চট্টগ্রামে ‘গুপ্ত’ লেখা নিয়ে ছাত্রদল-শিবিরের দুই দফা সংঘর্ষ

✍︎ চট্টগ্রাম প্রতিনিধি ✍︎

চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজ ক্যাম্পাসে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে দুই দফা সংঘর্ষ ঘটেছে। গ্রাফিতি আঁকা ও সেটি নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে লেখালেখির জেরে মঙ্গলবার সকাল ও বিকেলে কলেজের সামনে এই দুই ছাত্র সংগঠনের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এতে দুইপক্ষের অন্তত ১০ জন আহত হয়েছেন।

এমন পরিস্থিতিতে কলেজের নির্ধারিত ক্লাস ও পরীক্ষা স্থগিত ঘোষণা করা হয়েছে। তবে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন ডিগ্রি দ্বিতীয় বর্ষ এবং মাস্টার্সের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছে।

একাধিক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, কলেজ ভবনের দেয়ালে একটি গ্রাফিতি রয়েছে, যার নিচে লেখা ছিল ‘ছাত্ররাজনীতি ও ছাত্রলীগ মুক্ত ক্যাম্পাস’। গতকাল সোমবার রাতে কলেজ শাখা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক আবদুল্লাহ আল মামুনের নেতৃত্বে একদল নেতাকর্মী সেখানে গিয়ে সেই গ্রাফিতি থেকে ‘ছাত্র’ শব্দটি মুছে দিয়ে তার ওপর ‘গুপ্ত’ শব্দটি লিখে দেন। এ নিয়ে কলেজ ক্যাম্পাসে দুইপক্ষের মধ্যে বাকবিতণ্ডার জেরে মঙ্গলবার সকালে এক দফা সংঘর্ষ ঘটে। পরে কলেজে থমথমে অবস্থা বিরাজ করছিল। এরইমধ্যে বিকেল চারটার দিকে তারা আবার মুখোমুখি হন। এবার তারা লাটিসোটা ও ইটপাটকেল নিয়ে পরস্পরের ওপর চড়াও হন। বেশ কিছু সময় ধরে সংঘর্ষ চলতে থাকে।

সরকারি সিটি কলেজের উপাধ্যক্ষ জসীম উদ্দিন জানিয়েছেন, কলেজের দেয়ালে গ্রাফিতির একটি শব্দ মুছে অন্য একটি শব্দ লেখা নিয়ে ছাত্রদের দুইপক্ষের মধ্যে মারামারির ঘটনা ঘটে। তবে পরে পুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। দুপুর ১২টার পর কলেজের অভ্যন্তরীণ যেসব ক্লাস এবং পরীক্ষা ছিল, সেগুলো স্থগিত করা হয়েছে।

চট্টগ্রাম নগর পুলিশের উপ-কমিশনার হোসাইন মোহাম্মদ কবির ভূঁইয়া বলেন, সিটি কলেজে ছাত্রদের দুই পক্ষের মধ্যে অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে। তবে পুলিশ দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনে। পরিস্থিতি যাতে অবনতি না হয় সেজন্য কলেজ ক্যাম্পাস ও আশেপাশে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।

চট্টগ্রাম মহানগর (দক্ষিণ) ইসলামী ছাত্র শিবিরের প্রচার সম্পাদক জাহিদুল আলম জয় বলেন, কলেজের দেয়ালে আমরা কিছু গ্রাফিতি এঁকেছিলাম। কিন্তু ছাত্রদলের উচ্ছৃঙ্খল কিছু নেতাকর্মী সেখানে বিভিন্ন ধরনের উস্কানিমূলক কথাবার্তা লিখে সেটি নষ্ট করে দিয়েছে। এই ঘটনার প্রতিবাদ জানালে তারা আমাদের ওপর হামলা করে।

তবে চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রদলের সদস্য সচিব শরীফুল ইসলাম তুহিন বলেন, ফেসবুকে দেওয়া একটি স্ট্যাটাস নিয়ে সিটি কলেজের দুই ছাত্রের মধ্যে কথাকাটাকাটি হয়েছিল। সেই ঘটনার জেরে বড় একটি অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছে। তবে কলেজ কর্তৃপক্ষ চাইলে দুইপক্ষের ছাত্রদদের ডেকে নিয়ে বিষয়টি মিটমাট করে দিতে পারতেন।.

দুপুরের পর কিছুটা শান্ত হলেও পরে ছাত্রশিবির বিক্ষোভ মিছিল বের করলে আবার উত্তেজনা ছড়ায়। বিকেল চারটার দিকে নগরের নিউমার্কেট মোড় থেকে শিবিরের মিছিল কলেজের দিকে এলে সিটি কলেজের সামনে অবস্থান নেওয়া ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা তাদের ধাওয়া দেন। এতে আবার সংঘর্ষ শুরু হয়।

সরেজমিনে দেখা যায়, সংঘর্ষের সময় আশপাশের দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায়। কলেজের সামনে ছাত্রদল এবং নিউমার্কেট এলাকায় শিবিরের নেতা-কর্মীরা অবস্থান নেন। দুই পক্ষই একে অপরকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। কয়েকজনের হাতে ধারালো অস্ত্র এবং অনেকের হাতে লাঠিসোঁটা দেখা গেছে।

ছাত্রশিবিরের চট্টগ্রাম নগর দক্ষিণ শাখার প্রচার সম্পাদক জাহিদুল আলম দাবি করেন, তাঁদের অন্তত ১৫ জন আহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে আশরাফ হোসেন নামের এক কর্মীর গোড়ালি বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। আশরাফকে নগরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

তবে ছাত্রদলের পক্ষ থেকে হামলার অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে। নগর ছাত্রদলের আহ্বায়ক সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘গ্রাফিতি মুছে “গুপ্ত” লেখা হয়েছে। তারা যদি গুপ্ত না হয়, তাহলে তাদের কেন গায়ে লাগল!’

সংঘর্ষের খবর ছড়িয়ে পড়লে নগরের বিভিন্ন এলাকা থেকে ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা নিউমার্কেট মোড়ে জড়ো হন। পরে তাঁরা মিছিল নিয়ে কলেজের সামনে অবস্থান নেন এবং বিভিন্ন স্লোগান দেন। সন্ধ্যা পর্যন্ত সেখানে তাঁদের অবস্থান দেখা গেছে।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ নুরুল আলম জানান, সামি মো. আলাউদ্দিন নামের এক শিক্ষার্থীকে আহত অবস্থায় হাসপাতালে আনা হয়। তাঁর মাথায় সেলাই দেওয়া হয়েছে। পরে পরিবার তাঁকে বাসায় নিয়ে গেছে।

১৯৫৪ সালে চট্টগ্রাম নাইট কলেজ নামে যাত্রা শুরু করা চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজ ক্যাম্পাস কয়েক দশক ধরে ছাত্রলীগের (বর্তমানে নিষিদ্ধ) নিয়ন্ত্রণে ছিল। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর সাধারণ শিক্ষার্থীদের ব্যানারে ক্যাম্পাসটি রাজনীতিমুক্ত করার ঘোষণা দেওয়া হয়। তবে সে বছর কমিটি দেয় ইসলামী ছাত্রশিবির। আগে কমিটি থাকলেও ৫ আগস্টের পর সক্রিয় হয় ছাত্রদলও। ক্যাম্পাসের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই পক্ষের দ্বন্দ্ব রয়েছে।

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *