তেলের সংকটে বন্ধ হলো ইস্টার্ন রিফাইনারি

𓂃✍︎  চট্টগ্রাম প্রতিনিধি 𓂃✍︎

অপরিশোধিত তেলের (ক্রুড অয়েল) ঘাটতিতে দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডে উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে। চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় অবস্থিত এই শোধনাগারে মঙ্গলবার দুপুর থেকে প্রধান দুটি ইউনিট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় নতুন করে চাপ তৈরি হয়েছে।

শোধনাগার সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, পর্যাপ্ত ক্রুড অয়েল মজুত না থাকায় তিনটি ইউনিটের মধ্যে পেট্রোল, অকটেন ও ডিজেল উৎপাদনকারী ১ ও ২ নম্বর ইউনিট সম্পূর্ণ বন্ধ রাখা হয়েছে। বর্তমানে শুধু ৩ নম্বর ইউনিটে সীমিত আকারে উৎপাদন চলছে।

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের প্রভাবে আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ায় চলতি মাসের শুরু থেকেই কাঁচামালের সংকটে পড়েছিল শোধনাগারটি। পরিস্থিতি সামাল দিতে ৫ এপ্রিল থেকে বিকল্প উপায়ে উৎপাদন চালু রাখা হলেও শেষ পর্যন্ত তা ধরে রাখা যায়নি।

ইস্টার্ন রিফাইনারির সাবেক মহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মনজারে খোরশেদ আলম বলেন, অপরিশোধিত তেলের অভাবে শোধনাগারের প্রধান উৎপাদন ইউনিটগুলো বন্ধ রাখতে হয়েছে। বর্তমানে কেবল বিটুমিন উৎপাদন অব্যাহত আছে।

তিনি জানান, দেশের বাজারে সবচেয়ে বেশি চাহিদা থাকা পেট্রোল, অকটেন ও ডিজেলের সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হতে পারে। এই ঘাটতি মেটাতে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন বিদেশ থেকে পরিশোধিত জ্বালানি আমদানির মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে।

শোধনাগার সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে সীমিত পরিসরে কিছু জ্বালানি উৎপাদিত হলেও তা দেশের চাহিদার তুলনায় খুবই কম। প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৪ হাজার টনসহ মোট ১৩ ধরনের জ্বালানি পরিশোধন করে প্রতিষ্ঠানটি, যা দেশের মোট চাহিদার প্রায় ২০ শতাংশ সরবরাহ করে থাকে।

এই সংকটের পেছনে মূল কারণ হিসেবে সময়মতো ক্রুড অয়েলবাহী জাহাজ না পৌঁছানোকে দায়ী করা হচ্ছে। সৌদি আরব থেকে নতুন একটি চালান পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে। ১৮ এপ্রিল সেখানে এক লাখ মেট্রিক টন ক্রুড অয়েল জাহাজে তোলার কথা রয়েছে, যা ৫ মে চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছাতে পারে। এরপর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ইস্টার্ন রিফাইনারির তথ্য অনুযায়ী, তাদের ক্রুড অয়েল সংরক্ষণক্ষমতা দেড় লাখ টন এবং পরিশোধিত তেল সংরক্ষণক্ষমতা আড়াই লাখ টন। বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিকল্প উৎস থেকে কাঁচামাল আমদানির উদ্যোগও নিচ্ছে সরকার।

সংশ্লিষ্টরা জানান, ইরানের সঙ্গে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের চলমান উত্তেজনার কারণে প্রায় দুই মাস ধরে ক্রুড তেল আমদানি ব্যাহত হচ্ছে। দেশে সর্বশেষ অপরিশোধিত তেলের চালান আসে গত ১৮ ফেব্রুয়ারি। আগামী মে মাসের শুরুতে নতুন চালান আসার সম্ভাবনা রয়েছে।

তবে জ্বালানি বিভাগ জানিয়েছে, সরাসরি আমদানি করা পরিশোধিত জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুত থাকায় সরবরাহ ব্যবস্থায় কোনো প্রভাব পড়বে না।

ইআরএলের কর্মকর্তারা জানান, কক্সবাজারের মহেশখালীর সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) পাইপলাইনে জমে থাকা প্রায় ৫ হাজার টন এবং চারটি ট্যাংকের তলানিতে থাকা ডেড স্টক ব্যবহার করে কয়েকদিন পরিশোধন কার্যক্রম চালু রাখা হয়েছিল। মূল মজুত ৬ এপ্রিল শেষ হয়ে যাওয়ার পর এসব বিকল্প উৎসের তেল দিয়েই উৎপাদন চলছিল।

তথ্যমতে, ইআরএল সাধারণত দৈনিক গড়ে ৪ হাজার ৫০০ টন ক্রুড তেল পরিশোধন করে। তবে সংকটের কারণে গত মাস থেকে তা কমিয়ে দৈনিক ৩ হাজার ৫০০ টনে নামিয়ে আনা হয়। পাঁচটি ট্যাংকের তলানিতে থাকা প্রায় ৩৩ হাজার টন ডেড স্টক এবং এসপিএম থেকে আনা ৫ হাজার টন তেল দিয়ে এতদিন উৎপাদন চালু রাখা হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত এসব মজুতও শেষ হয়ে যাওয়ায় ক্রুড প্রসেসিং কার্যক্রম বন্ধ করতে হয়েছে।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) সূত্রে জানা গেছে, দেশে বছরে ৬৮ থেকে ৭০ লাখ টন জ্বালানি তেল আমদানি করা হয়। এর মধ্যে প্রায় ১৫ লাখ টন অপরিশোধিত তেল মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসে, যা ইআরএলে পরিশোধন করা হয়। ইআরএল এলপিজি, পেট্রোল, অকটেন, কেরোসিন, ডিজেল ও ফার্নেসসহ মোট ১৬ ধরনের জ্বালানি পণ্য উৎপাদন করে। বাকি চাহিদা মেটাতে ভারত ও চীন থেকে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি করা হয়।

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *