𓂃✍︎ নাগরিক প্রতিবেদক 𓂃✍︎
দেশের সরকারি-বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র ও বিদ্যুৎ আমদানির ক্ষেত্রে ৯ এপ্রিল পর্যন্ত বকেয়া ৫২ হাজার ৩০০ কোটি ৮৮ লাখ টাকা বলে জাতীয় সংসদে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ।টুকু।
রোববার সংসদে বিএনপির সংসদ সদস্য এস এম জাহাঙ্গীর হোসেনের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী এই তথ্য জানান। ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে অধিবেশন শুরুর পর প্রশ্নোত্তর টেবিলে উত্থাপিত হয়।
বিদ্যুৎমন্ত্রী জানান, সরকারি-বেসরকারি কোম্পানির গ্যাস বিল বকেয়া বাবদ পেট্রোবাংলার কাছে ১১ হাজার ৬৩৪ কোটি ৬ লাখ টাকা, ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানি বাবদ বকেয়া ৩ হাজার ৮৯১ কোটি ৫৫ লাখ, গ্যাস ও জ্বালানি তেলভিত্তিক আইপিপি বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্যাপাসিটি পেমেন্ট ও ফুয়েল পেমেন্ট বাবদ বকেয়া ১৭ হাজার ৩৫৭ কোটি ৬৮ লাখ, জয়েন্ট ভেঞ্চার ও আইপিপি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কয়লার মূল্য এবং ক্যাপাসিটি পেমেন্ট বাবদ বকেয়া ১৫ হাজার ৪৫২ কোটি ৯১ লাখ, সরকারি কোম্পানির ক্যাপাসিটি পেমেন্ট ও ফুয়েল পেমেন্ট বাবদ বকেয়া ৫ হাজার ৬২৩ কোটি ৩ লাখ এবং ফুয়েলিং চার্জ বাবদ বকেয়া ১৯৮ কোটি ৯৪ লাখ টাকা। এ ছাড়া বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ব্যাংকের কাছে ঋণের পরিমাণ ১ লাখ ৪৯ হাজার ৩১১ কোটি ২৬ লাখ টাকা।
বিএনপির শামছুর রহমান শিমুল বিশ্বাস -এর প্রশ্নের জবাবে ইকবাল হাসান মাহমুদ জানান, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিদ্যুৎ খাতের কুইক রেন্টাল প্রকল্পের নামে লুটপাট এবং বিদেশে পাচার হওয়া টাকা দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এ লক্ষ্যে অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংক সমন্বিতভাবে কাজ করছে। দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার প্রক্রিয়াও চলমান রয়েছে।
নেত্রকোণা-৫ আসনে জামায়াতে ইসলামী থেকে নির্বাচিত সদস্য মাছুম মোস্তফার প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, “মাননীয় পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী যথার্থই বলিয়াছেন, দেশে জ্বালানির কোনো সংকট নেই। সরকার ২০২৫ সালের মার্চে যে পরিমাণ জ্বালানি তেল সরবরাহ করেছে, ২০২৬ সালের মার্চেও একই পরিমাণ তেল সরবরাহ করছে।”
মন্ত্রীর ভাষ্য, “জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ বা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশ থেকে মোটর বাইকে ২০০ টাকার ফুয়েল দেওয়া বা রং লাগানোর বিষয়ে কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। তবে ‘প্যানিক বায়িং’ ও মজুদ প্রবণতার কারণে কৃত্রিম সংকট তৈরি হচ্ছে।”
মন্ত্রী জানান, সারাদেশে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে এ পর্যন্ত ৯ হাজার ১১৬টি অভিযানে ৩ হাজার ৫১০টি মামলা হয়েছে; ১ কোটি ৫৬ লাখ ৯ হাজার ৬৫০ টাকা অর্থদণ্ড আদায় হয়েছে এবং ৫ লাখ ৪২ হাজার লিটার জ্বালানি তেল উদ্ধার হয়েছে।
কুমিল্লা-৯ আসনের সংসদ সদস্য আবুল কালামের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, মন্ত্রণালয়, বিপিসি, পেট্রোবাংলা এবং বিপণন কোম্পানির কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে একটি ‘সেন্ট্রাল কন্ট্রোল সেল’ গঠন করা হয়েছে।
মন্ত্রী বলেন, এই সেল চলতি বছরের ৯ মার্চ থেকে প্রতিদিন সকাল সাড়ে ৯টায় জুমের মাধ্যমে মন্ত্রণালয় ও বিপিসির কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে জেলা প্রশাসক বা তাদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করছে। জেলা পর্যায় থেকে উত্থাপিত জ্বালানি তেলের চাহিদা তাৎক্ষণিকভাবে তিন বিপণন কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, নিয়মিত প্রেস কনফারেন্স করে জ্বালানি পরিস্থিতির হালনাগাদ তথ্য দেওয়া হচ্ছে এবং বিভিন্ন গণমাধ্যম ও টিভি স্ক্রলে জ্বালানি সাশ্রয়ে জনসচেতনতামূলক প্রচার চালানো হচ্ছে।
কিশোরগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য শেখ মজিবুর রহমান ইকবালের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, বিপিসি সরাসরি চুক্তির আওতায় কুয়েত, মালয়েশিয়া, চীন, আরব আমিরাত, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, ওমান ও ভারত থেকে ৫০ শতাংশ জ্বালানি তেল আমদানি করে। বাকি ৫০ শতাংশ আমদানি করা হয় উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে।
ইস্টার্ন রিফাইনারিতে পরিশোধনের জন্য সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে বছরে ১৩ থেকে ১৫ লাখ মেট্রিক টন ক্রুড অয়েল আমদানি করা হয় বলেও সংসদে জানান মন্ত্রী।
তিনি বলেন, স্বাভাবিক অবস্থায় আমদানিকৃত ক্রুড অয়েলের শতভাগ হরমুজ প্রণালি দিয়ে আসে। পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির ক্ষেত্রে হরমুজ প্রণালী ব্যবহার করতে হয় না। সামগ্রিকভাবে মোট আমদানিকৃত জ্বালানি তেলের প্রায় ২০ থেকে ২৩ শতাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে আসে।
বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বিপিসির কার্গোগুলো স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় বিলম্বে পাওয়া যাচ্ছে বলেও সংসদকে জানান মন্ত্রী।
বগুড়া-৪ আসনের সংসদ সদস্য মোশারফ হোসেনের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, বর্তমানে দেশে উত্তোলণযোগ্য গ্যাসের মজুদ ২৯ দশমিক ৭৪ ট্রিলিয়ন ঘনফুট।
এর মধ্যে ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ২২ দশমিক ১১ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্তোলন করা হয়েছে এবং ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি হিসাবে অবশিষ্ট রয়েছে ৭ দশমিক ৬৩ ট্রিলিয়ন ঘনফুট।
ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, নতুন কোনো গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত না হলে এবং বর্তমান দৈনিক প্রায় ১ হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট হারে সরবরাহ অব্যাহত থাকলে অবশিষ্ট গ্যাস দিয়ে ১২ বছর চলা সম্ভব।
গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, পেট্রোবাংলার কূপ খনন ও ওয়ার্কওভার কর্মপরিকল্পনার আওতায় ৫০ ও ১০০ কূপ খনন এবং ওয়ার্কওভার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এ পর্যন্ত ১৬টি কূপে কাজ শেষ হয়েছে, বাকিগুলোর কার্যক্রম বিভিন্ন পর্যায়ে চলছে।
সাইসমিক জরিপ নিয়েও বিস্তারিত তথ্য দেন মন্ত্রী। তিনি বলেন, বাপেক্স ব্লক-৭ ও ৯-এ প্রায় ৩ হাজার ৬০০ লাইন কিলোমিটার টুডি সাইসমিক ডাটা আহরণ করে উপাত্ত প্রক্রিয়াকরণের কাজ করছে।
বিজিএফসিএল হবিগঞ্জ, বাখরাবাদ ও মেঘনা এলাকার ১ হাজার ৪৫০ বর্গকিলোমিটারে থ্রিডি সাইসমিক ডেটা আহরণের কাজ শুরু করবে বলে জানান তিনি।
এছাড়া বাপেক্স ভোলার চরফ্যাশনে ৬৬০ বর্গকিলোমিটার এবং জামালপুরে ৬৫০ বর্গকিলোমিটার এলাকায়, বিজিএফসিএল তিতাস, হবিগঞ্জ ও নরসিংদীসংলগ্ন ৬৩২ বর্গকিলোমিটার এলাকায় এবং এসজিএফএল লামিগাঁও, লালাবাজার, গোয়াইনঘাট, কৈলাশটিলা সাউথ ও ফেঞ্চুগঞ্জ ওয়েস্ট স্ট্রাকচারে ৮৮২ বর্গকিলোমিটার এলাকায় থ্রিডি সাইসমিক জরিপের পরিকল্পনা নিয়েছে।
মন্ত্রী সংসদে জানান, আবাসিক খাতে ৬ লাখ ৩২ হাজার প্রি-পেইড মিটার বসানো হয়েছে। অবশিষ্ট গ্রাহকদের জন্যও প্রি-পেইড মিটার প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। বাণিজ্যিক ও গৃহস্থালী গ্রাহকদের জ্বালানি সাশ্রয়ী বার্নার ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে।
জামালপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান বাবুলের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, দেশে গ্রিডভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা বিদ্যুৎ আমদানি ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিসহ ২৮ হাজার ৯১৯ মেগাওয়াট।
তবে বর্তমানে গড়ে প্রতিদিন প্রায় ১৪ হাজার ৫০০ থেকে ১৫ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে বলে জানান তিনি।
মন্ত্রী বলেন, চাহিদা অনুযায়ী বর্তমানে কোনা লোডশেডিং নেই। কিন্তু বৈশ্বিক পরিস্থিতি, কৃষি-সেচ ও গ্রীষ্মকালে সর্বোচ্চ চাহিদার সময় বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রাথমিক জ্বালানির ঘাটতি, সঞ্চালন ও বিতরণ অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা, রক্ষণাবেক্ষণ এবং ঝড়বৃষ্টির কারণে মাঝে মাঝে কিছু বিভ্রাট ঘটে।
পাবনা-৫ আসনের সংসদ সদস্য শামছুর রহমান শিমুল বিশ্বাসের প্রশ্নের জবাবে দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি আইনের বিষয়েও কথা বলেন জ্বালানি মন্ত্রী।
তিনি বলেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি বিশেষ বিধান আইন, ২০১০ জারি করা হয়, যার আওতায় উন্মুক্ত ক্রয়প্রক্রিয়া ছাড়া বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের অযাচিত প্রস্তাব অনুমোদনের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল।
মন্ত্রীর ভাষ্য, ওইসব প্রস্তাবের ক্ষেত্রে নেগোসিয়েশন কমিটির মাধ্যমে ট্যারিফ অনুমোদন করা হতো এবং “প্রায়শই বিদ্যুতের অন্যায্য মূল্য এবং ক্যাপাসিটি চার্জ নির্ধারণ করা হতো”।
তিনি বলেন, বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনকারী ব্যবসায়ীদের মধ্যে আওয়ামী লীগের দলীয় নেতৃবৃন্দ এবং তাদের আত্মীয়স্বজনও ছিল।
এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ওই আইন বাতিল করে অধ্যাদেশ জারি করেছে। সেই অধ্যাদেশ গত ৭ এপ্রিল জাতীয় সংসদে বিল আকারে পাস হয়েছে। এর ফলে আগের মতো স্বেচ্ছাচারী প্রক্রিয়ায় বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের সুযোগ বন্ধ হয়েছে। পাশাপাশি লুটপাট হওয়া পাচারের অর্থ দেশে ফেরাতে অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংক কার্যক্রম নিচ্ছে।
চট্টগ্রাম-১২ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ এনামুল হকের প্রশ্নের জবাবে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের ডিজিটাল মিটার নিয়ে অভিযোগেরও জবাব দেন মন্ত্রী।
তিনি বলেন, নতুন করে বসানো সিঙ্গেল ফেইজ ইলেকট্রনিক মিটারের একুরেসি নিশ্চিত করতে প্রি-ডেলিভারি ইন্সপেকশন, পোস্ট-ল্যান্ডিং ইন্সপেকশন এবং পবিসের টেস্টিং ল্যাব- এই তিন স্তরে মান যাচাই করা হয়।
গ্রাহকপ্রান্তে স্থাপনের আগে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মিটার টেস্টিং ল্যাবে সব মিটার চূড়ান্তভাবে পরীক্ষা করা হয় জানিয়ে তিনি বলেন, একুরেসিসহ গুণগত মান সন্তোষজনক হলেই কেবল তা স্থাপন করা হয়।
মন্ত্রীর ভাষ্য, স্থাপনের পর কারিগরি ত্রুটির কারণে অতিরিক্ত বিলের অভিযোগ পাওয়া গেলে মিটার পরীক্ষা করা হয়। ত্রুটি প্রমাণিত হলে মিটার অনতিবিলম্বে প্রতিস্থাপন করা হয় এবং অতিরিক্ত বিল হয়ে থাকলে তা পরবর্তী মাসের বিলের সঙ্গে সমন্বয় করা হয়।
সরকারদলীয় সংসদ সদস্য শামছুর রহমান শিমুল বিশ্বাসের প্রশ্নের জবাবে জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, দেশের এলপিজির বাজার প্রায় ৯৮ দশমিক ৬৭ শতাংশ আমদানিনির্ভর।
