ইসলামাবাদে শান্তির আলোচনা ভেস্তে গেল

𓂃✍︎  নাগরিক নিউজ ডেস্ক 𓂃✍︎ 

৪০ দিন যুদ্ধের পর আশা জাগিয়ে শুরু হওয়া ইসলামাবাদ আলোচনা কোনো ধরনের সমঝোতা ছাড়াই শেষ হয়েছে। এখন পরস্পরকে দুষছে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র।

যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। ইসলামাবাদ ছাড়ার আগে সংবাদ সম্মেলনে এসে তিনি জানান, ২১ ঘণ্টার আলোচনায় কোনো সমঝোতা হয়নি।

পরিবেশটি কেমন হতাশার ছিল, তা বিবিসির পাকিস্তান সংবাদদাতা ক্যারি ডেভিসের জবানিতে স্পষ্ট হয়ে এসেছে।

ভ্যান্সের সংবাদ সম্মেলনে ছিলেন ডেভিস। সংবাদ সম্মেলন শেষ হওয়ার পরপরই তিনি দেখেন, হোটেলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদলের জন্য প্রস্তুত হওয়া দীর্ঘ গাড়িবহর। সেখানে পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষের নিরাপত্তাব্যবস্থা ছাড়া মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্টের নিজস্ব নিরাপত্তাদলও ছিল।

ক্যারি ডেভিস লিখেছেন, ‘আমরা আমেরিকার পতাকাশোভিত একটি গাড়িকে দ্রুত হোটেল ছাড়তে দেখেছি। ধারণা করছিলাম, দীর্ঘ আলোচনা সত্ত্বেও কোনো চুক্তি না হওয়ায় ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স শহর ছাড়ার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন।’

আলোচনার ফলাফল নিয়ে সেখানে হতাশার স্পষ্ট আবহ দেখার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘অনেকে আগে থেকেই বুঝতে পেরেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের অবস্থানের মধ্যে বড় ফারাক থাকায় শান্তিচুক্তি হওয়া কঠিন। তবে দুই পক্ষ থেকেই উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল আসায় অনেকের আশা ছিল, সবাই একটি সমঝোতায় পৌঁছাতে সত্যিই আন্তরিক।’

‘ফলে এই হতাশা শুধু সম্মেলনকক্ষেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং আরও বিস্তৃত পরিসরে ছড়িয়ে পড়বে,’ লিখেছেন বিবিসির এই সাংবাদিক।

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধবিরতির পর পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় এই শান্তি আলোচনার দিকে চোখ ছিল গোটা বিশ্বের। কারণ, মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়া এই যুদ্ধের কারণে ভুগতে হচ্ছে গোটা পৃথিবীর মানুষকে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল মিলে ইরানে হামলার পর এই যুদ্ধের সূত্রপাত। জবাবে ইরান মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে মার্কিন স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তু করলে যুদ্ধ বিস্তৃত হয়। এর মধ্যে ইরানের পাশাপাশি লেবাননে ক্রমাগত হামলা চালিয়ে যায় ইসরায়েল।

ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিলে বিশ্বের তেলের বাজার অস্থির হয়ে ওঠে। কেননা বিশ্বে জ্বালানি পরিবহনের ২০ ভাগই এই সরু জলপথ দিয়ে হয়।

হরমুজ না খুললে ইরানের সভ্যতা বিলীন করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। কিন্তু তার ২৪ ঘণ্টা না গড়াতেই গত মঙ্গলবার দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেন তিনি। তারপরই ইসলামাবাদে দুই পক্ষের মধ্যে সরাসরি আলোচনার তোড়জোড় শুরু হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে আলোচনায় নেতৃত্ব দেন ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্স, ইরানের পক্ষে নেতৃত্ব দিতে ইসলামাবাদে পৌঁছান দেশটির পার্লামেন্টের স্পিকার বাগের গালিবাফ, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচিকে সঙ্গী করে।

ইরান যদি কোনো চুক্তিতে না আসে, তাহলে আবার হামলা হবে, ট্রাম্প আগেই এই হুমকি দিয়ে রেখেছিলেন। এর ফলে বৈঠকে কোনো সমঝোতা না হওয়ায় এই প্রশ্ন বড় হয়ে উঠেছে, এখন কী হবে? আবার কি যুদ্ধ শুরু হবে?

বিবিসির বিশ্ব সংবাদদাতা জো ইনউড তাৎক্ষণিক বিশ্লেষণ এই কথা দিয়েই শুরু করেছেন, মূল প্রশ্ন এখন—এরপর কী হবে?

আলোচনায় সমঝোতা যে কঠিন ছিল, তা মনে হচ্ছিল তাঁর। তাঁর ভাষায়, উভয় পক্ষই এই আলোচনায় এসেছে যুদ্ধে নিজেদেরকে বিজয়ী দাবি করে। তাই শুরু থেকেই একটি সমঝোতায় পৌঁছানো কঠিন ছিল। শেষ পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে, সেটি প্রায় অসম্ভবই হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তবে যুদ্ধ আবার শুরু হবে, এমন ইঙ্গিত এখনো না পাওয়ার কথাই লিখেছেন জো ইনউড। তাঁর ভাষায়, ইরানের ওপর হামলা আবার শুরু হবে কি না, এ বিষয়ে কোনো ঘোষণা নেই। তবে সম্ভাবনা যে বেড়েছে, তা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়।

যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, ইরান কখনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না, এই প্রতিশ্রুতি দিতে পারেনি বলেই আলোচনা ব্যর্থ হয়েছে। যদিও ইরান সব সময়ই দাবি করেছে, তাদের এমন কোনো উচ্চাভিলাষ নেই।

অন্যদিকে ইরানের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের ‘অযৌক্তিক’ দাবির কারণে ইসলামাবাদে আলোচনা ভেস্তে গেছে।

আলোচনা ভেস্তে যাওয়ায় হরমুজ প্রণালি খোলার সম্ভাবনাও কমে গেল। উপসাগরে যুক্তরাষ্ট্রর দুটি যুদ্ধজাহাজ পৌঁছানো থেকে জো ইনউড ধারণা করছেন, ওয়াশিংটন হয়তো অন্য কোনো পথ খুঁজছে।

ইনউড লিখেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের এই সরাসরি বৈঠক ছিল ঐতিহাসিক। কিন্তু তা হয়তো কূটনীতির একটি ব্যর্থ উদাহরণ হিসেবেই ইতিহাসে লেখা থাকবে।

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *