রধান ও সেনাবাহিনী প্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নকভি।

মার্কিন প্রতিনিধি দলের পৌঁছানোর বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র দপ্তর এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ইসহাক দার মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্টকে স্বাগত জানিয়েছেন। এ সময় তিনি ‘আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গীকারের’ প্রশংসা করেন।

উপ-প্রধানমন্ত্রী আশা প্রকাশ করে বলেন, পক্ষগুলো গঠনমূলক আলোচনায় অংশ নেবে। সেই সঙ্গে চলমান এই সংঘাতের একটি দীর্ঘস্থায়ী ও টেকসই সমাধান নিশ্চিত করতে পাকিস্তানের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি।

লেবাননে ইসরায়েলি হামলার জেরে তৈরি হওয়া শেষ মুহূর্তের বাধা কাটলে শনিবার ভোরেই ইসলামাবাদে পৌঁছায় ইরানি প্রতিনিধি দল। এর আগে তেহরান শর্ত দিয়েছিল, লেবাননে হামলা বন্ধ না হলে তারা এই সংলাপে অংশ নেবে না। এ বিষয়ে পাকিস্তানের পক্ষ থেকে জানানো হয়, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধবিরতির শর্তাবলীতে লেবানন প্রসঙ্গটিও অন্তর্ভুক্ত ছিল।

জেডি ভ্যান্সের নেতৃত্বে মার্কিন প্রতিনিধি দলে আরও রয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার এবং মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ।

মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ, স্টেট ডিপার্টমেন্ট ও প্রতিরক্ষা দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ভ্যান্সের সফরসঙ্গী হিসেবে রয়েছেন। এছাড়া নিরাপত্তা, কারিগরি ও যোগাযোগ বিষয়ক একটি অগ্রবর্তী দল আগেই ইসলামাবাদে পৌঁছেছে।

অন্যদিকে, ইরানের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন দেশটির পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ। এই দলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচিও রয়েছেন।

ইরানের সংবাদ সংস্থা তাসনিম-এর তথ্য অনুযায়ী, প্রতিনিধি দলে অন্য আলোচকদের মধ্যে রয়েছেন সুপ্রিম ন্যাশনাল ডিফেন্স কাউন্সিলের সচিব আলি আকবর আহমাদিয়ান এবং দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর আবদোল নাসের হেমমাতি।

১৯৭৯ সালের পর এই প্রথম ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে সরাসরি কোনো উচ্চপর্যায়ের বৈঠক হতে যাচ্ছে।

তবে এই আলোচনা শুরু হওয়ার আগেই ভেস্তে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। তেহরান সাফ জানিয়ে দিয়েছিল, লেবাননে ইসরায়েলি হামলা বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত তারা কোনো আলোচনায় যোগ দেবে না। অবশেষে সেই বাধা কাটলে ঐতিহাসিক এই সংলাপের পথ প্রশস্ত হয়।

শুক্রবার সন্ধ্যায় গালিবাফ স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে, তেহরানের এই আলোচনায় অংশগ্রহণ দুটি শর্তের ওপর নির্ভর করছে। লেবাননে যুদ্ধবিরতি এবং বিদেশে জব্দ করা ইরানের প্রায় ৭ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ ফেরত দেওয়া। তিনি বলেন, “আলোচনা শুরুর আগেই এই শর্তগুলো পূরণ করতে হবে।”

ইরানের একজন কর্মকর্তা সংবাদমাধ্যম ডনকে বলেন, “আমরা আলোচনার অন্যতম ‘রেড লাইন’ বা চূড়ান্ত সীমা হিসেবে বৈরুত ও দাহিয়েতে হামলা বন্ধ করতে বাধ্য করেছি। আমরা এটাও পরিষ্কার করে দিয়েছি যে, ইসরায়েল যদি আবারও সেখানে হামলা চালায়, তবে আলোচনা বাতিল করা হবে।”

ইরানের দাবি, যেকোনো যুদ্ধবিরতিকে হিজবুল্লাহসহ সব ফ্রন্টে কার্যকর হতে হবে। অন্যদিকে, লেবানন যুদ্ধবিরতির অন্তর্ভুক্ত থাকবে বলে শুরুতে একটি প্রাথমিক সমঝোতা হলেও, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এখন পর্যন্ত লেবাননে চালানো হামলাগুলোকে এই সাময়িক চুক্তির আওতার বাইরে রাখতে চাইছে।

মতের এই ভিন্নতা বারবার কূটনৈতিক প্রক্রিয়াটিকে ভেস্তে যাওয়ার শঙ্কায় ফেলে।

ওয়াশিংটন ছাড়ার আগে জেডি ভ্যান্স এই সম্ভাব্য আলোচনাকে ‘ইতিবাচক’ হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে আলোচনায় বসতে প্রস্তুত। তবে ইরান যদি সময়ক্ষেপণের কোনো কৌশল অবলম্বন করে, তবে ওয়াশিংটন তা কোনোভাবেই ‘গ্রহণ করবে না’ বলেও তিনি সতর্ক করে দেন।

অন্যদিকে, ডোনাল্ড ট্রাম্প আরও কঠোর অবস্থান ব্যক্ত করেছেন। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ইরানের হাতে এখন আর ‘বেশি কার্ড’ নেই। আলোচনা ব্যর্থ হলে আবারও সামরিক অভিযান শুরু হতে পারে বলেও জানান তিনি। এছাড়া হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের ওপর তেহরানের ক্রমাগত বিধি-নিষেধের কড়া সমালোচনা করেন ট্রাম্প। বর্তমান অচলাবস্থায় এই নৌপথটি ইরানের জন্য একটি বড় কৌশলগত হাতিয়ার হয়ে দাঁড়িয়েছে। 

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ, যার দেশ এই সংলাপ আয়োজনে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেছে, তিনি জানিয়েছেন যে এই আলোচনা সফল করতে পাকিস্তান ‘সর্বোচ্চ চেষ্টা’ করবে। তিনি এই আলোচনাকে ‘সংলাপের মাধ্যমে বিরোধপূর্ণ ইস্যুগুলো’ সমাধানের একটি সুযোগ হিসেবে অভিহিত করলেও সামনে থাকা কাজগুলো যে বেশ জটিল, তাও স্বীকার করেছেন।

আলোচনার আলোচ্যসূচিতেও সেই জটিলতার প্রতিফলন দেখা গেছে। ইরান ১০ দফা যে প্রস্তাব দিয়েছিল, তাকে সাধারণ কাঠামো হিসেবে ওয়াশিংটন গ্রহণ করলেও দুই পক্ষের মধ্যে মৌলিক কিছু বিষয়ে এখনও বড় ধরনের মতপার্থক্য রয়ে গেছে।

ধারণা করা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ওপর কড়াকড়ি আরোপ, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ সীমিত করা এবং পারমাণবিক উপকরণ সরিয়ে নেওয়ার মতো বিষয়গুলোতে চাপ দেবে। অন্যদিকে, ইরান পূর্ণাঙ্গ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, তাদের পারমাণবিক অধিকারের স্বীকৃতি, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের জন্য একটি কাঠামো তৈরি এবং বিদেশে জব্দ করা অর্থ ফেরত দেওয়ার দাবি তুলছে।

আঞ্চলিক প্রক্সি নেটওয়ার্ক, ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা এবং ছাড় দেওয়ার পর্যায়ক্রমিক ধাপগুলো এই আলোচনায় উত্তপ্ত ইস্যু হিসেবে রয়ে গেছে।

কর্মকর্তা ও বিশ্লেষকদের ধারণা, অমীমাংসিত বিষয়ের পরিধি এতই বিশাল যে, প্রথম দুই দিনের এই প্রাথমিক আলোচনা থেকে বড় কোনো অগ্রগতির সম্ভাবনা খুবই কম। বড়জোর, এই প্রথম দফার বৈঠকটি ভবিষ্যতে দীর্ঘমেয়াদি আলোচনার একটি পথ তৈরি করতে পারে অথবা উত্তেজনা প্রশমনে তাৎক্ষণিক কিছু সীমিত সমঝোতায় পৌঁছাতে পারে।

ফলে, এই বৈঠক নিয়ে প্রত্যাশা এখনো খুবই সতর্ক। তবে সব বাধা পেরিয়ে ইসলামাবাদে প্রতিনিধি দলগুলোর এই উপস্থিতি নিঃসন্দেহে একটি বিরল কূটনৈতিক সুযোগ। যদিও লেবাননে চলমান সহিংসতা, পারস্য উপসাগরে নৌপথের অস্থিরতা এবং ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যেকার গভীর অবিশ্বাসের কারণে এই পুরো প্রক্রিয়াটি এখন এক চরম উত্তেজনার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। 

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *