✍︎ নাগরিক প্রতিবেদক ✍︎
রাজধানীর তেজগাঁও থানার বিস্ফোরক আইনের মামলায় গ্রেফতার যুব মহিলা লীগ নেত্রী শিল্পী বেগমকে কারাগারে পাঠানোর ৪ ঘণ্টা পর জামিন দিয়েছেন আদালত।
মঙ্গলবার শুনানি শেষে মানবিক বিবেচনায় তার জামিন মঞ্জুর করেন ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান।
এর আগে ঢাকার অতিরিক্ত মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আওলাদ হোসাইন মুহাম্মদ জোনাইদ তার জামিন নামঞ্জুর করে দেড় মাস বয়সী সন্তান কাইফা ইসলাম সিমরানসহ তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দিয়েছিলেন।
এদিন দুপুর ২টার দিকে আসামি শিল্পীকে হাজির করা হয় ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে।
আসামিকে কারাগারে আটক রাখার আবেদন করেছিলেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা উপপরিদর্শক শেখ নজরুল ইসলাম।
বেলা ২টার দিকে আসামিকে এজলাসে তোলা হয়। এ সময় শিল্পীর স্বামী, বোন, ননদ, খালাসহ স্বজনেরা আদালতে হাজির হন। তাঁরা বলছিলেন, গত মাসের ৪ তারিখে আদ-দ্বীন হাসপাতাল সিজারিয়ানের মাধ্যমে জন্ম নেয় শিশু; মাতৃদুগ্ধ পান করে। এদিকে বাথরুমে পড়ে বাঁ হাত ভেঙে গেছে শিল্পীর। শিশুসন্তানকে ঠিকমতো কোলেও নিতে পারেন না, একা সামলাতে পারেন না।
শিল্পীর পক্ষে তাঁর আইনজীবী ফারজানা ইয়াসমিন রাখি জামিন চেয়ে আবেদন করেন। শুনানিতে তিনি বলেন, ‘তাঁর ১ মাস ১৬ দিনের কন্যাসন্তান রয়েছে। তাঁকে সিজার করা হয়েছে। যেকোনো শর্তে তাঁর জামিন প্রার্থনা করছি।’
আইনজীবী ফারজানা ইয়াসমিন রাখী বলেন, চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মোস্তাফিজুর রহমান জামিনের আবেদনটি পুনর্বিবেচনা করেছেন। তিনি আরও জানান, মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল পর্যন্ত অন্তর্বর্তীকালীন জামিন দেওয়া হয়েছে শিল্পীকে।
জামিন নাকচের আদেশ শুনে কান্নায় ভেঙে পড়েন শিল্পী। শিল্পী অসুস্থ থাকায় আদালতপাড়ায় স্বজনেরাই শিশুকে কোলে করে রাখেন। কান্নাকাটি করলে সন্তানকে দুধ পান করান তিনি।
শিল্পী বলেন, ‘সিজারের কাটা জায়গায় এখনো ব্যথা করে। বাচ্চাকে ঠিকমতো খাওয়াতে পারি না। ও তো মরে যাবে। আমার বাচ্চা মরে যাবে। আমার হাতে সমস্যা, বাচ্চা পালতে পারি না। ওকে আমি আমার সাথে নেব না।’
বেলা ৩টা ১২ মিনিটের দিকে শিল্পীকে এজলাস থেকে বের করে সিএমএম আদালতের হাজতখানায় নেওয়া হয়। আদালতের চতুর্থ তলা থেকে কাঁদতে কাঁদতে শিশুসন্তানকে কোলে করে সিঁড়ি দিয়ে নামতে থাকেন শিল্পী। এ সময় পুলিশ সদস্যরা তাঁকে খুব দ্রুত হাজতখানায় নিয়ে যান। সন্তানকে রেখে যাবেন বলে তাঁর দুই স্বজনও হাজতখানায় যান। ‘বাচ্চাসহ কাস্টডি’ লেখা থাকায় পরে অবশ্য সন্তানসহ মাকে কাশিমপুর কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়।
আদালতের বারান্দায় রাখা বেঞ্চে বসিয়ে সন্তানকে দুধ খাওয়ান। এরপর শিশুকে কোলে নিয়ে আসামি শিল্পীকে নেওয়া হয় আদালতের হাজতখানায়। এ সময় আক্ষেপ করে বলছিলেন, ‘রাজনৈতিক কারণে বাচ্চাসহ যেতে হচ্ছে কারাগারে৷’
তার আগে গোপন তথ্যের ভিত্তিতে সোমবার সন্ধ্যা সোয়া ৭টার দিকে তেজগাঁও থানার রেলওয়ে কলোনি স্টেশন রোডের নিজ বাসা থেকে গ্রেফতার করা হয় শিল্পীকে। এরপর করা হয়েছে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ।
পুলিশের আবেদনে বলা হয়, আসামি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন দমনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন বলে জানা গেছে তদন্তে। মামলাটির তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাকে জেলহাজতে আটক রাখা বিশেষ প্রয়োজন।
মামলা অনুযায়ী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মো. তাহমিদ মুবিন রাতুল। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের তিনি একজন সক্রিয় কর্মী ছিলেন। ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই বিকেল ৫টার দিকে রাজধানীর চানখাঁরপুল এলাকায় আন্দোলনরত অবস্থায় গুলিবিদ্ধ হন রাতুল। সহপাঠীরা তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান চিকিৎসার জন্য।
চিকিৎসা চলাকালে ছাত্রলীগের অসংখ্য নেতাকর্মী হামলা চালায় তাদের ওপর। পরে আসামি শিল্পীর নির্দেশে ২৩ জুলাই সন্ধ্যা পৌনে ৭টায় মামলার এজাহারনামীয় আসামিরাসহ আরও অজ্ঞাতনামা ১২০-১৩০ জন দেশীয় ধারালো অস্ত্র এবং পিস্তল, বোমা নিয়ে হামলা চালায় ওই শিক্ষার্থীর বাসায়।
তারা আসবাবপত্র ও ইলেকট্রনিকস জিনিসপত্র ভাঙচুর করে। এতে ক্ষতি হয় ৫ লাখ টাকার। বাসা থেকে লুটপাট করা হয় ৩ লাখ টাকা মূল্যের মালামাল। বাসার সামনে রাস্তার ওপর করা হয় বোমা বিস্ফোরণ।
আসামি শিল্পী ও অন্য আসামিরা হত্যার উদ্দেশ্যে ওই শিক্ষার্থীর বাবা মো. সোহেল রানাকেও করেন এলোপাতাড়ি মারধর। এ ঘটনায় ২০২৫ সালের ২৫ জানুয়ারি মামলা করা হয় তেজগাঁও থানায়।
এই ঘটনায় গত বছরের ২৫ জানুয়ারি সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালসহ ১০৩ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতামা ১২০-১৩০ জনকে আসামি করে শিক্ষার্থী রাতুলের মা শাহনুর খানম তেজগাঁও থানায় মামলা করেন।
