প্রয়াত কিংবদন্তী সঙ্গীতশিল্পী আশা ভোঁসলে

𓂃✍︎  বিনোদন প্রতিবেদক 𓂃✍︎ 

ভারতের কিংবদন্তী সঙ্গীতশিল্পী আশা ভোঁসলে মারা গেছেন। রোববার মুম্বাইয়ের ব্রিচ ক্যান্ডি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন তিনি। ৯৩ বছর বয়সী আশা ভারতীয় সঙ্গীত জগতের অন্যতম সেরা ও বহুমুখী কণ্ঠশিল্পী হিসেবে পরিচিত। সাত দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি বিভিন্ন ভাষা ও ঘরানায় হাজার হাজার গান গেয়ে শ্রোতাদের মুগ্ধ করে এসেছেন।

মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৯২ বছর।  আশার ছেলে আনন্দ ভোঁসলে তার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছেন। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি, হিন্দুস্তান টাইমস এবং আনন্দবাজারের তথ্য অনুসারে, শনিবার সন্ধ্যা থেকে অসুস্থ বোধ করছিলেন আশা ভোঁসলে। এক পর্যায়ে হৃদরোগে আক্রান্ত হন। তারপর দ্রুত তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থাতেই রোববার দুপুরে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন আশা।

১৯৩৩ সালের ৮ সেপ্টেম্বর জন্ম আশা ভোঁসলের (Asha Bhosle)। তিনি প্রয়াত কিংবদন্তী সঙ্গীতশিল্পী লতা মঙ্গেশকরের বোন। বাড়িতে গানের পরিবেশেই বড় হয়েছেন তাঁরা। ১৯৪৮ সালে ‘চুনারিয়া’ সিনেমার ‘সাওয়ান আয়া’ গান দিয়ে বলিউডে অভিষেক হয় তাঁর। এর আগে মারাঠি ভাষায় গান গেয়েছিলেন তিনি।

দীননাথ মঙ্গেশকর ছিলেন সেই সময়ের বিখ্যাত মঞ্চ ব্যক্তিত্ব ও শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের শিল্পী। শিশু বয়সে বাবার কাছেই প্রথম সঙ্গীতে তালিম নেন আশা মঙ্গেশকর। তারপর বড় বোন লতা মঙ্গেশকরের সচিব গণপৎ রাও ভোঁসলের সঙ্গে পালিয়ে যান এবং বিয়ের পর ‘মঙ্গেশকর’ পদবী বাদ দিয়ে স্বামীর ‘ভোঁসলে’ পদবি গ্রহণ করেন। তবে গণপৎ রাও ভোঁসলের সঙ্গে পালিয়ে যাওয়ার কারণে মঙ্গেশকর পরিবার তাকে ত্যাগ করে।

দীর্ঘ কয়েক দশকের কেরিয়ারে হিন্দি, বাংলাসহ একাধিক ভাষায় কয়েক হাজার গান গেয়েছেন তিনি। শাস্ত্রীয় সঙ্গীত থেকে আধুনিক, গজল থেকে ক্যাবারে—প্রতিটি ধারাতেই নিজের স্বতন্ত্র ছাপ রেখেছেন তিনি। তার গাওয়া অসংখ্য গান আজও সমান জনপ্রিয়। সময়ের সীমানা পেরিয়ে প্রজন্মের পর প্রজন্মকে মুগ্ধ করে চলেছে।

শনিবার আশা ভোঁসলে হাসপাতলে ভর্তি হওয়ার পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নিজে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। নিজের এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে পোস্ট করা এক বার্তায় মোদি বলেছিলেন, “আশা ভোসলেজি হাসপাতালে ভর্তি শুনে গভীর ভাবে চিন্তিত। তার দ্রুত সুস্থতা কামনা করছি।”

আশা ভোসলের কণ্ঠের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তাঁর অভিযোজন ক্ষমতা: রোমান্টিক গান ‘চুরা লিয়া হ্যায় তুমনে’, ক্যাবারে ‘পিয়া তু আব তো আজা’, আধুনিক পপ ‘দম মারো দম’, গজল ‘দিল চিজ কেয়া হ্যায়’। তাঁর গাওয়া গানের সংখ্যা ১২ হাজারের বেশি বলে ধারণা করা হয়, যা তাঁকে বিশ্বের অন্যতম সর্বাধিক রেকর্ড করা শিল্পীতে পরিণত করেছে।

শুরুতে চটুল বা ক্যাবারে ধাঁচের গানের জন্য তাকে ‘টাইপকাস্ট’ করা হলেও, পরে ‘উমরাও জান’-এর গজল গেয়ে তিনি নিজের বহুমুখী প্রতিভার প্রমাণ দেন। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে সাতবার ফিল্মফেয়ার সেরা নেপথ্য গায়িকার পুরস্কার এবং দুইবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন আশা ভোসলে। ‘উমরাও জান’ ছবির ‘দিল চিজ কেয়া হ্যায়’ এবং ‘ইজাজত’ ছবির ‘মেরা কুছ সামান’ গানের জন্য তিনি জাতীয় স্বীকৃতি লাভ করেন।

আধুনিক সংগীত নিয়ে ২০২৩ সালে এক সাক্ষাৎকারে আশা বলেছিলেন, ‘সত্যি বলতে আমি এখনকার গান শুনি না। শেখার ও অনুশীলনের জন্য আমি ধ্রুপদী সংগীত বা ভিমসেন জোশীর গান শুনি। তবে মাঝেমধ্যে রাহাত ফতেহ আলী খান বা সুনিধি চৌহানের গান ভালো লাগে।’

আশা ভোঁসলের ব্যক্তিগত জীবন ছিল বেশ নাটকীয়। মাত্র ১৬ বছর বয়সে পরিবারের অমতে নিজের ব্যক্তিগত সচিব ৩১ বছর বয়সী গণপতরাও ভোঁসলেকে বিয়ে করেন তিনি। তবে শ্বশুরবাড়ির দুর্ব্যবহারের কারণে তিন সন্তানসহ ১৯৬০ সালে সেই সম্পর্ক ত্যাগ করেন।

পরবর্তীতে ১৯৮০ সালে বিখ্যাত সংগীত পরিচালক রাহুল দেব বর্মণের (আর ডি বর্মণ) সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন তিনি। বর্মণ পরিবারের প্রবল আপত্তি থাকলেও তাদের দীর্ঘদিনের প্রেম পরিণয়ে রূপ পায়। ১৯৯৪ সালে আর ডি বর্মণের মৃত্যু পর্যন্ত তারা একসাথেই ছিলেন। জীবনের শেষ বছরগুলোতে তার নাতনি জেনাই ভোঁসলে ছিলেন এই সংগীত সম্রাজ্ঞীর ছায়াসঙ্গী। তার প্রয়াণে ভারতীয় সংগীতের একটি স্বর্ণযুগের অবসান ঘটল।

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *