𓂃✍︎ কুষ্টিয়া প্রতিনিধি 𓂃✍︎
কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে দরবার শরিফে হামলার ঘটনায় গণপিটুনিতে আব্দুর রহমান শামীম (৬৫) নামে এক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। গুরুতর আহত হয়েছেন আরও দু’জন।
শনিবার দুপুরে উপজেলার ফিলিপনগর এলাকায় এই ঘটনা ঘটে। পরে দৌলতপুর থানার পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে।
স্থানীয়রা জানান, শামীম নিজেকে ‘কালান্দার বাবা জাহাঙ্গীর সুরেশ্বরী’র অনুসারী হিসেবে পরিচয় দিতেন। সম্প্রতি তার বিরুদ্ধে পবিত্র কোরআন নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্যের অভিযোগ ওঠে। ধর্ম নিয়ে আপত্তিকর বক্তব্যের একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। তারই ধারাবাহিকতায় শনিবার বেলা একটার দিকে শতাধিক মানুষ দক্ষিণ-পশ্চিম ফিলিপনগরে শামীমের দরবার শরিফ ঘেরাও করে। এক পর্যায়ে তারা হামলা চালিয়ে ভাঙচুর ও একাধিক কক্ষে আগুন দেয়। এ সময় দরবারের ভেতরে থাকা শামীম ও তার দুই অনুসারী পিটুনির শিকার হন। বেলা ৩টার দিকে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস গুরুতর আহত অবস্থায় তাদের উদ্ধার করে দৌলতপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যায়। সেখানে শামীমের মৃত্যু হয়।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. তৌহিদুল হাসান তুহিন জানান, বেলা ৩টার দিকে আহত অবস্থায় তিনজনকে হাসপাতালে আনা হয়। এর মধ্যে শামীমের শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুরুতর আঘাতের চিহ্ন ছিল। চিকিৎসাধীন অবস্থায় বেলা তিনটা ২০ মিনিটের দিকে তার মৃত্যু হয়।
স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুর রহিম বলেন, ‘শামীম দীর্ঘদিন ধরে নানা বিতর্কিত কাজ করছিলেন। কিন্তু এবার পবিত্র কোরআন নিয়ে মন্তব্য করায় এলাকাবাসী ফুঁসে ওঠে।’ আরেক স্থানীয় বাসিন্দা মো. আসলাম হোসেন বলেন, ‘৫-৬ বছর ধরে তার কর্মকাণ্ডে আমরা বিরক্ত ছিলাম। তার আজব সব কর্মকাণ্ড নিয়ে আগেও প্রতিবাদ হয়েছে।’
শামীমের বড় ভাই ফজলুর রহমান বলেন, ‘শামীম বেশ কয়েক বছর ধরে ওই দরবার পরিচালনা করে আসছিলেন। তার কর্মকাণ্ডে এলাকার অনেকে অসন্তুষ্ট ছিল।’ তবে কারা হামলা চালিয়েছেন সে বিষয়ে মন্তব্য করতে চাননি তিনি।
পুলিশ জানায়, বিকাল পাঁচটা পর্যন্ত কয়েকশ’ মানুষ দরবার শরিফ এলাকা ঘিরে রাখে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশের পাশাপাশি ফায়ার সার্ভিসের একাধিক ইউনিট ঘটনাস্থলে কাজ করছে।
দৌলতপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরিফুর রহমান জানান, পরিস্থিতি বর্তমানে নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। নতুন করে যাতে অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে সেজন্য অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। এলাকায় থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে জানিয়ে ওসি বলেন, ‘দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
আব্দুর রহমান শামীম ইসলামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন। পরে ফিলিপনগর উচ্চবিদ্যালয় থেকে ১৯৮৪ সালে এসএসসি, কুমারখালী ডিগ্রি কলেজ থেকে এইচএসসি এবং ভেড়ামারা কলেজ থেকে বিকম পাস করেন। পরে রাজধানীর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ থেকে এমকম সম্পন্ন করেন।
শিক্ষাজীবন শেষে কেরানীগঞ্জ এলাকায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি নেন শামীম। পরে চাকরি ছেড়ে কেরানীগঞ্জের এক পীরের মুরিদ হন এবং সেখানে খাদেম হিসেবে বসবাস শুরু করেন। এ সময় থেকে পরিবারের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ২০০৭ সালে তিনি বিয়ে করলেও সেই সংসার দীর্ঘস্থায়ী হয়নি।
শামীম রেজা ২০১৮ সালের দিকে নিজ বাড়িতে এসে পৈতৃক জমিতে ওই আস্তানা গড়ে তোলেন।
২০২১ সালের ১৬ মার্চ এক অনুসারীর শিশুপুত্রের মরদেহ ঢাকঢোল বাজিয়ে দাফনের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে আলোচনায় আসেন শামীম। পরে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে একই বছরের ১৬ সেপ্টেম্বর গভীর রাতে তাঁকে দক্ষিণ ফিলিপনগর গ্রাম থেকে গ্রেফতার করা হয়।
